নেশা অবস্থায় নামাজ পড়লে ইমান যায়?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2807
Questioner: Saiful Islam
Question Asked: 17 Jul 2026, 02:15 PM
Reviewed & Published: 17 Jul 2026, 03:04 PM
Views: 38
Tokens: 4,182
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।নেশা অবস্থায় নামাজ পড়লে যেমন হালকা নেশা বা নেশা আছে যদি হুশ থাকে ইমান চলে যাবে কি?

২।নেশা করার কারনে নামাজ কাযা হয়ে গেলে পড়ে আদায় করলে কুফরির আশংকা আছে বা রয়েছে কি?

৩।নেশা ছাড়তে চাই কিন্তু পারতে ছিনা নেশা ছাড়তে ঘুমের ঔষধ গ্রহন করা যাবে কি?

Answer

নেশা অবস্থায় নামাজ বিষয়ে দলিলভিত্তিক উত্তর

প্রশ্ন ১: নেশা অবস্থায় নামাজ পড়লে ইমান চলে যাবে কি?

উত্তর: নেশা অবস্থায় নামাজ পড়লে ইমান চলে যায় না, তবে এটি মারাত্মক গুনাহের কাজ।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

  • কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারো যা বলছ।" (সূরা নিসা: ৪৩)
  • উক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায়, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ পড়া নিষিদ্ধ (হারাম), কিন্তু এটি কুফরী নয়। এটি হারাম কাজ, গুনাহের কাজ।
  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নেশা অবস্থায় নামাজ পড়লে নামাজ সহীহ হবে না, পুনরায় পড়তে হবে। তবে ইমান চলে যাওয়ার প্রশ্ন আসে না।

হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে বর্ণিত:

  • রদ্দুল মুহতার (১/৩৪২)-এ উল্লেখ আছে: "নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির নামাজ সহীহ হবে না, যতক্ষণ না তার জ্ঞান ফিরে আসে।" তবে ইমান চলে যাওয়ার বিষয়টি কেবল তখনই প্রযোজ্য যখন কেউ ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয় অস্বীকার করে বা ঈমান ভঙ্গকারী কাজ করে।

মুফতী তাকী উসমানী (দা.ব.)-এর ফতোয়া: নেশা অবস্থায় নামাজ পড়া হারাম ও কবীরা গুনাহ, তবে ঈমানদার ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হবে। ইমান চলে যাওয়ার জন্য নেশা অবস্থায় নামাজ পড়া যথেষ্ট নয়।


প্রশ্ন ২: নেশা করার কারণে নামাজ কাযা হয়ে গেলে পড়ে আদায় করলে কুফরির আশংকা আছে কি?

উত্তর: না, কুফরির কোনো আশংকা নেই। নেশা করে নামাজ কাযা করা কবীরা গুনাহ, কিন্তু তা কুফরী নয়।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

  • ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেওয়া বা কাযা করা কবীরা গুনাহ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে এটি কুফরী হতে পারে, কিন্তু হানাফী মাযহাবের মত হলো—এটি কুফরী নয়, বরং ফিসক (গুনাহ)।
  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত: যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দেয়, তাকে কাফির বলা যাবে না, যতক্ষণ না সে নামাজের ফরজিয়ত অস্বীকার করে। (বাদায়েউস সানায়ে, ৭/১৩৭)
  • ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর ফতোয়া: নামাজ কাযা করা ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ, কিন্তু ঈমানের বাইরে নিয়ে যায় না। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৮)

তবে সতর্কতা: নেশা অবস্থায় নামাজ না পড়ে পরে কাযা করলেও আল্লাহর কাছে তওবা করা আবশ্যক। নেশা করা নিজেই হারাম, এবং নামাজ কাযা করা আরেকটি গুনাহ। উভয় গুনাহের জন্য তওবা করতে হবে।

সারসংক্ষেপ:

  • নেশা করা → হারাম ও কবীরা গুনাহ
  • নেশা অবস্থায় নামাজ পড়া → সহীহ হবে না, পুনরায় পড়তে হবে
  • নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া → কবীরা গুনাহ, কুফরী নয়
  • পরে কাযা করলে → গুনাহ মাফের আশা আছে, তবে তওবা করতেই হবে

প্রশ্ন ৩: নেশা ছাড়তে চাই কিন্তু পারছিনা—নেশা ছাড়তে ঘুমের ঔষধ গ্রহণ করা যাবে কি?

উত্তর: জ্বী, নেশা ছাড়ার উদ্দেশ্যে চিকিৎসকের পরামর্শে ঘুমের ঔষধ গ্রহণ করা জায়েজ, তবে শর্ত হলো:

  1. চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া: যেকোনো ঔষধ সেবনের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  2. ক্ষতিকর না হওয়া: যে ঔষধ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নয়, সেটি গ্রহণ করা যাবে।
  3. নেশা ছাড়ার আন্তরিক ইচ্ছা থাকা: এটি উত্তম নিয়ত। নেশা ছাড়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য চেয়ে দুআ করতে হবে।

হানাফী ফিকহের দলিল:

  • আল-হিদায়া (৪/৩৯২)-এ উল্লেখ আছে: "প্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য হারাম ব্যতীত অন্য ঔষধ ব্যবহার করা জায়েজ।"
  • ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩৫৪)-এ বলা হয়েছে: "যদি কোনো ঔষধে নেশা থাকে কিন্তু তা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হয়, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ, তবে অন্য কোনো উপায় না থাকলে।"

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর ফতোয়া: নেশা ছাড়ার জন্য কোনো ঔষধ ব্যবহার করলে তা জায়েজ, তবে তা যেন অন্য কোনো নেশায় পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৫০)

বাস্তব পরামর্শ:

  • নেশা একটি মারাত্মক রোগ, তাই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা জরুরি।
  • মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
  • আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।
  • পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতা নিতে হবে।

সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ নোট

  1. নেশা অবস্থায় নামাজ পড়লে ইমান যায় না, তবে নামাজ সহীহ হবে না এবং এটি হারাম কাজ।
  2. নেশা করে নামাজ কাযা করলে পরে আদায় করলে কুফরি হয় না, তবে এটি কবীরা গুনাহ এবং তওবা করা জরুরি।
  3. নেশা ছাড়তে ঘুমের ঔষধ গ্রহণ করা যাবে, তবে ডাক্তারের পরামর্শে এবং সতর্কতার সাথে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নেশা ও গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। (আমীন)


উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাবসমূহ: কুরআন, হাদীস, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরী, আল-হিদায়া, বাদায়েউস সানায়ে, জাওয়াহিরুল ফিকহ, ফাতাওয়া উসমানী।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.