স্বপ্নের ব্যাখ্যা এবং বিয়ের জন্য ইস্তেখারার দোয়ার পদ্ধতি কি?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি রবের অনেক গুনাহগার একজন বান্দা ছিলাম। কিন্ত রব বারবারই আমাকে তার দিকে টেনে এনেছেন। আমি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও, সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে অনেক গর্হিত পাপে জড়িয়ে পরেছিলাম। কিন্ত গতবছরের এপ্রিল/মে মাসের দিকে আমি সম্পূর্ণ রূপে ইসলামকে কঠোর ভাবে পালন করা শুরু করি। আল্লাহ আমার মনকে অনেক নরম করে তৈরি করেছেন। আমি সবসময়ই একাকিত্বে ভুগতাম কারন আমার কখনোই কোনো বন্ধু বান্ধব ছিল না, এখনো নেই। পরিবারের সবাইও যে যার মতো ব্যস্ত। এ জন্য রবের সাথেই আমি সম্পর্ক তৈরি করেছি, তিনি আমাকে হেদায়েত দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বেশি পুরষ্কৃত তিনি আমাকে করেছেন "সত্য স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়ে"। আমি প্রায়ই বিভিন্ন স্বপ্ন দেখি যেগুলো আজ রাতে দেখলে পরদিনই সত্য হয়ে যায়। প্রায়ই স্বপ্নে দেখি হাদিস ব্যাখ্যা করছি বা বিভিন্ন আমল করার নির্দেশ পাচ্ছি। এসব স্বপ্ন কিছু কিছু আমল করার পর ঘুমানোর সময় দেখি আবার কিছু কিছু এমনিতেই আসে। তবে মেক্সিমামই সত্য হয়।
রিসেন্টলি আমি বিয়ের জন্য এক জায়গায় প্রস্তাব করেছি এবং ছেলেটিকে আমার খুবই পছন্দ হয়। তিনি খুবই ধার্মিক এবং নরম মনের মানুষ। তিনি আমাদের বাসায় আমাকে দেখতে আসার আগে ১ সপ্তাহ আমি আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে কেঁদেকেটে বার বার দুয়া করেছি, যদি তার সাথে আমার নসিব লিখা না থাকে, তবে তার সাথে যাতে আমার কখনোই দেখা না হয়, এই প্রস্তাব যাতে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত না আসে"।
এর আগেও এক প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আমি এমন দুয়া করেছিলাম, সব পজেটিভ থাকা সত্ত্বেও সেই প্রস্তাব বাড়ি অব্দি আসে নি। দেখাদেখির আগেই প্রস্তাব টা চলে গিয়েছিল।
তো বর্তমান প্রস্তাব আমাদের বাসায় আমাকে দেখতে আসার ১ সপ্তাহ আগে আমি একটা স্বপ্ন দেখি যে " পাত্রের মা আমাকে বলছে, তোমার সাথেই আমার ছেলেকে বিয়ে দিব। তোমার জন্য আসার সময় কি আনবো বলো? তখন আমি বলি যে, আমার জন্য একটা আংটি নিয়ে আইসেন"।
এই প্রস্তাবটিতে অল্প কিছু নিগেটিভ বিষয় থাকলেও শেষমেষ প্রস্তাবটি বাসা পর্যন্ত আসে এবং আমাকে তারা দেখে। যতটুকু মনে হলো পাত্র আমাকে পছন্দ করেছে কিন্ত তার পরিবার সম্মতি দেয় নি।
পাত্র বেশ ধার্মিক ও নরম মনের মানুষ। আমিও এমন মানুষকেই চাচ্ছিলাম। তারা না করে দেয়ার পর থেকে আমি খুবই ভেঙে পরেছি। আমার শুধু মন চাচ্ছে আমি তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য দোয়া করি। রব চাইলে তো তাকে স্বামী হিসেবে পেতেও পারি। কিন্ত পরক্ষণেই মনে হচ্ছে, আমি আগে খুব পাপী ছিলাম, আমার কি এমন পবিত্র মানুষকে চাওয়া ঠিক হবে? আমি তো ওনার যোগ্য না।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, একজন পাপী, যিনি রবের কাছে ফিরে এসেছেন, সে কি আল্লাহর কাছে নেককার পাত্র চাইতে পারবে?
আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা টাও একটু দিয়েন।
আল্লাহর কাছে আমি অনেক বলেছি যাতে তার সাথে দেখাই না হয়। না না কারনে প্রস্তাব টি ফিরে যেতে পারত, কিন্ত এর পর ও তার সাথে আমার দেখা হলো, আমি কি রবের কাছে তাকে স্বামী হিসেবে চেয়ে দুয়া করতে পারব?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারী বোন, আপনার দীর্ঘ ও মনোভাবাপন্ন প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি আপনার অতীতের পাপ ও বর্তমান তাওবার কথা উল্লেখ করেছেন এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পর তিনি আপনাকে সত্য স্বপ্ন দেখানোর মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছেন। বর্তমানে আপনি একজন ধার্মিক যুবককে পছন্দ করেছেন এবং তার পরিবার সম্মতি না দেওয়ায় আপনি ভেঙে পড়েছেন। আপনার প্রশ্ন হচ্ছে: (১) একজন পাপী ব্যক্তি, যে তাওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে এসেছে, সে কি নেককার পাত্র চাইতে পারে? (২) আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী? (৩) আপনি আগে দোয়া করেছিলেন যে, যদি তার সাথে আপনার নসিব না থাকে তবে যেন দেখা না হয়; কিন্তু দেখা হওয়ার পর এখন আপনি কি তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য দোয়া করতে পারবেন?
আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এবং সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহের (বিশেষত: শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, শায়খ ইবন বাজ, শায়খ আলবানী, শায়খ ইবন উসাইমীন, শায়খ সালিহ আল-ফাওযান) অনুসারে উত্তর দেব ইনশাআল্লাহ।
১. একজন পাপী (যে তাওবা করেছে) তার কি নেককার পাত্র চাওয়া জায়েজ?
উত্তর: নিঃসন্দেহে জায়েজ এবং উচিতও। বরং তাওবার পর আল্লাহর কাছে নেককার পাত্র চাওয়া একটি উত্তম দোয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার, ৫৩)
তাওবা কবুল হলে পূর্বের পাপ মুছে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ "যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে এমন হয়ে যায় যেন তার কোনো গুনাহই নেই।" (ইবন মাজাহ, হাদিস সহিহ; আলবানী সহিহাহতে উল্লেখ করেছেন)
তাই আপনার মনে এই হীনম্মন্যতা রাখবেন না যে, "আমি পাপী ছিলাম, তাই নেককার পাত্র পাওয়ার যোগ্য নই।" বরং আপনি এখন আল্লাহর কাছে ফিরে এসেছেন, তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। আপনি যদি এখন নেককার হন তবে নেককার পাত্র আপনার জন্য উপযুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ "দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য, আর দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য। আর পবিত্রা নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য, আর পবিত্র পুরুষরা পবিত্রা নারীদের জন্য।" (সূরা আন-নূর, ২৬)
তবে আপনি এখন পবিত্র, তাই পবিত্র পাত্র চাইতে পারেন। আর আপনার ঈমান ও আমল যত বাড়বে, আল্লাহ ততই ভালো জোড়া দেবেন। ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী (হাদিস সহিহ) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'যদি তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নেয়, যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে দাও। যদি তা না কর, তবে পৃথিবীতে বড় ফিতনা ও বিপর্যয় হবে।'"
সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে নেককার পাত্র চাইতে পারেন এবং চাইতে থাকুন। আপনার অতীতের গুনাহ আল্লাহর রহমতের সামনে কিছুই না।
২. আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা
আপনি যে স্বপ্ন দেখেছেন যে, পাত্রের মা বলছেন, "তোমার সাথেই আমার ছেলেকে বিয়ে দেব। তোমার জন্য কী আনবো?" এবং আপনি বলেছেন "আংটি নিয়ে আসুন"—এই স্বপ্নটি একটি সুসংবাদ হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ جُزْءٌ مِنْ سِتَّةٍ وَأَرْبَعِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ "সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।" (বুখারি ও মুসলিম)
আপনার পূর্বের স্বপ্নগুলো সত্য হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় আপনার স্বপ্ন সত্য স্বপ্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে স্বপ্নের ব্যাখ্যা সবসময় আক্ষরিক অর্থে নিতে হবে না। এখানে স্বপ্নটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, পাত্র ও তার পরিবার আপনার প্রতি আগ্রহী থাকতে পারে—এবং বাস্তবে আপনি দেখেছেন পাত্র আপনাকে পছন্দ করেছে। কিন্তু তার পরিবার সম্মতি দেয়নি। হতে পারে স্বপ্নটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ভালো খবর ছিল, কিন্তু আল্লাহ অন্য কিছু চেয়েছেন। অথবা স্বপ্নটি ছিল শয়তানের প্ররোচনা? না, যেহেতু আপনার আগের স্বপ্নগুলো সত্য হয়, তাই এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হতে পারে, তবে মানবীয় কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
