হায়েজের সঠিক বিধান: পিরিয়ড শেষের সাদা স্রাবের পর অন্য রং দেখা গেলে করণীয়
Taharah Purity · Hanafi
Question
১।ক)আমার পিরিয়ড ৭/৮ দিন থাকে।৭ম বা ৮ম দিন নামাজ শুরু করি কিন্তু এবার ৯ম দিনেও অন্য কালার দেখা গেছে,তাহলে কি নামাজ শুরু করা যাবে?
খ)পিরিয়ড শেষের দিকে যখন দেখি একদম ক্লিয়ার সাদা,তখন ফরজ গোসল করে নামাজ পড়ার পড়ে দেখা যায় পরের ওয়াক্তে অন্য কালারের কিছু, এমন হলে বার বার ফরজ গোসল না করে কয়েক ওয়াক্ত চেক করার পরে নিশ্চিত হয়ে ফরজ গোসল করি।সেক্ষেত্রে দেখা যায় একদম নিশ্চিত হওয়ার পরে ২/৩ ওয়াক্ত কাজা পড়ে নিতে হচ্ছে।এভাবে কাজা হলে গুনাহ হবে???
২।ফরজ গোসলে কানের দুল কতবার নাড়ানো উচিত কানের ফুটা ভিজানোর জন্য???
৩।মেয়েকে হাফেজা বানানোর নিয়ত।এজন্য তাকে ৩ বছর থেকেই কিভাবে তরবিয়ত করে বড় করতে হবে? গাইডলাইন কিভাবে পাব সামনে আগানোর জন্য?
Answer
উত্তর:
ওয়া‘আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্ন ১ (ক): পিরিয়ডের ৭ম/৮ম দিনে নামাজ শুরু, কিন্তু ৯ম দিনে অন্য রং দেখা গেলে করণীয়?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, নারীর হায়েজের সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন এবং সর্বোচ্চ ১০ দিন। আপনার অভ্যাস ৭-৮ দিন হলেও, যদি ৯ম দিনেও অন্য রং (রক্ত বা হলদে/বাদামি স্রাব) দেখা যায় এবং তা ১০ দিনের মধ্যে হয়, তবে তা হায়েজ হিসেবেই গণ্য হবে। তাই ৭ম বা ৮ম দিনে নামাজ শুরু করা উচিত হয়নি, কারণ তখনো হায়েজ চলছিল। এখন যেহেতু ৯ম দিনেও রক্ত বা স্রাব দেখা গেছে, বুঝতে হবে আপনার হায়েজ এখনো শেষ হয়নি। আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ পবিত্রতার নিদর্শন (সাদা স্রাব বা সম্পূর্ণ শুষ্কতা) দেখা যায় অথবা ১০ দিন পূর্ণ হয়। ১০ দিনের পরও যদি রক্ত আসে, তবে তা ইস্তিহাজা (অপবিত্রতা নয়) হবে এবং তখন নামাজ পড়তে হবে ও রোযা রাখতে হবে।
সুতরাং:
- ৭ম বা ৮ম দিনে পড়া নামাজগুলি বাতিল বলে গণ্য হবে এবং সেগুলো পরবর্তীতে কাজা করতে হবে।
- বর্তমানে নামাজ শুরু করবেন না, যতক্ষণ না পবিত্রতা নিশ্চিত হচ্ছে।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/২৮৩): হায়েজের সর্বোচ্চ ১০ দিন, এর মধ্যে রক্ত দেখা গেলে তা হায়েজই।
- ফাতাওয়া উসমানী (১/২৮০): অভ্যাসের চেয়ে বেশি দিন রক্ত আসা ১০ দিনের মধ্যে হলে তা হায়েজ।
প্রশ্ন ১ (খ): সাদা স্রাব দেখে গোসলের পর আবার অন্য রং দেখা গেলে করণীয়?
হানাফি মাযহাবে হায়েজ শেষ হওয়ার নিদর্শন হলো সাদা স্রাব (قُرْء) অথবা সম্পূর্ণ শুষ্কতা। যদি আপনি পরিষ্কার সাদা স্রাব দেখে ফরজ গোসল করে নামাজ পড়েন, তাহলে আপনি পবিত্র হয়ে গেছেন। এরপর যদি পরবর্তী ওয়াক্তে আবার অন্য রং (যেমন হলদে, বাদামি) দেখা যায়, তবে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে না বরং ইস্তিহাজা (অপবিত্রতা নয়) বলেই বিধান। কারণ পবিত্রতা একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাই আপনার বারবার গোসলের প্রয়োজন নেই এবং অপেক্ষা করারও দরকার নেই।
আপনি যা করছেন:
- সাদা স্রাব দেখার পর গোসল না করে কয়েক ওয়াক্ত অপেক্ষা করছেন, তারপর নিশ্চিত হয়ে গোসল করছেন, ফলে ২/৩ ওয়াক্ত নামাজ কাজা হচ্ছে। এটি অপ্রয়োজনীয় এবং সঠিক নয়। কারণ আপনি সাদা স্রাব দেখার পরই পবিত্র, তাই সাথে সাথে গোসল করে নামাজ পড়া উচিত। পরবর্তী কোন স্রাব আপনার নামাজের ওপর প্রভাব ফেলবে না।
গুনাহের বিষয়:
- আপনার উদ্দেশ্য সতর্কতা ছিল, তাই ইচ্ছাকৃত গুনাহ নয়। তবে এখন থেকে সঠিক বিধান অনুসরণ করলে আর কাজা হবে না এবং গুনাহের আশঙ্কা থাকবে না।
- যদি ইতিমধ্যে কাজা হয়ে থাকে, তবে সেগুলো আদায় করে নিন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/২৯০): সাদা স্রাব দেখার পর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত, এরপর কোনো স্রাব হায়েজ নয়।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২২৫): পবিত্রতার পর হলদে স্রাব ইস্তিহাজা।
প্রশ্ন ২: ফরজ গোসলে কানের দুল নাড়ানোর সংখ্যা?
