স্বপ্নর ব্যাখ্যা জানতে চাই? এবং বাবার মৃত্যুর পর মেয়ের দায়িত্ব কার উপর? তা জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমি নাবালক। আমার কোনো ভাই নেই এবং দাদা,নানাও জীবিত নেই। বাবার মৃত্যুর সময় আমার একমাত্র চাচা জীবিত ছিলেন। এবং আমার মামারা জীবিত আছেন। কিন্তু আমার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার আম্মু পালন করেছেন, আমার সব ভরণপোষণ আজ পর্যন্ত আমার আম্মু দিয়েছেন। উনি চাকুরীজীবি। যেহেতু উনার চাকুরী দিয়েই আমাদের সংসার চলে, এর বাইরে অন্য কোনো ইনকামের উৎস আমাদের নেই তাই উনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই চাকরি করছেন যদিও তিনি বেশ অসুস্থ।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমার বাবার মৃত্যুর পর শরিয়ত মোতাবেক আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার ছিলো? এবং আমার মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব কার ছিলো? যেহেতু আমার মা নিজেও ইনকাম করেন।
২. আমার চাচা বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। আমার বাবা মারা গেছেন এক যুগের ও বেশি আগে। চাচা বেঁচে থাকাকালীন কখনোই আমাকে এক টাকাও ভরণপোষণ দেননি এবং আমার সাথে কোনো যোগাযোগ ও রাখেন নি। সম্পূর্ণ ভরণপোষণ আমার মা দিয়েছেন এবং এখনো দিচ্ছেন। আমার নাবালিকা অবস্থায় যেহেতু আমার মা ই আমাকে ভরণপোষণ দিয়েছেন সেক্ষেত্রে আমি কি শরিয়ত মোতাবেক উনার উপর বোঝা হয়ে ছিলাম? যদিও উনি সন্তুষ্টচিত্তেই আমাকে লালনপালন করেছেন। আমাকে কখনো নিজের উপর বোঝা মনে করেন নি।
৩. বর্তমানে আমার বয়স প্রায় ২২। বিয়ের জন্য চেষ্টা চলছে। যেহেতু এখন আমি সাবালিকা তাই এখন আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার? আমার মামা জীবিত আছেন এবং একজন চাচাতো ভাই আছে। এর বাহিরে আমার বাবা,দাদা,নানা,চাচা,আপন ভাই কেউ জীবিত নেই। সাবালিকা অবস্থাও আমি আমার মায়ের ইনকামে চলছি, এক্ষেত্রে কি আমি উনার উপর কোনোপ্রকার জুলুম করছি? যদি উনি খুশিমনেই আমাকে ভরণপোষণ দিয়ে থাকেন?
৪. আমার কি এই অবস্থায় ইনকাম করা উচিত? যেহেতু আমি স্টুডেন্ট সেহেতু আমার পক্ষে খুব বেশি ইনকাম করা সম্ভব ও হবে না। আমি ইনকাম করলেও আমার মা কে চাকরি করতেই হবে। আর আমি ইনকাম না করলেও উনার চাকুরীর বেতন দিয়ে আমাদের যথেষ্ট ভালোভাবে দিন যায় আলহামদুলিল্লাহ। এক্ষেত্রে কি আমার কোনোরকম ইনকামের চেষ্টা করা উচিত? শরিয়ত অনুযায়ী কোনটা ভালো হবে?
৫. আর সন্তান হিসেবে আমরা মায়ের কাছে নানান আবদার করে থাকি। কখনো সামর্থ্যের বাইরে কিছু চাইনা। বড়সড় কিছু চাইলেও সেটা যদি মা আমাকে দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন তবেই দিতে বলি, জোর করে কিছু আদায় করি না। একজন সাবালক মেয়ে হিসেবে আমার মায়ের কাছে এ ধরনের নানান জিনিস আবদার করার অনুমতি আছে কি? আমি উনার উপর জুলুম করছি না তো? উনি আমাকে যা দেন সেটা খুশিমনেই দেন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। তিনি সত্যিই একজন সাহসী ও ত্যাগী মা। আসুন, আপনার প্রশ্নগুলোর শরিয়তসম্মত উত্তর হানাফি মাযহাবের কিতাবের আলোকে জেনে নেই।
১. বাবার মৃত্যুর পর আপনার ও আপনার মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব কার ছিল?
ইসলামী শরিয়তে ভরণপোষণ (নাফাকা) ওয়াজিব হওয়ার ক্রমধারা নিম্নরূপ:
আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব:
- পিতার মৃত্যুর পর নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ প্রথমে পিতার সম্পত্তি থেকে, তারপর পিতার পক্ষের আসাবা (নিকটাত্মীয়) আত্মীয়দের উপর ওয়াজিব হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৫)
- আপনার ক্ষেত্রে, পিতা মারা যাওয়ার পর আপনার কোনো ভাই, দাদা, নানা না থাকায় এবং চাচা জীবিত থাকায় শরিয়ত মোতাবেক আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব ছিল আপনার চাচার উপর। (সুরা বাকারা: ২৩৩; রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৬; আল-হিদায়া, ২/৩৩৪)
- তবে আপনার চাচা তা পালন না করায় এবং আপনার মা নিজে দায়িত্ব নেওয়ায় মা স্বেচ্ছায় সাওয়াবের কাজ করেছেন। এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই, বরং মা মহান সাওয়াবের অধিকারী হয়েছেন।
আপনার মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব:
- ইসলামী আইনে, পত্নীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব। স্বামী মারা যাওয়ার পর স্ত্রীর ভরণপোষণ তার পুত্রের (যদি থাকে) উপর ওয়াজিব হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭০; বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২৯)
- যেহেতু আপনার বোন (নারী সন্তান) হওয়ার কারণে আপনার উপর মায়ের ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়। তাই মায়ের ভরণপোষণ কারো উপর বাধ্যতামূলক ছিল না। তবে মা নিজে উপার্জন করলে সেটা তার নিজের ইচ্ছা ও কর্তব্যবোধ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৬৭)
২. নাবালিকা অবস্থায় মায়ের লালনপালনে আপনি কি বোঝা ছিলেন?
আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশে উল্লেখ করেছেন, "আমি কি শরিয়ত মোতাবেক উনার উপর বোঝা হয়ে ছিলাম?"
- না, আপনি বোঝা ছিলেন না। ইসলামী শরিয়তে মা সন্তানের ভরণপোষণের জন্য বাধ্য নন, তবে তিনি যদি স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে খরচ করেন, তাহলে তা তার জন্য নেকির কাজ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৪৫)
- হাদিসে এসেছে, "যখন কোনো নারী তার স্বামীর ঘর থেকে সন্তানের জন্য খরচ করে, তবে তার জন্য সাওয়াব আছে।" (সহিহ বুখারি, ৫৩৫১)
- সুতরাং, আপনার মা যে সন্তুষ্টচিত্তে আপনাকে লালনপালন করেছেন, তাতে তিনি সাওয়াব অর্জন করেছেন এবং আপনি কোনো বোঝা ছিলেন না।
৩. বর্তমানে সাবালিকা অবস্থায় আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার?
বর্তমানে আপনার বয়স ২২ বছর, আপনি সাবালিকা ও অবিবাহিতা।
ইসলামী শরিয়তে অবিবাহিত নারীর ভরণপোষণের ক্রমধারা:
- প্রথমত: পিতা (মৃত্যুবরণ করায় বাদ)
- দ্বিতীয়ত: পুত্র (আপনার নেই)
- তৃতীয়ত: পিতার পিতা (দাদা) (মৃত)
- চতুর্থত: পিতার ভাই (চাচা) (মৃত)
- পঞ্চমত: পিতার ভাইয়ের পুত্র (চাচাতো ভাই) - আপনার একজন চাচাতো ভাই জীবিত আছেন।
সুতরাং আপনার চাচাতো ভাই (পিতার ভাইয়ের পুত্র) শরিয়ত মোতাবেক আপনার ভরণপোষণের জন্য দায়ী, যদি তিনি সামর্থ্যবান হন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৬-৬০৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৭)
মামা (মায়ের ভাই) এর উপর আপনার ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়, কারণ মামা জুল-আরহাম (দূরবর্তী আত্মীয়) এবং নিকটবর্তী আসাবাদের পর তার দায়িত্ব আসে না। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৪৬)
আর আপনার মায়ের উপর আপনার ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়, তবে তিনি যদি স্বেচ্ছায় খরচ করেন, তাহলে তা জায়েজ ও সাওয়াবের কাজ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৬৮)
৪. আপনার ইনকাম করা উচিত কিনা?
