ফুপাতো ভাইয়ের হারাম উপার্জনের টাকায় কেনা ঘড়ি উপহার পেলে তা পরা জায়েজ কিনা?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি একজন ছাত্র, আমার এক ফুপাতো ভাই বিদেশে চাকরি করে। সেই রেস্টুরেন্টে সে রাধুনী হিসেবে কাজ করে, দু:খের বিষয় সেখানে কোনো হালাল খাবার নেই। আমি ভেবেছিলাম সে রাধুনী হিসেবে চাকরি করে তা তো হালাল হবেই, তবে এই বিষয়টি আমার আজকে মাথায় এসেছে। এখন সে বাংলাদেশে আসার সময় কি লাগবে জিজ্ঞাস করে, আমি বলেছিলাম একটা দামি ঘডি আনতে, সে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে একটা ঘড়ি এনেছে। এখন সেই ঘড়ি টা অনেক দিন যাবত পরিধান করছি।
১)আমার এখন সন্দেহ হচ্ছে, ঘড়ি টা পরা কি জায়েয হবে?
২) না হলে আমি কি করব, অনেক শখ করে এনেছি, বাবাও জিজ্ঞাস করবে পরিস না কেন, আমার করণীয় কি?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে নেওয়া জরুরি যে, আপনার ফুপাতো ভাই যে রেস্টুরেন্টে কাজ করছে, সেখানে যদি কোনো হালাল খাবার না থাকে এবং পুরো রেস্টুরেন্টটি হারাম খাবার (যেমন: শূকরের মাংস, মদ, জবাইকৃত নয় এমন প্রাণী ইত্যাদি) পরিবেশন করে, তাহলে সেখানে রাধুনী (শেফ) হিসেবে কাজ করা জায়েজ নয়। কারণ, এ কাজটি সরাসরি হারাম খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের সাথে জড়িত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ"
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো বস্তুকে হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করেন।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৮৮)
সুতরাং, এই কাজ থেকে প্রাপ্ত বেতন ও উপার্জনও হারাম হবে।
আপনার ফুপাতো ভাই যে ঘড়িটি আপনাকে উপহার দিয়েছেন, সেটি তিনি তার ঐ হারাম উপার্জন থেকেই কিনেছেন। যেহেতু তার উপার্জন সম্পূর্ণ বা অধিকাংশই হারাম, তাই সেই টাকা দিয়ে কেনা ঘড়িটি গ্রহণ করা ও ব্যবহার করা জায়েজ হবে না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কারো অধিকাংশ উপার্জন হারাম হলে তার দেওয়া জিনিস গ্রহণ করা মাকরূহ তাহরীমি (নাজায়েজের কাছাকাছি)।
হাদিসে এসেছে:
"مَنْ جَمَعَ مَالًا مِنْ حَرَامٍ، ثُمَّ تَصَدَّقَ بِهِ، لَمْ يَكُنْ لَهُ فِيهِ أَجْرٌ، وَكَانَ إِصْرُهُ عَلَيْهِ"
অর্থ: "যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে সম্পদ সংগ্রহ করে, অতঃপর তা দান করে, তার জন্য তাতে কোনো সওয়াব নেই; বরং তার পাপই বহাল থাকে।" (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩২২১)
অতএব, আপনার করণীয় হলো:
১. ঘড়িটি পরা বন্ধ করুন:
আপনার সন্দেহ সঠিক। যেহেতু ঘড়িটি হারাম টাকায় কেনা, তাই এটি পরিধান করা জায়েজ নয়। আপনি যদি ইতিমধ্যে পরিধান করে থাকেন, তবে এখন থেকে তা বন্ধ করুন।
২. ঘড়িটি ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করুন:
ভালো উপায় হলো, আপনার ফুপাতো ভাইকে বিনয়ের সাথে বিষয়টি বোঝান যে, তার উপার্জন ও কাজের কারণে এই ঘড়িটি ব্যবহার করা আপনার জন্য সঠিক নয় এবং তাকে ফেরত দিন। তবে ফেরত দিলে তিনি যদি বিরক্ত হন বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে আপনি ঘড়িটি নিজে ব্যবহার না করে সেটি সদকা করে দিন। কেননা, হারাম সম্পদ নিজে ব্যবহার করা জায়েজ না হলেও তা সদকা করা জায়েজ, আর সেটি সওয়াবের বদলে গুনাহ মিটানোর জন্য কার্যকর হয়। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, হারাম সম্পদ সদকা করলে দাতার গুনাহ মাফ হয়। (রাদ্দুল মুহতার, ৪/২১৬)
৩. বাবার প্রশ্নের জবাব:
বাবা যদি জিজ্ঞেস করেন কেন ঘড়িটি পরছেন না, তাহলে আপনি সহজভাবে বলতে পারেন, "ঘড়িটি একটু বেশি দামি, আমি এটি পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি না, তাই অন্য কাউকে উপহার দিয়েছি" অথবা "আমার পছন্দের ঘড়ি নয়, তাই পরে অন্য ঘড়ি কিনব।" মিথ্যা না বলাই ভালো, তবে সরলভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন।
৪. ফুপাতো ভাইকে দ্বীনের দাওয়াত দিন:
তার সাথে ভালোভাবে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, তার কাজটি হারাম এবং তিনি যেন হালাল চাকরির সন্ধান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ"
অর্থ: "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (উপায়) বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (আত-তালাক: ২-৩)
সারসংক্ষেপ:
- ঘড়িটি পরা জায়েজ নয়।
- এটি ফেরত দেওয়া বা সদকা করে দিতে হবে।
- বাবার প্রশ্নের জবাবে সরলভাবে এড়িয়ে যান।
- ফুপাতো ভাইকে হালাল কাজের পরামর্শ দিন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আপনার অপবিত্র সম্পদ থেকে পবিত্রতা অর্জনে সাহায্য করুন। আমিন।