ফরজ গোসলের সময় শরীরের প্রতিটি অংশে পানি পৌঁছানো ফরজ। কানের লতির ছিদ্রের ভিতরেও পানি পৌঁছানো জরুরি। এজন্য কানের দুল বা কানের রিং ঘুরিয়ে দেওয়া বা নাড়ানো আবশ্যক। নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই; বরং এতটুকু নড়াচড়া করবেন যাতে পানি ছিদ্রের ভিতরে পৌঁছে যায়। একবার বা দুবার ঘুরিয়ে দিলেই সাধারণত যথেষ্ট হয়, তবে যদি দুল শক্তভাবে লাগানো থাকে তবে বেশি নড়াচড়া করতে পারেন। নাড়ানো ছাড়া শুধু পানি ঢেলে দিলে ভিতরে পানি না পৌঁছার আশঙ্কা থাকে, তাই সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/১৫৬): গোসলের মধ্যে লুকানো অংশে পানি পৌঁছানো আবশ্যক, কানের ছিদ্রও এর অন্তর্ভুক্ত।
- বাহিশ্তি জেওর (পবিত্রতা অধ্যায়): কানের দুল নাড়িয়ে ভিজানো সুন্নত নয়, বরং ওয়াজিব।
প্রশ্ন ৩: মেয়েকে হাফেজা বানানোর জন্য ৩ বছর বয়স থেকে তরবিয়তের গাইডলাইন
আল্লাহর রহমত কামনায় মেয়েকে হাফেজা বানানোর নিয়ত খুবই প্রশংসনীয়। ৩ বছর বয়স থেকেই কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া যায়:
১. কুরআনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা:
- তাকে কুরআন তিলাওয়াত শুনিয়ে শুনিয়ে বড় করুন। নিজে কুরআন পড়লে তার সামনে পড়ুন, যাতে সে দেখে।
- ছোট ছোট সূরা (যেমন সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস) মুখস্থ করান খেলার ছলে।
২. ভাষা ও উচ্চারণের ভিত্তি:
- ৩ বছর বয়সে আরবি বর্ণমালা (হরফ) চেনানো শুরু করুন। টুলস ও ফ্ল্যাশকার্ড ব্যবহার করতে পারেন।
- তাজবীদ সহ সঠিক উচ্চারণের জন্য কোনো অভিজ্ঞ শিক্ষিকার তত্ত্বাবধানে দিন।
৩. রুটিন তৈরি:
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় (যেমন ফজরের পর) ১০-১৫ মিনিট কুরআন শিক্ষার জন্য রাখুন। ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।
- সপ্তাহে একটি ছোট সূরা মুখস্থ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
৪. শিক্ষকের সহায়তা:
- একজন দক্ষ হাফেজা শিক্ষিকা খুঁজুন, যিনি শিশুদের জন্য বিশেষ পদ্ধতি জানেন। অনলাইন বা মসজিদভিত্তিক ক্লাস।
৫. দোয়া ও উৎসাহ:
- তার জন্য দোয়া করুন এবং অল্প অর্জনেও প্রশংসা করে উৎসাহিত করুন।
- কুরআন মুখস্থের ফজিলত সম্পর্কে তাকে ছোট ছোট গল্প বলুন।
৬. পরিবেশ তৈরি:
- ঘরে কুরআনের আলোচনা, তিলাওয়াত ও ইসলামি পরিবেশ রাখুন।
- তাকে হিফজুল কুরআন স্কুলে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা নিন (৪-৫ বছর বয়সে)।
গাইডলাইন পাওয়ার মাধ্যম:
- স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা হিফজ স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ।
- ইসলামিক বই ও ওয়েবসাইট (যেমন: quranforkids.com, darulifta-deoband.com)।
- অভিজ্ঞ হাফেজা মায়েদের অভিজ্ঞতা নিন।
রেফারেন্স:
- মা‘আরিফুল কুরআন (১/২৮): কুরআন শেখানো ও শেখার ফজিলত।
- বাহিশ্তি জেওর (শিক্ষা অধ্যায়): শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব।