বাবার হারাম মিশ্রিত আয়ে মেয়ের ল্যাপটপ চাওয়া জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার আব্বু সরকারি চাকরি করেন সেখানে তিনি ঘুষের সাথে সম্পৃক্ত যার কারণে পরিপূর্ণ হালাল নয়। আমি আলেমের মাধ্যমে জেনেছি, আমি প্রয়োজনীয় খরচ নিতে পারব কারণ এতে পুরোপুরি হারাম নয় তাই।
এখন প্রশ্ন হল, আমার অনলাইন প্লাটফর্মে কাজ করার জন্য যা উম্মাহর খেদমত হিসেবেই করতে চাচ্ছি এবং তিনি দ্বীনি/ উপকারী দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জনের জন্য ,পার্সোনাল ইউজের জন্য না! হলেও খুব অংশ থাকবে।তার জন্য আমার ল্যাপটপ হলে ভালো হয় অথবা একটি ভাল মানের মোবাইল হলেও যেটির কোনোটি আমার নেই এখন। তার জন্য আমি আমার আব্বুকে চাহিদাটা কি বলতে পারবো, দেওয়ার জন্য। যেহেতু আমি জানি উনার ইনকামে কতটুকু সামর্থ্য রাখেন, হয়তো আশঙ্কা করছি আমার এই কেনার পেছনে হারাম টাকা ইনভেস্ট হতে পারে সেই শতাংশ বেশি ।
তাহলে কি আমার কেনা জায়েজ হবে নাকি না কেনা মুনাসিব হবে?? যেহেতু বাধ্যতামূলক কিছু না। আমি পেলে এর মাধ্যমে নিজের এবং উম্মাহর উন্নতিতে করতে পারব সেই চিন্তায়!
Answer
উত্তর: বাবার মিশ্র (হালাল-হারাম) আয় থেকে ল্যাপটপ/মোবাইল নেওয়ার বিধান
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনার পিতার আয়ে হালাল ও হারাম (ঘুষ) মিশ্রিত আছে, তবে সম্পূর্ণ হারাম নয়। আপনি দ্বীনি ও উপকারী দুনিয়াবি কাজের জন্য একটি ল্যাপটপ বা ভালো মোবাইল চাচ্ছেন, যা আপনার কাছে বর্তমানে নেই। আপনার প্রধান উদ্বেগ হল, এই কেনার পেছনে হারাম টাকা বেশি পরিমাণে জড়িত হওয়ার আশঙ্কা আছে, এবং এটি বাধ্যতামূলক কিছু নয়।
হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর:
১. মিশ্র আয় থেকে গ্রহণের মূলনীতি: হানাফি মাযহাবে, যদি কোনো ব্যক্তির আয়ে হালাল-হারাম মিশ্রিত থাকে এবং হারামের পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে জানা না যায়, তাহলে তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা জায়েজ, তবে মাকরূহে তানজিহি (অপছন্দনীয়) হবে। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রহণে অনুমতি আছে। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৭৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪৫)
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ: আপনি বলেছেন যে আপনি প্রয়োজনীয় খরচ নিতে পারেন, কারণ পিতার আয় সম্পূর্ণ হারাম নয়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হল, এটি কি সত্যিই প্রয়োজনীয়? আপনি দ্বীনি শিক্ষা ও উম্মাহর সেবার জন্য চাচ্ছেন, যা একটি মহৎ উদ্দেশ্য। কিন্তু যেহেতু এটি বাধ্যতামূলক নয় (ফরজ বা ওয়াজিব নয়), তাই এটি একটি ইচ্ছাগত প্রয়োজন (হাজত) হিসেবে গণ্য হবে।
৩. হারামের শতাংশ বেশি হওয়ার আশঙ্কা: আপনি যদি নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা (গালিবুজ্জান) করেন যে আপনার পিতার আয়ের অধিকাংশ অংশ হারাম (যেমন: ৫০% এর বেশি), তাহলে হানাফি ফিকহে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা মাকরূহ হবে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, তা জায়েজ নয়। (আল-হিদায়া, ৩/২৩০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৫৮)
অতএব, তাকওয়া ও সতর্কতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের কেনাকাটা থেকে বিরত থাকা উত্তম। বিশেষ করে যখন এটি বাধ্যতামূলক কিছু নয়।
৪. দ্বীনি কাজের গুরুত্ব ও উত্তম পন্থা: ল্যাপটপ বা মোবাইল দ্বীনি কাজের জন্য অত্যন্ত উপকারী হলেও, আপনি যদি বাবার কাছ থেকে সরাসরি চান এবং তাতে হারাম টাকা জড়িত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, তাহলে এর পরিবর্তে আপনি নিজে উপার্জন করে (উদাহরণস্বরূপ, হালাল উপায়ে অনলাইনে কাজ করে) জিনিসটি কেনার চেষ্টা করুন। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় বিরত থাকাই অধিক তাকওয়ার কাজ।
- উত্তম পন্থা: নিজে চেষ্টা করে হালাল উপায়ে উপার্জন করে জিনিসটি সংগ্রহ করা। অথবা অন্য কোনো হালাল উপায়ে (যেমন: ধার বা হাদিয়া) পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
সারকথা: আপনার জন্য বাবার কাছ থেকে ল্যাপটপ/মোবাইল চাওয়া জায়েজ নয়. তাকওয়া ও আল্লাহর ভয় থেকে বিরত থাকাই উত্তম। দ্বীনি কাজের জন্য অন্য হালাল উপায় খুঁজুন।
উল্লেখ্য: যদি আপনার দ্বীনি কাজ এতটাই জরুরি হয় যে তা ছাড়া আপনি সঠিকভাবে ইলম অর্জন বা উম্মাহর সেবা করতে পারবেন না (যেমন: অনলাইনে কুরআন/হাদিস শিক্ষা দেওয়া অথবা ফরজ ইলম অর্জন), তাহলে প্রয়োজনীয়তার কারণে তা গ্রহণ করতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রেও চাওয়ার পরিবর্তে বাবা নিজে থেকে দিলে গ্রহণ করা ভালো।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং হালাল রিজিকের পথ সুগম করে দিন। (আমিন)
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৭৩)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৪৫)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৫৮)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৩৭০)
- আল-হিদায়া (৩/২৩০)
- শরহে মা'আনিল আছার (২/৪০৫)