ফেক নেইল, টিপ ও কপালে কাজলের ফোটা ব্যবহারের ফিকহি বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, বেহেশতী জেওর, ফাতাওয়া আলমগীরী প্রভৃতি)-এর আলোকে জবাব প্রদান করা হবে।
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার:
১. মুসলিম নারীরা কি নিজে দেখার জন্য ও স্বামীকে দেখানোর জন্য ফেক নেইল (যা প্লাস্টিকের, গ্লু দিয়ে লাগানো হয় এবং ইচ্ছা করলে উঠানো যায়) ব্যবহার করতে পারবে? ২. ছোট একটি কালো টিপ (বিন্দি) পরা কি জায়েজ? ৩. কাজল বা আই লাইনার দিয়ে কপালে একটি ফোটা দেওয়া যাবে কি?
উত্তর:
১. ফেক নেইল ব্যবহারের বিধান:
ফেক নেইল (নকল নখ) ব্যবহার করা ইসলামী শরী‘আতে নাজায়েজ ও হারাম। এর কয়েকটি কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
- উজু ও গোসলের প্রতিবন্ধকতা: এগুলো নখের উপর এমন একটি স্তর সৃষ্টি করে যা পানিকে নখের গোড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা দেয়। যতক্ষণ না এগুলো সম্পূর্ণ সরানো হয়, ততক্ষণ উজু ও গোসল সহীহ হবে না (রদ্দুল মুহতার, ১:২৬১)।
- সৃষ্টির পরিবর্তন: ফেক নেইল ব্যবহারে নখ দীর্ঘ ও অপ্রাকৃতিক দেখায়, যা আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আর আমি তাদের নির্দেশ দেবো যেন তারা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করে।” (সূরা নিসা, ৪:১১৯) একই কারণে নকল চুল ও দাঁত ফাইলিং হারাম (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৪৩)।
- অমুসলিম নারীদের অনুকরণ: এ ধরনের নকল নখ সাধারণত অমুসলিম সংস্কৃতি ও ফ্যাশানের অংশ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আবু দাউদ, হাদীস: ৪০৩১)
- প্রতারণা: এটি একটি প্রতারণা, কারণ পরিধানকারী নিজেকে অপ্রাকৃতিকভাবে সাজিয়ে তোলে এবং অন্যদের কাছে এটাই তার স্বাভাবিক নখ মনে হয়। ফাতাওয়া উসমানী (২:২৫০) -তে উল্লেখ করা হয়েছে যে এরূপ প্রতারণা বৈধ নয়।
প্রমাণ: ফেক নেইল ব্যবহার করা হারাম, তা নিজের দেখার জন্যই হোক বা স্বামীকে দেখানোর জন্য। স্বামীর জন্য সাজসজ্জা বৈধ, তবে তা শরী‘আতের সীমার মধ্যে হতে হবে। ফেক নেইলে শরী‘আতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তা জায়েজ হবে না।
বিঃদ্রঃ যদি ফেক নেইল উজুর সময় উঠিয়ে ফেলা হয়, তবুও পরিধানের সময়ই অমুসলিমদের অনুকরণ ও সৃষ্টি পরিবর্তনের অপরাধ থেকে যায়। তাই এটি পরিত্যাগ করাই আবশ্যক।
২. ছোট কালো টিপ (বিন্দি) পরার বিধান:
মাথার কপালে একটি ছোট কালো টিপ বা বিন্দি পরা নাজায়েজ। কারণ:
- অমুসলিমদের নির্দিষ্ট চিহ্ন: দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষত হিন্দু নারীরা ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে কপালে বিন্দি পরে থাকে। মুসলিম নারীর জন্য এ অভ্যাস গ্রহণ করা তাশাব্বুহ (অনুকরণ) এর অন্তর্ভুক্ত। উপরোক্ত হাদীস (আবু দাউদ, হাদীস: ৪০৩১) অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ।
- ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের পরিপন্থী: টিপ পরাকে সাধারণত অমুসলিম ধর্মের আচার হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলিম নারীর জন্য নিজেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র রাখা কর্তব্য।
ফাতাওয়া উসমানী (২:২৭০) -তে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন (যেমন বিন্দি, তিলক) পরিধান করা হারাম।
৩. কাজল/আই লাইনার দিয়ে কপালে ফোটা দেওয়া:
এটিও নাজায়েজ। কারণ:
- এটি হুবহু বিন্দির মতোই অমুসলিমদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রথা। চেহারায় কাজলের ফোঁটা দিলে তা বিন্দির অনুরূপ হয়ে যায়।
- প্রশ্নে উল্লেখিত “ছোট কালো টিপ” ও “কপালে ফোটা” - উভয়ই একইরূপ প্রতীক। তাই জায়েজ হবে না।
হ্যাঁ, তবে চোখের সাজ হিসেবে কাজল বা আই লাইনার ব্যবহার করা বৈধ (স্বামী ও মাহরাম জনের সামনে), কিন্তু কপালে ফোঁটা দেওয়া অনুমোদিত নয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | ফেক নেইল (নকল নখ) | হারাম - নিজে দেখা বা স্বামীকে দেখানোর জন্যও নাজায়েজ। | | কপালে ছোট কালো টিপ (বিন্দি) | হারাম - অমুসলিম অনুকরণ ও ধর্মীয় প্রতীক। | | কাজল/আই লাইনার দিয়ে কপালে ফোটা | হারাম - উপরোক্ত কারণে। | | শুধু চোখে কাজল বা আই লাইনার | জায়েজ (স্বামী ও মাহরামের সামনে)। |
প্রয়োজনীয় দলিল ও কিতাবের রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা নিসা ৪:১১৯ (সৃষ্টির পরিবর্তন)।
- হাদীস: সহীহ বুখারী ৫৯৪৩ (নকল চুল ও দাঁত ফাইলিং-এর লানত)।
- হাদীস: আবু দাউদ ৪০৩১ (অমুসলিমদের অনুকরণ নিষেধ)।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানি), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫০-২৭০ (নকল নখ ও বিন্দি সংক্রান্ত ফাতাওয়া)।
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬১ (উজুর প্রতিবন্ধকতা)।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৮০ (নকল সৌন্দর্য্য প্রসঙ্গ)।
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী), অষ্টম অধ্যায় (সাজসজ্জার আদব ও নিষেধাজ্ঞা)।
- ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৫৪ (তাশাব্বুহের বিবরণ)।
নোট:
- স্বামীকে খুশি করতে শরী‘আত সম্মত সাজসজ্জা (যেমন: সুগন্ধি, রূপা-গয়না, চোখে কাজল, মেহেদি ইত্যাদি) ব্যবহার করা যেতে পারে।
- উক্ত নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকা জরুরি, কারণ এতে গুনাহ হয় এবং ইবাদত-বন্দেগীও প্রভাবিত হয়।