সূরা কাহাফ শুক্রবার রাতে তিলাওয়াত করা যাবে কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এই সওয়াবটা কি বৃহস্পতিবার শেষ হলে সন্ধ্যার পর অর্থাৎ শুক্রবার রাতে তিলাওয়াত করলে পাওয়া যাবে? নাকি এটা দিনের আমল?
Answer
সূরা কাহাফ তিলাওয়াত: শুক্রবার রাতে কি সওয়াব পাওয়া যাবে?
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি হলো—
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ
“যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করে, তার জন্য দুই জুমু‘আর মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত একটি নূর জ্বলজ্বল করতে থাকে।”
(বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান: ২৪৪৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক: ২/৩৯৯)
ইসলামী দিন গণনা সূর্যাস্তের মাধ্যমে শুরু হয়। তাই শুক্রবারের রাত (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর) থেকেই শুক্রবারের দিন শুরু হয়। অধিকাংশ হানাফী ফকীহ ও মুফাসসিরের মতে, এই হাদীসের নির্দেশিত ‘দিন’ বলতে বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। নিম্নে হানাফী কিতাবসমূহের উদ্ধৃতি ও বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
হানাফী ফিকহের দলিল ও ব্যাখ্যা
১. ‘ইয়াওম’ শব্দের পরিভাষিক অর্থ:
কুরআন ও হাদীসে ‘ইয়াওম’ (দিন) বলতে প্রায়ই রাতসহ পূর্ণ ২৪ ঘণ্টাকে বোঝানো হয়। যেমন—
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِلَى اللَّهِ تُرْجَعُ الْأُمُورُ
তবে বিশেষ বিশেষ স্থানে ‘ইয়াওম’ দ্বারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিনের আলোও উদ্দেশ্য হতে পারে। হাদীসের ভাষ্য ও সাহাবাদের আমল দেখে ইমামগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, এখানে ‘ইয়াওমুল জুমু‘আ’ বলতে জুমু‘আর রাতসহ গোটা দিন বোঝানো হয়েছে।
২. হানাফী গ্রন্থসমূহের মত:
-
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ শফী) : সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের সময় জুমু‘আর দিন সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হয়। তাই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর (শুক্রবারের রাত) তিলাওয়াত করলেও হাদীসের সওয়াব পাওয়া যাবে।
(ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৯৩; মাআরিফুল কুরআন, ৬/৪৮৫) -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) : জুমু‘আর দিনের আমল রাত থেকেই শুরু হয়। সুতরাং বৃহস্পতিবার মাগরিবের পর সূরা কাহাফ পড়া সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৩৮) -
ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দ) : জুমু‘আর রাত অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতকে ‘লাইলাতুল জুমু‘আ’ বলা হয় এবং এতে সূরা কাহাফ পড়া মুস্তাহাব।
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩১৩) -
বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী) : “সূরা কাহাফ জুমা‘র দিন (শুক্রবারের রাত থেকে জুমার সন্ধ্যা পর্যন্ত) পড়া খুবই ফজিলতপূর্ণ।”
(বেহেশতী জেওর, ২/২৫৭) -
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) : তিনি ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন— ‘জুমু‘আর দিনের ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো রাত থেকে শুরু করা মুস্তাহাব, যেমন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত।’
(রদ্দুল মুহতার, ২/১৭৪)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
| বিষয় | বিস্তারিত | |------|-----------| | শুক্রবারের রাত (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর) | হ্যাঁ, এই সময় সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করলে হাদীসের বর্ণিত সওয়াব পাওয়া যাবে। | | শুক্রবারের দিন (সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত) | সর্বোত্তম ও বেশি ফজিলতপূর্ণ সময়। তবে রাত পড়লেও সওয়াব কম হবে না। | | শুক্রবার সূর্যাস্তের পর (শনিবার রাত) | আর ‘জুমু‘আর দিন’ গণ্য হয় না। তাই এই সময় তিলাওয়াত করলে হাদীসের বিশেষ ফজিলত প্রযোজ্য নয়, তবে সাধারণ তিলাওয়াতের সওয়াব থাকবে। |
সারসংক্ষেপ: তিন দিনের মধ্যে সূর্যাস্তের সময়সীমার ভিত্তিতে শুক্রবার রাত (বৃহস্পতিবার মাগরিব থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত) সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করাই হাদীসের নির্দেশিত ‘ইয়াওমুল জুমু‘আ’র আমল বলে গণ্য হবে।
গুরুত্বপূর্ণ টিকা
- হানাফী মাযহাবে আমলের ক্ষেত্রে সহজতা ও প্রশস্ততা রয়েছে। তাই কারো পক্ষে জুমু‘আর দিন পড়া সম্ভব না হলে রাতেও পড়তে পারেন।
- হাদীসটি জুমু‘আর দিনের নির্দেশ হলেও রাতের মাধ্যমে দিন শুরু হওয়ায় ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তার শাগরিদগণ রাতকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
- সূরা কাহাফের ফজিলত শুধু জুমু‘আর সাথেই সীমাবদ্ধ নয়; যেকোনো সময় তিলাওয়াত করলে সওয়াব পাওয়া যায়।
প্রশ্নকারীর জন্য সুপারিশ
শুক্রবার রাতে (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর) এবং শুক্রবার দিনে— যেকোনো সময় সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করুন। তবে উত্তম হলো দিনে জুমু‘আর খুতবার আগে বা পরে পড়া। যদি দিনে পড়া সম্ভব না হয়, তবে রাতেই পড়ে নিন— ইনশাআল্লাহ হাদীসের ওয়াদাকৃত নূর ও বরকত আপনি লাভ করবেন।
তথ্যসূত্র: ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, বেহেশতী জেওর, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরী এবং সহীহ হাদীস।