শায়খ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: স্বপ্ন কোনো শরয়ি দলিল নয়; বরং এটি শুধু সুসংবাদ বা সতর্কবার্তা। কোনো সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ স্বপ্নের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; বরং বাস্তব অবস্থা ও ইসতিহারার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। (ফাতাওয়া নূরুন আলা দারব)
এক্ষেত্রে আপনার স্বপ্নটি ইতিবাচক ছিল, কিন্তু পাত্রের পরিবার রাজি না হওয়ায় বিয়েটি হয়নি। এতে আপনার দোয়া বা স্বপ্নের কোনো দোষ নেই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
৩. আগের দোয়া সত্ত্বেও এখন তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য দোয়া করা
আপনি বলেন, আপনি বিয়ের প্রস্তাব আসার আগে আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদে দোয়া করেছিলেন: "যদি তার সাথে আমার নসিব না থাকে, তবে যাতে এই প্রস্তাব আমার বাসায় না আসে।" কিন্তু প্রস্তাব এলো, এবং দেখা হলো। এখন আপনি কীভাবে বুঝবেন যে, এটি নসিব? প্রকৃতপক্ষে, আপনার দোয়া ছিল একটি শর্তযুক্ত দোয়া (conditional prayer) – যদি ভালো না হয়, তবে আসবে না। কিন্তু প্রস্তাব আসার অর্থ এই নয় যে, এটি আপনার জন্য ভালো; বরং হতে পারে এটি আপনার ইমান বা ধৈর্যের পরীক্ষা। অথবা হতে পারে এটি আপনার জন্য ভালো, কিন্তু পারিবারিক অসুবিধার কারণে হয়নি। আপনি দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে যা চেয়েছিলেন, তা ছিল আপনার কল্যাণের জন্য। কিন্তু আল্লাহ যা করেছেন, তাও আপনার কল্যাণের জন্যই।
এখন আপনি যদি সত্যিই তাকে পছন্দ করেন এবং তার ধার্মিকতায় সন্তুষ্ট হন, তবে আপনি ইস্তিখারা করুন এবং আল্লাহর কাছে তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য দোয়া চালিয়ে যেতে পারেন। শর্ত নেই যে, আগের দোয়ার কারণে এখন আর দোয়া করা যাবে না। বরং আপনি আগের দোয়াতে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চেয়েছিলেন; এখনো আপনি কল্যাণই চাইছেন। যদি সত্যিই এই বিয়ে আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণকর হয়, তবে আল্লাহ আপনাকে তা দান করবেন—হোক তা এই পাত্রের মাধ্যমেই বা অন্যভাবে।
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান বলেছেন: "দোয়া করা ইবাদত। আল্লাহর কাছে চাওয়া সর্বাবস্থায় জায়েজ, তবে দোয়ায় যেন গুনাহ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছেদ না থাকে।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া ফাওযান, ২/৩০১)
সুতরাং আপনি নিশ্চিন্তে তার জন্য দোয়া করতে পারেন, তবে ইসতিহারা পড়বেন এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকবেন। আর মনে রাখবেন, আল্লাহর কাছেই সব কল্যাণ। যদি এই বিয়েটি না-ও হয়, তার চেয়ে উত্তম কিছু আল্লাহ আপনার জন্য নির্ধারণ করবেন—যা আপনি এখন কল্পনাও করতে পারেন না।
সারসংক্ষেপ ও উপদেশ
১. আপনার অতীতের পাপ আল্লাহ ক্ষমা করেছেন। আপনি এখন নেককার বান্দা। তাই নেককার পাত্র চাইতে আপনার কোনো বাধা নেই। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
২. স্বপ্নটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত ছিল, যা পাত্রের ভালোবাসার বা প্রস্তাবের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এতে আপনার দোষ নেই। স্বপ্নকে চূড়ান্ত দলিল না বানিয়ে ইসতিহারা ও বাস্তবতার ওপর নির্ভর করুন।
৩. আপনার আগের দোয়া (যদি নসিব না থাকে, আসবে না) আল্লাহর কাছে আপনার আন্তরিকতা প্রকাশ করেছিল। এখন আপনি পাত্রকে ভালোবাসেন, তাই তাকে পাওয়ার দোয়া করতে পারেন। কিন্তু ইসতিহারা করুন এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করুন।
৪. ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ পরীক্ষা দেন যাদের ভালোবাসেন। আপনি তাওবা করে ফিরেছেন, এখন ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেবেন।
আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করুন, আপনার ঈমান মজবুত করুন এবং আপনাকে এমন একজন পাত্র দান করুন, যে আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম হবে। আমিন।