ফেসবুক পেজ থেকে কন্টেন্ট শেয়ার করে ইনকাম কি হালাল?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2239
Questioner: Ummu Sowban
Question Asked: 02 Jul 2026, 08:59 PM
Reviewed & Published: 02 Jul 2026, 09:08 PM
Views: 62
Tokens: 4,851
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম উস্তাদ ফেইসবুক পেজ থেকে ভিডিওর মাধ্যমে জে ইনকাম হয় টা হারাম জানি কিন্তু কনটেন্ট বা লেখা, স্টোরি শেয়ার এর মাধ্যমে জে ইনকাম হয় তা হালাল হারাম হবে?

Answer

উত্তর

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আলহামদুলিল্লাহ, আপনি প্রশ্নটি করেছেন। ফেসবুক বা যেকোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ইনকামের বিধান নির্ভর করে সেই ইনকামের উৎস ও মাধ্যম কতটুকু শরিয়তসম্মত, তার ওপর। আপনি ভিডিওর মাধ্যমে ইনকামকে হারাম বলেছেন—সেটি সঠিক যদি ভিডিওতে এমন কিছু থাকে যা শরিয়ত নিষিদ্ধ করেছে (যেমন: গান-বাজনা, অশ্লীলতা, গীবত, মিথ্যা প্রচার ইত্যাদি)।

এখন আপনার মূল প্রশ্ন: লেখা, স্টোরি বা কন্টেন্ট শেয়ার করে যে ইনকাম হয়, তা কি হালাল নাকি হারাম?


হানাফি ফিকহের মূলনীতি

হানাফি মাজহাবের উসূল অনুযায়ী, কোনো উপার্জন হালাল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি:

  1. উপার্জনের মাধ্যম (Wasilah) হালাল হতে হবে।
  2. উপার্জনের বিনিময় (Mubadalah) বা বস্তুটি নিজেই (যার বিনিময়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে) শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ না হতে হবে।

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ এ নীতি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, কোনো জিনিসের বিনিময় নেওয়া যদি শরিয়তসম্মত হয় এবং সেই জিনিসটি নিজেও পবিত্র ও বৈধ হয়, তাহলে সেই উপার্জন হালাল। আর যদি জিনিসটি নাপাক বা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তার বিনিময় নেওয়াও হারাম। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪; কিতাবুল বুয়ূ')


লেখা, স্টোরি বা কন্টেন্ট শেয়ারের বিধান

এখন আপনার বলা লেখা, স্টোরি বা কন্টেন্ট যদি নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ করে, তাহলে তা থেকে ইনকাম করা হালাল:

  • কন্টেন্টটি শরিয়তসম্মত: কন্টেন্টে কোনো প্রকার মিথ্যা, কুফর, শিরক, অশ্লীলতা, গীবত, চোগলখুরি, প্রতারণা বা অনৈতিক বিষয় থাকবে না। বরং সেটি সত্য, কল্যাণকর, শিক্ষামূলক বা অন্ততপক্ষে নিরপেক্ষ হতে হবে।
  • কন্টেন্টটি হারাম কিছুর প্রচার না করে: যেমন শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ কোনো পণ্য (মদ, সিগারেট, জুয়া), নিষিদ্ধ কাজ (অশ্লীলতা, অবৈধ সম্পর্ক) বা নিষিদ্ধ মতাদর্শের প্রচার করা যাবে না।
  • ইনকামের মাধ্যমটি বৈধ: আপনি যদি সরাসরি লেখা বা কন্টেন্ট বিক্রি করে টাকা পান (যেমন: ব্লগিং, কন্টেন্ট রাইটিং এর পারিশ্রমিক), অথবা শেয়ার করার কারণে প্ল্যাটফর্ম থেকে যদি বৈধ উপায়ে অর্থ আসে (যেমন: বিজ্ঞাপন, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং)—যে বিজ্ঞাপন নিজে হারাম না—তবে তা হালাল।

সুতরাং, যদি আপনার শেয়ার করা লেখা, স্টোরি বা কন্টেন্ট সম্পূর্ণরূপে শরিয়তসম্মত ও বৈধ হয়, এবং সেই কন্টেন্টের কারণে আপনি যে ইনকাম করছেন তা কোনো হারাম উৎস (যেমন: সুদ, জুয়া, হারাম বিজ্ঞাপন) থেকে না হয়, তাহলে সেই ইনকাম হালাল হবে।


যখন ইনকাম হারাম বা সন্দেহজনক হবে

নিচের ক্ষেত্রগুলোতে লেখা/কন্টেন্ট শেয়ার করেও ইনকাম হারাম বা মাকরুহ হবে:

