ক্রনিক বায়ু নির্গমনজনিত কারণে ওযু ও নামাজের সমস্যা এবং হানাফি ফিকহ অনুযায়ী মা’যূরের বিধান।
Salah-Prayer · Hanafi
Question
উস্তাদ,আমার অনেক বায়ু বের হওয়ার সমস্যা।।৪, ৫, বার বা এর বেশিও অজু করা লাগে।ফযরের নামাজ শেষ করতে করতে ৪০,৫০ মিনিট পার হয়ে যায়।মাগরিবের নামাজের সময় ৪০ মিনিট এর বেশি হয়ে যায়,এশার সময় ১ ঘন্টার বেশি হয়ে যায়।আর অজুর সমস্যা প্রায় প্রতিদিনই হয়।
এমতা অবস্থায় আমি সূরা ইখলাস, আসর,কাওসার পড়ে নামাজ শেষ করার চেষ্টা করি।মাঝে মাঝে এতো সমস্যা হয় যে এশার সময় ফরজ, সুন্নত,ওয়াজিব সব রাকাতে সুরা কাওসার, আসরই শুধু পড়ি।।এক প্রকার বাধ্য হয়ে পড়ি।
আর ফজরের সময় তো নামাজ শেষ করতে করতে সূর্য ওঠার কাছাকাছি সময় হয়ে যায়।
প্রশ্ন:এভাবে যে ২ টা ছোট সূরা পড়ে নামাজ শেষ করি, এটা কি ঠিক হচ্ছে
মাগরিব শেষ করতে করতে ৪০ মিনিট পার হয়ে যায়,,এতে কি গুনাহ হবে।নামাজের ওয়াক্ত কি থাকে?
আমি যদি এই দুইটা সুরা না পড়ি,,এমনও হতে পারে নামাজই কাজা হয়ে যাবে।
অজুর থাকে না দেখে নফল নামাজ পড়াই বাদ দিছি।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার সমস্যা বুঝতে পেরেছি। দীর্ঘদিন ধরে বায়ু নির্গমনের সমস্যা (মানে ওযু ভঙ্গের ক্রনিক রোগ) হওয়ার কারণে আপনি নামাজ পড়তে অসুবিধায় পড়ছেন। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এমন অবস্থার জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে, যাকে ‘মা’যূর’ (معذور) বা ‘শরয়ি ওজরগ্রস্ত’ বলা হয়। নিচে ধাপে ধাপে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
১. মা’যূর (ওজরগ্রস্ত) হওয়ার শর্ত ও ফজিলত
হানাফি মাযহাবের কিতাবে এসেছে, যে ব্যক্তির প্রতি ওয়াক্ত নামাজে অন্তত একবার অথবা এমন পরিমাণ বায়ু নির্গমন হয় যে ওযু করে নামাজ পড়তে নামাজই শেষ করা যায় না (অর্থাৎ স্বাভাবিক নামাজের পুরো সময়জুড়ে বায়ু আসতে থাকে বা বিরামহীনভাবে আসে), তাহলে সে মা’যূর গণ্য হবে।
(রদ্দুল মুহতার, ১/২৯২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৪৫; ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৬১)
আপনার বর্ণনা:
- বায়ু ৪/৫ বার বা তার বেশি বের হয়।
- ওযু করতে গিয়ে ফজরের নামাজ শেষ করতে ৪০-৫০ মিনিট চলে যায়।
- মাগরিব শেষ করতে ৪০ মিনিট পার হয়ে যায়, এশা শেষ করতে ১ ঘণ্টা।
- প্রতিদিনই এই সমস্যা হয়।
⇒ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে আপনি মা’যূরের শ্রেণিভুক্ত। কারণ স্বাভাবিক নামাজের সময়সীমার মধ্যে আপনি স্থায়ীভাবে ওযু ধরে রাখতে পারছেন না।
২. মা’যূরের জন্য ওযুর হুকুম
মা’যূর ব্যক্তির জন্য হুকুম হলো:
প্রতি ওয়াক্তের জন্য শুধু একবার ওযু করবেন (প্রথম ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর), এবং সেই ওযু দিয়ে সেই ওয়াক্তের ফরজ, সুন্নত, নফল সব নামাজ আদায় করবেন। ওয়াক্তের মধ্যে বায়ু নির্গত হলেও পুনরায় ওযু করতে হবে না। তবে ওযু করার সময় অবশ্যই তাহারাত (পবিত্রতা) শর্ত সাব্যস্ত।
(হেদায়া, ১/২৯; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/২৮; বাহিশতি জেওর, পৃষ্ঠা ৫২-৫৩)
উদাহরণ:
- ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে আপনি একবার ওযু করুন, তারপর ফজরের ফরজ, সুন্নত, এবং নফল সব নামাজ (যদি পড়তে চান) পড়ুন – মাঝখানে বায়ু বের হলেও ওযু পুনরায় জরুরি নয়।
- একইভাবে জোহর, আসর, মাগরিব, এশার জন্যও আলাদা আলাদা ওযু করুন।
৩. ছোট সূরা (ইখলাস, আসর, কাওসার) পড়ে নামাজ শেষ করা
হ্যাঁ, এটা জায়েজ এবং ঠিক আছে।
