শশুর-শাশুড়ির মানষিক জুলুম থেকে বাঁচার উপায় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.একজন মুসলিমাহ,তার স্বামী বরিশাল থাকে চাকরির জন্য।তো মহিলা স্বামীর কাছে বরিশাল থাকে কারন শশুর বাড়তে পর্দার পরিবেশ নেই খোলামেলা আর সেখানে তাকে মানসিক ভাবে কষ্ট দেয়া হয় তাই সেখানে সে থাকতে চায়না।কিন্তু শশুর শাশুড়ী চায় বাড়িতে থাকুক। যদি ঐ মহিলা না থাকে বাড়ি তাহলে কি গুনাহ হবে?
২. শশুর বাড়িতে প্রচুর মানসিক জুলুম এর স্বীকার হয়েছে মেয়েটি কারণ সে দ্বীনের পথে চলার চেষ্টা করে মাঝে মাঝে না বুঝে তাদের হক নষ্ট করে ফেলেছে, অনেকবার মাফ চেয়েছে কিন্তু যদি তারা মাফ না করে মেয়েটি করবে সে সবসময় তাদের হক আদায় করার চেষ্টা করেছে?
৩. এই মেয়েটি দ্বীনে ফেরার পর থেকে তার মা তাকে মারধর করা বাড়ি থেকে বের করে দেয়া আরও অনেক কষ্ট দিয়েছে।বেদ্বীন পরিবার বিয়ে দেয়া হয়েছে,স্বামী একপ্রকার বাউন্ডলে বউয়ের,ছেলের ভরনপোষণ ঠিকমতো দেয় না, এছাড়া স্বামী শশুর বাড়ির জুলুম, OCD আক্রান্ত বারবার হালাল পথে থাকার আপ্রান চেষ্টা করা সত্বেও হারাম গ্রহনে বাধ্য হওয়া এছাড়া আরও মানসিক যন্ত্রনা,এমনকি এই মেয়েটির নামে নানা মিথ্যা অপবাদ এবং সন্তান নিয়ে যেতে চায়,বারবার বলে তার ননদকে বাচ্চা দিয়ে দিতে কারন তার বাচ্চা নেই। বড় হলে তার কাছে থাকবেনা বাড়ি পাঠিয়ে দেবে স্বামী বাচ্চাকে,শশুর বাড়ি থেকেও বাচ্চা মা থেকে আলাদা হয়ে যাবে এই কথা বারবার শুনতে হয়। মেয়েটি এখন হেদায়েত হারিয়ে ফেলতে বসেছে,স্বামী দ্বীন পালনে বাধা দেয়,নামাজের সময় জোর কর আটকে ধরে রাখে ইত্যাদি। মেয়েটি কিভাবে আবার সঠিক পথে ফিরে ভালো মুসলিমাহ ও ভালো মা হতে পারে দিকনির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ।
জাঝাকিল্লাহু খইর সম্মানিত উস্তাদ।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর প্রদানে সম্মানিত মুফতি সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমার পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব দলিল-প্রমাণসহ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রথমেই বলব, আপনার সমস্যা অত্যন্ত জটিল এবং জটিলতার কারণে আপনি হেদায়েত হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন। আপনি যে দ্বীনের পথে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন, সেটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শয়তান সর্বদা চায় একজন মুমিনকে হতাশ করে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। তাই আপনি দৃঢ় থাকুন।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর:
শশুর-শাশুড়ির সাথে বসবাস করা স্ত্রীর জন্য আবশ্যক নয়, যদি স্বামী নিজের আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর অধিকার হলো স্বামী তাকে পৃথক ও নিরাপদ বাসস্থান দেবে, যেখানে তার পর্দা ও ইবাদতের পরিবেশ থাকে। আপনি যদি শশুরবাড়িতে পর্দার পরিবেশ না থাকে এবং মানসিক নির্যাতন হয়, তাহলে সেখানে না থাকা আপনার জন্য জায়েয। বরং সেখানে থেকে নিজের দ্বীন ও মান-সম্মান রক্ষা করা কঠিন হলে সেখানে থাকা আপনার জন্য গুনাহের কারণ হতে পারে। হাদীসে এসেছে, "দ্বীনের ব্যাপারে কোনও ক্ষতি সহ্য করা জায়েয নয়।" (মুসলিম)