  1. কন্টেন্ট নিজেই হারাম: যদি আপনি এমন কোনো লেখা, স্টোরি বা কন্টেন্ট শেয়ার করেন যা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী (যেমন: মিথ্যা ইসলামবিরোধী তথ্য, কবিরা গুনাহের প্রচার, অশ্লীল সাহিত্য) এবং সেই শেয়ারের জন্যই আপনি টাকা পান, তাহলে তা হারাম। কারণ আপনি হারাম জিনিসের প্রচারের বিনিময় নিচ্ছেন।
  2. ইনকামের মাধ্যম হারাম: যদি আপনার পেজের আয় আসে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, এবং সেই বিজ্ঞাপন হারাম পণ্য বা সেবা (যেমন: জুয়ার সাইট, মদের কোম্পানি, অশ্লীল অ্যাপ) প্রচার করে, তাহলে সেই বিজ্ঞাপনের টাকা হারাম হবে। এই টাকা শুধু কন্টেন্ট শেয়ারের কারণে আসে, কিন্তু এর উৎস হারাম।
  3. ইনকামের নিয়ত নিয়ে সমস্যা: যদি কন্টেন্টটি সঠিক হয়, কিন্তু আপনার ইনকাম আসে এমনভাবে যা প্রতারণামূলক (যেমন: ক্লিকবেট, মিথ্যা শিরোনাম, ফেক নিউজ), তাহলে সেটিও হারাম

হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে দলিল

  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) তে বলা হয়েছে: "যে কোনো উপার্জন যা বৈধ পণ্য ও বৈধ মাধ্যমের মাধ্যমে হয়, তা হালাল। আর যা নাপাক বস্তু বা নিষিদ্ধ মাধ্যমের মাধ্যমে হয়, তা হারাম।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৩৫)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন, "ব্লগ, লেখালেখি বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে উপার্জন হালাল, তবে শর্ত হলো বিষয়বস্তু গুনাহ থেকে মুক্ত হতে হবে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৪৫)
  • ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) বলেন, "বর্তমান যুগে অনলাইন কন্টেন্ট থেকে আয় করা জায়েজ, যদি কন্টেন্ট শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন না করে এবং আয়ের উৎস সুদ, ঘুষ, জুয়া ইত্যাদি না হয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২৫)

সুবিধার্থে সংক্ষিপ্ত ফয়সালা

| কন্টেন্টের ধরন | ইনকামের বিধান | শর্ত | | :--- | :--- | :--- | | শরিয়তসম্মত লেখা/স্টোরি (ইসলামিক, শিক্ষামূলক, নিরপেক্ষ) | হালাল | শর্ত: ইনকামের উৎস (বিজ্ঞাপন/স্পনসর) নিজেও হালাল হতে হবে। | | হারাম কন্টেন্ট (অশ্লীল, মিথ্যা, গীবত) | হারাম | যেকোনো অবস্থায় হারাম | | হালাল কন্টেন্ট + হারাম বিজ্ঞাপন (যেমন: জুয়ার অ্যাড) | হারাম | বিজ্ঞাপনের টাকা হারাম হওয়ায় পুরো আয় সন্দেহযুক্ত। | | হালাল কন্টেন্ট + হালাল বিজ্ঞাপন (যেমন: বই, কসমেটিকস) | হালাল | সম্পূর্ণ বৈধ। |


আপনার জন্য নির্দিষ্ট উত্তর

আপনি যদি ফেসবুক পেজে শুধুমাত্র লেখা (কন্টেন্ট), স্টোরি বা পোস্ট শেয়ার করে থাকেন, যাতে:

  • ইসলামের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
  • কোনো হারাম জিনিসের প্রচার নেই।
  • ইনকামের টিকা সরাসরি আপনার কন্টেন্টের জন্য (যেমন: পেজের মেম্বারশিপ, ডোনেশন) অথবা হালাল পণ্যের বিজ্ঞাপন থেকে আসে

তবে সেই ইনকাম হালাল হবে।

তবে সাবধানতা: বর্তমানে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন পদ্ধতি (Ad Breaks) অত্যন্ত মিশ্রিত। অনেক সময় হারাম ও হালাল উভয় ধরনের বিজ্ঞাপনই আসে। তাই যদি সম্ভব হয়, আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার পেজে দেখানো সব বিজ্ঞাপন হালাল পণ্যের। নইলে আয় মাকরুহ তানযীহি (নিকৃষ্ট) বা কিছু ক্ষেত্রে হারাম হতে পারে।

উত্তম পদ্ধতি: সরাসরি কন্টেন্ট কিনে বা স্পনসরশিপের মাধ্যমে বৈধ পণ্যের প্রচার করে আয় করাই অধিক নিরাপদ।


সারসংক্ষেপ

  • ভিডিওর মাধ্যমে হারাম ইনকাম: যা আপনি সঠিক বলেছেন (যদি ভিডিওতে গান, অশ্লীলতা বা শরিয়াহ বিরোধী কোন কিছু থাকে)।
  • লেখা/কন্টেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে ইনকাম: হালাল হবে, যদি কন্টেন্ট নিজে বৈধ হয় এবং আয়ের উৎস (বিজ্ঞাপন, স্পনসর) নিজেও হারাম না হয়।
  • সন্দেহজনক হলে পরিহার করাই উত্তম। হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বস্তু থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে পবিত্র রাখে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.