নানীর ওয়াদা পূরণ না হওয়া ও আত্মীয় মারা যাওয়ার পর করণীয়
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
প্রশ্নটি বুঝতে পেরেছি। আপনার নানী আপনার আম্মাকে বলে গিয়েছিলেন যে, তার এক আত্মীয়ের দেখাশোনা করতে, ফলমূল ও জামাকাপড় দিতে। কিন্তু আপনার আম্মার সেই কাজ করার সুযোগ হয়নি এবং সেই আত্মীয়ও মারা গেছেন। এখন কী করা যায় এবং কথা রাখতে না পারার কারণে গুনাহ হবে কিনা, তা জানতে চেয়েছেন।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
১. ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) পূরণের গুরুত্ব
ইসলামে ওয়াদা পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।" (সূরা আল-মায়েদা: ১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, তার খিয়ানত করে।" (সহীহ বুখারী: ৩৩, সহীহ মুসলিম: ৫৯)
তবে এখানে বিষয়টি ভিন্ন। আপনার নানী আপনার আম্মাকে একটি অনুরোধ করেছিলেন, যা একটি ওয়াদা বা অঙ্গীকার হিসেবে গণ্য হবে কিনা - তা বিবেচ্য।
২. অক্ষমতার কারণে ওয়াদা ভঙ্গ করা
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ওয়াদা করার পর তা পূরণে সক্ষম না হন, তাহলে ইসলামী বিধান অনুযায়ী:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যদি কোনো ওয়াদা পূরণে বাধ্যতামূলক অপারগতা থাকে, তাহলে তার জন্য গুনাহ হবে না। (রাদ্দুল মুহতার, ৪/৪২২)
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতেও অনিচ্ছাকৃত কারণে ওয়াদা ভঙ্গ করলে গুনাহ হয় না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করলে গুনাহ হবে।
৩. আপনার আম্মার করণীয়
যেহেতু সেই আত্মীয় মারা গেছেন এবং সরাসরি তার দেখাশোনা করার সুযোগ আর নেই, তাই আপনার আম্মা নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে পারেন:
(ক) দান-সদকা করা
মৃত ব্যক্তির জন্য দান-সদকা করা যায় এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি কাজ অব্যাহত থাকে: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)
সুতরাং আপনার আম্মা সেই আত্মীয়ের নামে দান-সদকা করতে পারেন। যেমন:
- কোনো এতিম বা মিসকিনকে খাবার দেওয়া
- মসজিদ বা মাদ্রাসায় দান করা
- পানি বা ফলমূল বিতরণ করা
(খ) দোয়া ও ইসালে সওয়াব করা
মৃত আত্মীয়ের জন্য দোয়া করা এবং কুরআন তিলাওয়াতের সওয়� পৌঁছানো যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের মতে, ইসালে সওয়াব জায়েয এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। (ফাতাওয়া উসমানি, ৫/২২৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৭৮)
(গ) নিজের জন্য ইস্তিগফার করা
যদি আপনার আম্মা এই কাজটি করার জন্য মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে থাকেন কিন্তু সক্ষম না হন, তাহলে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ কারো উপর তার সক্ষমতার অধিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)
৪. গুনাহ হবে কিনা?
যেহেতু আপনার আম্মার ইচ্ছা ছিল কাজটি করার, কিন্তু সুযোগ না হওয়ায় করতে পারেননি এবং সেই আত্মীয়ও মারা গেছেন, তাই ইচ্ছাকৃত ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ হবে না ইনশাআল্লাহ। কারণ:
- এটি একটি ওয়াদা ছিল নাকি শুধু একটি অনুরোধ - তা পরিষ্কার নয়। সাধারণত নানী-নাতনির মধ্যে এরকম কথাবার্তা ওয়াদা হিসেবে গণ্য না-ও হতে পারে।
- আপনার আম্মা ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করেননি, বরং অক্ষমতার কারণে পারেননি।
- সেই আত্মীয় মারা যাওয়ায় সরাসরি দেখাশোনার সুযোগ আর নেই।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"যদি কেউ কোনো ওয়াদা করে এবং তা পূরণে অক্ষম হয়, তাহলে তার জন্য গুনাহ নেই, বরং আল্লাহ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান দেবেন।" (রাদ্দুল মুহতার, ৪/৪২২)
উপসংহার ও পরামর্শ
১. আপনার আম্মা সেই আত্মীয়ের জন্য দান-সদকা করতে পারেন (ফলমূল, খাবার, জামাকাপড় ইত্যাদি)। ২. মৃত আত্মীয়ের জন্য দোয়া করতে পারেন। ৩. ইসালে সওয়াবের নিয়তে কিছু নেক আমল করতে পারেন। ৪. কথা রাখতে না পারার জন্য কোনো গুনাহ হবে না ইনশাআল্লাহ, কারণ এটি অনিচ্ছাকৃত ও অক্ষমতাজনিত কারণে হয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার আম্মা যদি চান, তিনি ঐ আত্মীয়ের কোন গরিব আত্মীয় বা এতিমকে কিছু দিতে পারেন, যা নানীর ইচ্ছা পূরণের বিকল্প হতে পারে।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।