তবে শাশুড়ি-শশুরের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ও সম্মান করা ওয়াজিব। আপনি তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করবেন, তাদের খোঁজখবর নেবেন, কিন্তু তারা যদি আপনাকে জোর করে তাদের বাড়িতে রাখতে চান, তাহলে আপনি বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলবেন যে আপনার দ্বীনি পরিবেশের প্রয়োজন। যদি তারা না বোঝেন, তাহলে আপনার ওপর কোনো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ।
دليل:
قال الإمام ابن عابدين في «رد المحتار»: (ولها أن تمنع من سكنى أهله معها إلا إذا كان في شرط العقد أو جرى العرف بذلك، فإنها تلزم به) أي: إذا اشترطت أو جرى العرف أنها تسكن مع أهله، لزمها. وإلا فلا. (رد المحتار 3/604)
অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর পরিবারের সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করতে পারে যদি বিবাহের সময় এ শর্ত না থাকে বা এলাকার রীতি না থাকে। আপনার ক্ষেত্রে যদি পূর্বে কোনো শর্ত না থাকে, তাহলে আপনি আলাদা থাকতে পারেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর:
আপনি যদি অতীতে অজ্ঞতাবশত শশুর-শাশুড়ির কোনো হক নষ্ট করে থাকেন এবং পরে সেগুলো আদায় করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা মাফ না করেন, তাহলে আপনার দায়িত্ব শেষ। আপনি তাদের প্রতি দায়িত্ব যথাসাধ্য পালন করেছেন। এখন আপনি আল্লাহর কাছে তওবা করুন। আল্লাহ বলেন: "যারা তওবা করে এবং সংশোধন করে, নিশ্চয় আমি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল।" (সূরা বাকারা: ১৬০)
তাদের মাফ না পাওয়ার কারণে আপনার ওপর গুনাহ থাকবে না, যদি আপনি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে থাকেন এবং ভুল শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বরং তাদের পক্ষ থেকে জুলুম ও অমার্জনা তাদের জন্য গুনাহের কারণ হবে।
دليل:
قال العلامة الشامي في «رد المحتار»: (إذا تاب العبد توبة نصوحاً فإن الله يغفر له، أما حقوق العباد فلا تسقط إلا باستحلالهم أو إبرائهم أو قضاء الحقوق لهم). (رد المحتار 5/238)
অর্থাৎ: বান্দার হক সম্পর্কিত গুনাহ তওবা করলেও বান্দার অনুমতি ছাড়া মাফ হয় না। তবে আপনি যদি যথাসাধ্য চেষ্টা করে থাকেন এবং তারা ক্ষমা না করে, তাহলে আপনার ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ।
তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর:
আপনার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত কঠিন। আপনি একইসাথে স্বামীর অত্যাচার, শশুরবাড়ির মানসিক নির্যাতন, নিজ মায়ের দুর্ব্যবহার—এসবের মধ্যে পড়ে দ্বীন রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। আপনার কিছু করণীয়:
১. সর্বপ্রথম নিজের ঈমান ও ইবাদত সুরক্ষিত করুন:
আপনার স্বামী যদি নামাজ পড়তে বাধা দেয়, তাহলে তিনি বড় গুনাহ করছেন। আপনি নামাজের সময় গোপনে বা দ্রুত পড়ে নেবেন, যদি পারেন তাহলে অন্য ঘরে বা বাথরুমে গিয়েও পড়বেন। জোর করে আটকে রাখা—এটা কুফরি কাজের পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। হাদীসে এসেছে: "যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে, সে কুফর করল।" (তিরমিযী) আপনাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে নামাজ কায়েম করার।
২. হারাম থেকে বাঁচুন:
OCD বা মানসিক সমস্যার কারণে যদি আপনাকে হারাম কাজে বাধ্য করা হয়, তাহলে আপনি তা প্রতিরোধ করবেন। যেকোনো অবস্থায় হারাম থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। যদি স্বামী জোর করে হারাম করায়, তাহলে আপনি তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিন যে আপনি আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করবেন না। নিজের মানসিক অবস্থার কথা তাকে বুঝান। প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন।
৩. সন্তানের ব্যাপারে সাবধানতা:
আপনার সন্তান যদি আপনার কাছ থেকে আলাদা করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে এটি তাদের পক্ষ থেকে জুলুম। ইসলামে ছোট সন্তানের মা-ই সবচেয়ে বেশি হকদার তার লালন-পালনের। আপনার স্বামী যদি সন্তান নিয়ে যেতে চায় এবং আপনাকে কষ্ট দেয়, তাহলে আপনি স্থানীয় ইসলামি পরামর্শ কেন্দ্র বা উলামার কাছে বিষয়টি তুলে ধরুন। প্রয়োজনে আইনি সাহায্য নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, সন্তানকে ধর্মীয় পরিবেশে গড়ে তোলার অধিকার আপনার আছে।
৪. সহায়তা ও আশ্রয় খোঁজা:
আপনার যদি নিজের পক্ষে থাকা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনার এলাকার কোনো দ্বীনি বোন, মসজিদের ইমাম, বা ইসলামি সংগঠনের মহিলা শাখার কাছে সাহায্য চান। আল্লাহ বলেন: "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য কর।" (সূরা মায়েদা: ২)
৫. ধৈর্য ও দোয়া:
আপনার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ধৈর্য ও দোয়া। প্রতিদিন ফজরের সময় কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। নবী (সা.) বলেছেন: "জেনে রাখো, ধৈর্যের মাধ্যমেই সাহায্য আসে।" (বুখারি)
একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা:
যদি স্বামী আপনার দ্বীনি ও মানবিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে, যেমন নামাজে বাধা দেয়, হারাম কাজে বাধ্য করে, ভরণপোষণ দেয় না, তাহলে আপনি খুলা (তালাকের বিনিময়ে মুক্তি) নেওয়ার অধিকার রাখেন। এ ব্যাপারে একজন আলিমের পরামর্শ নিন। অনেক সময় চরম অবস্থায় তালাক নেওয়াই উত্তম হয়, যাতে দ্বীন বাঁচে।
সঠিক পথে ফেরার উপায়:
- প্রতিদিন কিছু সময় একান্তে বসে কুরআন তিলাওয়াত করুন। অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন।
- সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়া মুখস্থ করুন।
- মসজিদে নারীদের জন্য কোনো ইসলামি ক্লাস থাকলে তাতে যোগ দিন।
- নিজের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করে তওবা করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
- মনে রাখবেন, আপনি একা নন। আল্লাহ আপনার সঙ্গী। আল্লাহ বলেন: "আমি যখন আমার বান্দা আমাকে ডাকে, তখন আমি তার কাছে থাকি।" (সূরা বাকারা: ১৮৬)
সারসংক্ষেপ:
- শশুরবাড়িতে না থাকার কারণে আপনার গুনাহ হবে না। বরং দ্বীন রক্ষার জন্য আলাদা থাকা ভালো।
- শশুর-শাশুড়ির হক নষ্ট করলে ক্ষমা চেয়েছেন, তারা না মাফ করলেও আপনার ওপর গুনাহ থাকবে না ইনশাআল্লাহ।
- বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের ঈমান ও নামাজ রক্ষা করা, স্বামীর অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করা, এবং কোনো দ্বীনি সহায়তা নেওয়া।
- হতাশ হবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া জায়েজ নেই। আপনি ভালো মুসলিমাহ ও ভালো মা হতে পারেন—ইনশাআল্লাহ।
والله أعلم بالصواب
আপনার জন্য দোয়া রইল। আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও ইবাদত কবুল করুন এবং আপনার অবস্থার উন্নতি করুন। আমীন।