গীবত ও মিথ্যার গুনাহ মাফের ইসলামি পদ্ধতি, ক্ষমা চাওয়ার সাহস না থাকলে করণীয় কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1994
Questioner: Al-Muhammad Zunayed
Question Asked: 24 Jun 2026, 09:27 PM
Reviewed & Published: 24 Jun 2026, 09:31 PM
Views: 94
Tokens: 4,766
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমি আমার এক বন্ধুর কাছে এলাকার এক মানুষের নামে খুবই বাজে একটা মন্তব্য করি বিনা কারণে। সেই বন্ধুটি সেই মানুষের কাছে আমার করা মন্তব্যটি বলে দেয়। এবং সেই মানুষটি আমার সাথে দেখা করে বলে আর দুঃখ ও ক্ষোব প্রকাশ করে, আমি ওকে সরাসরি বলে দেই, "আমি কিছু বলেনি সে বন্ধু মিথ্যা বানিয়ে বলেছে ওকে আমি দেখে নিবো।" সাধারণ ভাবেই হয়তো সে বিশ্বাস করে নি যে আমার বন্ধু মিথ্যা বলেছে। আমি ওকে বলেছি তাও কিছু মনে করো না, সে বলেছা না আমি কোনো কিছুতেই কিছু মনে করিনা। তবে আমি জানি সে কষ্ট পেয়েছে, না হলে আমাকে এই বিষয়ে আর বলতো না। এখন আমার তার কাছে মাফ চাওয়ারও সাহস নেই, আবার না চাইলেও মনে খারাপ লাগছে?

Answer

উত্তর:
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার কাজটি দ্বিগুণ গুনাহ: (১) গীবত (অনুপস্থিতিতে কারো দোষ বর্ণনা) এবং (২) মিথ্যা বলা (অভিযোগ অস্বীকার করে বন্ধুকে দোষ দেওয়া)। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, এই উভয় পাপের জন্য তওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা অপরিহার্য। তবে, সরাসরি ক্ষমা চাইতে আপনি দ্বিধায় আছেন – এই অবস্থায় ইসলামের নির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো।


প্রথমত: গীবত ও মিথ্যার তওবার শর্ত

গীবত ও মিথ্যার গুনাহ মাফ করতে চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে:
১. গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (আপনি আছেন)
২. সঙ্গে সঙ্গে গীবত ও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা
৩. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প
৪. যার গীবত করা হয়েছে, তার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়া – অথবা তার জন্য দোয়া ও নেক কাজ করা (যদি সরাসরি ক্ষমা চাইতে আরো ক্ষতি হয়)

রেফারেন্স:

  • সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২: “হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক সন্দেহ থেকে বাঁচ, … আর তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত না করে।”
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৯: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মানে কোনো কথা (গীবত) করে, কিয়ামতের দিন তার জন্য প্রতিশোধ নেওয়া হবে।”
  • ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৯: “গীবত করলে গীবতকৃত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া ওয়াজিব। কিন্তু যদি তা করলে ফিতনা বা শত্রুতা বাড়ে, তবে তার জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করবে।”
  • রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৩: “যে ব্যক্তি গীবত করে, তার তওবা তখনই কবুল হবে, যখন গীবতকৃত ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়া।”

দ্বিতীয়ত: আপনার বর্তমান অবস্থানের বিচার

আপনি যখন ব্যক্তিটির সামনে মিথ্যা বলেছেন “বন্ধু মিথ্যা বানিয়ে বলেছে”, এটি নতুন করে গুনাহ – কারণ এটি মিথ্যা ও পরনিন্দা। তবে ব্যক্তিটি যদি আপনার প্রতি সন্দেহ বা কষ্ট নিয়েই থাকে, তাহলে আপনার গীবতের প্রভাব এখনো বর্তমান।

হানাফি ফিকাহর নীতি:

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৫: “গীবতকৃত ব্যক্তি যদি জানেই যে আপনি গীবত করেছেন, তবে তার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়াই শ্রেয়। তবে যদি ক্ষমা চাইতে গিয়ে আরো অশান্তি হয়, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করলেও আল্লাহ মাফ করবেন, কিন্তু হক আদায়ে ব্যক্তির হক বাকি থাকবে – তাই তার জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার ও নেকি পাঠিয়ে দিন।”

তৃতীয়ত: এখন আপনার করণীয়

১. আল্লাহর কাছে তওবা করুন – দুই রাকাত সালাতুল তওবা পড়ুন, গুনাহ স্বীকার করুন এবং কাঁদতে কাঁদতে মাফ চান।
২. মিথ্যার জন্য পৃথক তওবা – আপনার বন্ধুর কাছে গিয়ে বলুন, “ভাই, আমি তোমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছি – মাফ করো।” এটি ফরজ।
৩. যার গীবত করেছেন, তার সাথে আচরণ:

  • বিকল্প ১ (উত্তম): সাহস করে সরাসরি বলুন, “ভাই, আমি ভুলে আপনার ব্যাপারে বাজে কথা বলেছিলাম, মাফ করে দিন।”
  • বিকল্প ২ (যদি সাহস না হয়): তার জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন, মাগফিরাত ও নেকি পাঠিয়ে দিন। যেমন বলবেন, “হে আল্লাহ! আমি অমুকের প্রতি যুলুম করেছি, আপনি তার পক্ষ থেকে আমার নেকি দিয়ে দিন।”
  • ইবনে আবেদিন (রদ্দুল মুহতার, ৯/৪৭০): “যদি গীবতকারী ভয় করে যে ক্ষমা চাইলে শত্রুতা বাড়বে, তবে সে তার জন্য দোয়া করবে এবং তার প্রশংসা প্রকাশ করবে।”

৪. ভবিষ্যতে সংযম – নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিন, কখনো কারো গীবত করবেন না। কারণ গীবত মানুষের ‘ইজ্জত খাওয়া’র মতো (সূরা আল-হুমাযা)।


চূড়ান্ত ফতোয়া

আপনার গুনাহ মাফ হতে পারে, তবে শর্তসাপেক্ষে:

  • যদি আপনি ব্যক্তিটির কাছে ক্ষমা না চান, তাহলে আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ আপনার তওবা পূর্ণাঙ্গ কবুল করবেন না, যতক্ষণ না সে ক্ষমা করে (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪৯)।
  • যেহেতু আপনি জানেন তিনি কষ্ট পেয়েছেন, সুতরাং তাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। আপনি বলছেন, “সে বলেছে কিছু মনে করে না” – কিন্তু আপনার ভেতরের কষ্ট আপনাকে বলছে সে সত্যিই মেনে নেয়নি। তাই অন্তত একবার সরাসরি ফোনে বা দেখা করে বলুন:

    “ভাই, আমার ভুলেই আপনার নামে বাজে কথা বলেছিলাম। আমি ভীষণ লজ্জিত। আমার বন্ধুকে মিথ্যা বলার ভুলও করেছি। আপনাদের দুজনকে মাফ করে দিন।”

  • এরপর ব্যক্তিটি যদি মাফ করে দেয়, তবে আপনার গুনাহ মাফের আশা করুন। আর যদি সে মাফ না-ও করে, তবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করলেন – বাকি আল্লাহর ইচ্ছা।

আল্লাহর কাছে দোয়া করুন:

“রব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন” (সূরা আল-আ’রাফ: ২৩)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.