হানাফি মাযহাবে ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার পর একটি সূরা বা কমপক্ষে তিনটি ছোট আয়াত অথবা একটি বড় আয়াত পড়া ওয়াজিব। ইখলাস, আসর, কাওসার – এগুলো ছোট সূরা হলেও তা ওয়াজিব পূর্ণ করে। তাই আপনি বাধ্য হয়ে যদি শুধু এ দুই/তিনটি সূরা দিয়ে সমস্ত নামাজ শেষ করেন, তাহলে নামাজ সহিহ হবে এবং কোনো গুনাহ নেই।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪২২; ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৩৫; শারহু মাআনিল আসার, ১/৩৮৭)
তবে মা’যূর অবস্থায়ও সুন্নত হলো অন্যান্য সূরাও পড়া – কিন্তু জরুরতের সময় এতটুকুই যথেষ্ট।
৪. মাগরিবের নামাজে বেশি সময় নেওয়া ও সময়ের সীমা
মাগরিবের সময় শেষ হয় পশ্চিম আকাশে লাল আভা অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত। হানাফি মতে এই সময় প্রায় ৪০-৫০ মিনিট (ঋতুভেদে কিছু কমবেশি)।
আপনি যদি মাগরিবের নামাজ ৪০ মিনিটের মধ্যে শেষ করতে পারেন এবং শেষের সময়ের আগেই (লাল আভা মিটে যাওয়ার আগে) নামাজ সম্পন্ন করেন, তাহলে সময়ের ভেতরেই থাকছে। এতে কোনো গুনাহ হবে না।
তবে আপনি যদি লাল আভা মিটে যাওয়ার পরও নামাজ শেষ করেন, তাহলে সেই নামাজ কাজা (কাজা) হয়ে যাবে। তাই চেষ্টা করবেন যেন মাগরিবের প্রথম দিকে নামাজ শেষ হয়।
⇒ করণীয়: ওযু একবার করেই মাগরিবের ফরজ, সুন্নত একটানা পড়ে ফেলুন – মাঝে ভাঙলেও ওযু না করে। তাতে নামাজ দ্রুত শেষ হবে এবং সময়ের মধ্যে হয়ে যাবে।
৫. ফজরের নামাজ ও সূর্যোদয়
ফজরের সময় সূর্যোদয় পর্যন্ত। আপনি যদি সূর্যোদয়ের কাছাকাছি (অর্থাৎ যতক্ষণ সূর্যের কিরণ না বেরোয়) নামাজ শেষ করেন, তাহলে তা সময়েই রয়েছে। কিন্তু সূর্যের উপরের কিনারা দৃশ্যমান হয়ে গেলে নামাজ ভেঙে যায় এবং কাজা করতে হয়।
আপনার উচিত:
- ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওযু করে (একবার) নামাজ শুরু করা।
- বায়ু বের হলেও ওযু না ভেঙে নামাজ চালিয়ে যাওয়া।
৬. নফল নামাজ ছেড়ে দেওয়া
মা’যূরের জন্য প্রতি ওয়াক্তের একবার ওযু দিয়ে নফল নামাজও পড়া জায়েজ। যেহেতু আপনি ওযু ভাঙার ভয়ে নফল ছেড়ে দিয়েছেন, এখন আপনি মা’যূরের হুকুম অনুযায়ী এক ওযুতেই ফরজের পর নফল পড়তে পারেন। তবে অসুবিধা হলে নফল না পড়লেও কোনো গুনাহ নেই।
৭. গুনাহ হবে কি?
- আপনি যদি সচেতনভাবে মা’যূরের হুকুম মেনে চলেন (অর্থাৎ এক ওযুতে নামাজ শেষ করেন) তাহলে গুনাহ হবে না বরং সওয়াব হবে – কারণ আপনি আল্লাহর হুকুম পালন করছেন।
- যদি আপনি অজ্ঞতাবশত ওযু ভাঙার পর পুনরায় ওযু করে নামাজে দীর্ঘসূত্রতা করেন এবং এর ফলে নামাজ সময়ের বাইরে চলে যায়, তাহলে এটা নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ নয়, বরং আপনি যা পারছেন তাই করছেন। তবে এখন থেকে মা’যূরের নিয়ম পালন করা সুন্নত ও সহজ।
সংক্ষিপ্ত করণীয় নির্দেশিকা
- প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় হওয়ার পর (ফজর, মাগরিব, এশা ইত্যাদি) শুধু একবার ওযু করুন।
- ওযু করার সময় নাপাকি (বায়ু) না থাকা শর্ত – তাই পবিত্র অবস্থায় ওযু করুন।
- ওযুর পর ঐ ওয়াক্তের ফরজ, সুন্নত, নফল – সব নামাজ একটানা পড়ুন। মাঝখানে বায়ু বের হলেও ওযু ভাঙবে না।
- নামাজে ছোট সূরা (ইখলাস, আসর, কাওসার) পড়তে কোনো বাধা নেই।
- চেষ্টা করবেন প্রথম সময়েই নামাজ শুরু করা, যেন শেষ সময়ের আগে শেষ হয়।
- নফল নামাজ পুনরায় শুরু করতে পারেন – এক ওযুতেই।
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (الدر المختار مع رد المحتار): ১/২৯২, ১/৪২২
- আল-হেদায়া (الهداية): ১/২৯ (باب الوضوء)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (الفتاوى الهندية): ১/২৮ (الفصل في العذر)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (امداد الفتاوی): ১/১৪৫
- ফাতাওয়া উসমানি (فتاوی عثمانی): ১/১৩৫, ১/১৬১
- বাহিশতি জেওর (بهشتی زیور): পৃষ্ঠা ৫২-৫৩ (মা’যূরের বিধান)