সুদের ব্যাংকে চাকরি করলে বাড়ি ভাড়া জায়েয? ব্যাংকের চাকরি হারাম, এক্ষেত্রে বেবি প্ল্যানিং করা জায়েয কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
নিম্নে প্রশ্নটির ফিক্বহী সমাধান ও দলীল-প্রমাণসহ উত্তর পেশ করা হলো, ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্নের সারমর্ম
একজন বিবাহিত মহিলা (বয়স ৩০) প্রায় এক বছর আগে বিয়ে করেছেন। স্বামী ব্যাংকে চাকরি করেন (যা সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত, তাই হারাম)। বিয়ের সময় স্বামী অঙ্গীকার করেছিলেন যে তিনি অন্য চাকরি খুঁজে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেবেন, কিন্তু এখনও তা সম্ভব হয়নি। এমতাবস্থায় তিনি জানতে চান, “বেবি প্ল্যানিং” করা (অর্থাৎ এখনই সন্তান ধারণ না করে অপেক্ষা করা) জায়েয হবে কি না? যেহেতু সৎ-নেক সন্তান লালন-পালনের জন্য হালাল ইনকাম অপরিহার্য।
ফিক্বহী নীতিমালা ও দলীল
১. ব্যাংকের চাকরির বিধান
সুদ (রিবা) সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা স্পষ্ট হারাম। কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা এই বিষয়টি সুস্পষ্ট।
-
কুরআন:
﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾ (সূরা আল-বাকারাহ, ২৭৫)
“আল্লাহ তা‘আলা ক্রয়-বিক্রয় হালাল ও সুদ হারাম করেছেন।” -
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَعَنَ اللَّهُ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ» (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮)
“আল্লাহ তা‘আলা সুদখোর, সুদদাতা, সুদের সাক্ষী ও লেখককে লা‘নত করেছেন।”
(ব্যাংকের ক্যাশিয়ার, অ্যাকাউন্টেন্ট, ম্যানেজারসহ সবাই এই লা‘নতের আওতায় আসে।) -
হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল বাই‘) ৪/১৮৫:
“সুদী কারবারে সাহায্যকারী সব ধরনের কাজ হারাম।” - ফাতাওয়া উসমানী ২/৩০-৩২:
“সুদী ব্যাংকের চাকরি করা, সুদী লেনদেন লেখা, হিসাব রাখা—সবই হারাম। এ জাতীয় চাকরি অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে। কোনো অবস্থায় এর বৈধতা নেই।”
- রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল বাই‘) ৪/১৮৫:
সুতরাং প্রশ্নোক্ত মহিলার স্বামীর জন্য ব্যাংকের চাকরি চালিয়ে রাখা জায়েয নয়। বিয়ের সময় অঙ্গীকার করলেও এখনও তা পালন না করা দীর্ঘসূত্রিতা। অন্য চাকরি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ ইসলামে নেই। বরং হারাম উপার্জন থেকে ফিরে আসা ফরয (ওয়াজিব)।
২. “বেবি প্ল্যানিং” (সন্তান ধারণ বিলম্বিত করা) এর বিধান
মূলনীতি: ইসলাম সন্তান ধারণকে উৎসাহিত করে এবং নেক সন্তান লালন-পালন করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কিন্তু কোনো প্রকার স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয নয়। তবে অস্থায়ীভাবে (যেমন পিল, কনডম ইত্যাদি ব্যবহার) সন্তান ধারণে কিছুকাল বিলম্ব করা কতিপয় বৈধ কারণ সাপেক্ষে জায়েয আছে।
বৈধ কারণসমূহ:
- শারীরিক অসুস্থতা বা সন্তান পালনে অক্ষমতা
- দুধপানকালীন বিরতি
- অস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট (তবে শর্ত হলো হালাল উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং হারামকে স্থায়ী আশ্রয় হিসেবে নেওয়া যাবে না)
অবৈধ কারণ:
- ভবিষ্যতে রিযিকের ভয়
- সম্পদের প্রতি লোভ
- স্বামী-স্ত্রীর কেবল ভোগবিলাসিতা
হানাফী ফিক্বহে স্পষ্ট:
-
ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩৫৬:
“অস্থায়ীভাবে গর্ভনিরোধক ব্যবহার জায়েয, যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সম্মত হয় এবং কোনো স্থায়ী ক্ষতি না হয়। তবে অপছন্দনীয় (যেহেতু নবীপ্রেম ও উম্মত বৃদ্ধির বিরোধী) বলে কেউ কেউ বলেছেন।” -
ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/৩৪২:
“অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ সন্তান সংখ্যা সীমিত করতে চায়, এটি বৈধ নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করে সন্তান গ্রহণ করাই উত্তম। তবে যদি চরম দারিদ্র্য ও অপারগতা থাকে, তাহলে কিছুদিন অপেক্ষা করা জায়েয হতে পারে—কিন্তু শর্ত হলো হালাল উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।” -
বেহেশতী জেওর (ইংরেজি অনুবাদ, অংশ ৮, অধ্যায় ৪):
“সন্তান ধারণে বিলম্ব করা জায়েয, যদি বৈধ শর‘ঈ ওজর থাকে। কিন্তু হারাম উপার্জন থেকে বিরত না থেকে শুধু ‘হালাল ইনকামের অপেক্ষায়’ থাকা গ্রহণযোগ্য ওজর নয়। কারণ হারাম থেকে বর্তমানে বিরত হওয়া তার ওপর ফরয।”
ঐ মহিলার জন্য নির্দিষ্ট ফতোয়া
মহিলা দ্বীনদার ও সংকটাপন্ন। তার স্বামীর ব্যাংকের চাকরি বন্ধ করা ফরয। তারা যদি “বেবি প্ল্যানিং” করে সন্তান নেওয়া বিলম্বিত করতে চান, তাহলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে:
প্রথমত: স্বামীকে অবিলম্বে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিতে হবে। অন্য চাকরি না মিললেও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ছেড়ে দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ (সূরা আত-তালাক, ২-৩)
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (প্রত্যেক সংকট থেকে) বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
দ্বিতীয়ত: মহিলার পক্ষ থেকে স্বামীকে এই ফরয আদায়ে সাহায্য করা উচিত। এমনকি প্রয়োজনে অস্থায়ীভাবে স্ত্রী নিজে ঘরে কাজ করে বা (পর্দার মধ্যে থেকে) অনলাইনভিত্তিক হালাল কাজ করে সংসারে সহায়তা করতে পারেন।
তৃতীয়ত: “বেবি প্ল্যানিং” (অর্থাৎ এখন গর্ভধারণ না করে অপেক্ষা করা) কেবলমাত্র তখনই জায়েয হবে, যদি উভয়ের সম্মতি থাকে এবং স্থায়ীভাবে সন্তান না নেওয়ার উদ্দেশ্য না হয়। কিন্তু এখানে মূল সমস্যা হলো স্বামীর হারাম ইনকাম। এই সমস্যা সমাধান না করে শুধু “হালাল ইনকামের অপেক্ষায়” সন্তান পিছানো মাকরূহ ও শরী‘আতের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। কারণ প্রচেষ্টা তো করতে হবে—হারাম এখনই ছাড়তে হবে; আর সন্তান আল্লাহর দান, তিনি তার রিযিকের জিম্মাদার।
সুনির্দিষ্ট ফতোয়া:
- স্বামী ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার আগ পর্যন্ত বেবি প্ল্যানিং করা জায়েয নয় বলে মনে করা অধিক সতর্ক। বরং স্বামীর কর্তব্য হলো ফোরআন চাকরি ছেড়ে দেওয়া। এরপর হালাল রিযিকের সন্ধান করতে করতে সন্তান ধারণ করা সুন্নাত ও প্রশংসিত কাজ।
- যদি স্বামী চাকরি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায় বা বিলম্ব করে, তাহলে স্ত্রীর উচিত তাকে ইসলামের দৃষ্টিতে উপদেশ দেওয়া। এমন অবস্থায় স্ত্রী নিজেও চাইলে অস্থায়ী গর্ভনিরোধক ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু তা অপছন্দনীয় (মাকরূহ তানযীহি) হবে।
উত্তম পন্থা:
স্ত্রী স্বামীকে বোঝান যে তারা এখনই একটি নেক সন্তানের জন্য দু‘আ করুক; হারাম থেকে ফিরে আসুক; আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুক। রিযিক ফিরে আসবে। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর অভিমত: “হারাম এড়াতে গিয়ে কারো রিযিক কমে না, বরং বরকত বাড়ে।”
উপসংহার
প্রশ্নোক্ত মহিলার জন্য উত্তম হলো:
- স্বামীকে আদেশ করুন—যত দ্রুত সম্ভব ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিন। অন্য চাকরি না পেলেও ছাড়ুন। আল্লাহ বিকল্প দেবেন।
- বেবি প্ল্যানিং (গর্ভধারণে বিলম্ব) করা জায়েয নেই এ অবস্থায়; বরং তাওয়াক্কুল করে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন এবং হালাল রিযিকের পথে এগিয়ে চলুন।
- উভয় মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং হালাল উপার্জনের তাওফীক চান।
আল্লাহ আমাদের সকলকে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিন। আমীন।