ইসলামী শরিয়তে নারীর জন্য ইনকাম করা জায়েজ, তবে ফরজ বা ওয়াজিব নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৭; বেহেশতি জেওর, ৮/১৮)
মনে রাখবেন:
- আপনি স্টুডেন্ট, তাই পড়াশোনা আপনার প্রধান দায়িত্ব।
- আপনার মায়ের আয় দিয়ে সংসার ভালোভাবে চলে (আলহামদুলিল্লাহ)।
- ইনকাম করলেও আপনার মাকে চাকরি ছাড়তে হবে না (আপনার মতে)।
সুতরাং, শরিয়ত অনুযায়ী উত্তম হলো:
- ইনকাম না করে আপনার পড়াশোনায় মনোযোগ দিন। কারণ নারীর উপার্জন নিজের জন্য নয়, বরং পরিবারের প্রয়োজনে হলে আরও উত্তম হয়। যেহেতু এখান প্রয়োজন নেই, তাই পড়াশোনাই প্রধান।
- কিন্তু যদি ইনকাম করতে চান, তাহলে পারেন। তাতে আপনার মায়ের উপর বোঝা কমবে এবং আপনি নিজের খরচ নিজে বহন করতে পারবেন। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৬৯)
- মনে রাখবেন, আপনার মায়ের আয়ের সাথে আপনি ইনকাম করলে সেটা জুলুম নয়, বরং তার প্রতি সহযোগিতা। তবে মা যদি খুশি হন এবং কষ্ট না পান, তাহলে আপনি না করলেও সমস্যা নেই।
৫. সাবালিকা মেয়ে হয়ে মায়ের কাছে আবদার করা জায়েজ কিনা?
হ্যাঁ, জায়েজ, তবে কিছু শর্তে:
- শরীয়তে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, সম্মান ও কৃতজ্ঞতা ফরজ। (সুরা বাকারা: ৮৩; সুরা লুকমান: ১৪)
- আবদার করা জায়েজ, তবে মায়ের সামর্থ্যের মধ্যে এবং তাঁর সন্তুষ্টি সহকারে। আপনি নিজেই লিখেছেন, "জোর করে কিছু আদায় করি না", "সামর্থ্যের বাইরে কিছু চাই না" – এটি উত্তম পদ্ধতি।
- আপনি জুলুম করছেন না যেহেতু মা খুশিমনে দেন এবং আপনার প্রতি কোনো প্রকার চাপ নেই।
তবে বিশেষভাবে মনে রাখবেন:
- মায়ের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা জরুরি। হাদিসে এসেছে, "মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।" (মুসনাদে আহমদ, ২/৪২৯)
- আপনার মা নিজে অসুস্থ হয়েও চাকরি করছেন – তাই তাঁর প্রতি অতি যত্নশীল হওয়া উচিত। আবদার করার সময় তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় রাখবেন।
উত্তম পন্থা হলো:
- মাকে ধন্যবাদ ও দোয়া দেওয়া।
- তাঁর কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করা।
- প্রয়োজনের বাইরে বা অতিরিক্ত আবদার না করা।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | বাবার মৃত্যুর পর আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব | চাচার উপর (তিনি পালন করেননি, মা সাওয়াব অর্জন করেছেন) | | মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব | কারো উপর ওয়াজিব ছিল না (মা নিজে উপার্জন করেছেন) | | নাবালিকা অবস্থায় মায়ের লালনপালন | আপনি বোঝা ছিলেন না (মা স্বেচ্ছায় সাওয়াব অর্জন করেছেন) | | বর্তমানে (২২ বছর) ভরণপোষণের দায়িত্ব | চাচাতো ভাইয়ের উপর (যদি সামর্থ্যবান হন) অথবা স্বামীর উপর (বিবাহের পর) | | আপনার ইনকাম করা উচিত কিনা | প্রয়োজন নেই, তবে চাইলে জায়েজ। উত্তম হচ্ছে পড়াশোনায় মনোযোগ | | মায়ের কাছে আবদার করা | জায়েজ, তবে সামর্থ্যের মধ্যে এবং সন্তুষ্টি সহকারে। জুলুম নয় |
শেষ কথা:
আপনার মায়ের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞ থাকুন। তিনি আপনার জন্য যা করেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। তাঁর প্রতি দোয়া করুন, তাঁর সেবা করুন এবং তাঁর খুশি অর্জন করুন। ইনশাআল্লাহ, বিবাহের পর স্বামী আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবেন। ততদিন পর্যন্ত ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা বজায় রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার মাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।