সামর্থ্যবান হওয়ার পর হজ্জে বিলম্ব করার বিষয়ে

Hajj and Umrah · Hanafi

Question No: 1789
Questioner: 1234567
Question Asked: 19 Jun 2026, 04:17 AM
Reviewed & Published: 19 Jun 2026, 04:22 AM
Views: 28
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ।কোনো দম্পতি যদি প্রবাসী হয় এবং স্বামীর পক্ষে হজ্জ করার মতন আর্থিক সামর্থ্য হলেও স্ত্রীর জন্য এখনো সেপরিমাণে টাকা হয় নি।দুজন একসাথে হজ্জ করার মতন এইমুহুর্তে সামর্থ্য হয় নি।এমতাবস্থায় স্বামীর কি হজ্জ করার মতন টাকা হয়ে যাওয়ার পরই হজ্জ আদায় করে নিতে হবে ?স্ত্রী বিদেশে একা থাকবে,হজ্জের জন্য প্রায় ১ মাস স্ত্রীকে দূর দেশে একা রেখে স্বামীর হজ্জে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাচ্ছি ।এক জায়গায় দেখলাম সামর্থ্য হয়ে গেলে হজ্জ করায় বিলম্ব করতপ হয় না।এমতাবস্থায় স্বামীর করণীয় কী?

কোনো মহিলার হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য কী কী প্রয়োজন ?স্বামী কি স্ত্রীকে নিয়ে একসঙ্গে হজ্জ করার জন্য একা সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কি হজ্জ আদায়ে বিলম্ব করা যাবে?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: (ক) স্বামীর জন্য হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত ও বিলম্বের বিধান, এবং (খ) স্ত্রীর জন্য হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত ও স্বামীর একা হজ্জে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর অবস্থা বিবেচনা। নিম্নে হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো।


(ক) স্বামীর হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত ও বিলম্ব

হানাফি মতে, পুরুষের ওপর হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলি পূরণ হওয়া জরুরি:

  1. নির্ভরশীলদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা: নিজের হজ্জের খরচ ছাড়াও হজ্জে যাওয়া ও ফেরত আসা পর্যন্ত স্ত্রী, সন্তান বা অন্য যাদের ভরণপোষণ দেওয়া তার ওপর ওয়াজিব, তাদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রেখে যেতে হবে। ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

    "যে ব্যক্তির নিকট ভরণপোষণের প্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ পরিশোধের পর হজ্জে যাওয়া-আসা এবং তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অতিরিক্ত সম্পদ থাকে, তার ওপর হজ্জ ফরজ হয়।"
    (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬০-৪৬১)

  2. শারীরিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য: হজ্জের সফরের খরচ বহনের সক্ষমতা এবং নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন (ঘর-বাড়ি, পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদি) উত্তোলনের পর হজ্জের জন্য অতিরিক্ত অর্থ থাকতে হবে।

যদি স্বামীর নিকট হজ্জের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকে কিন্তু স্ত্রীকে (এক মাস) একা রেখে যাওয়ার জন্য তার ভরণপোষণ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে তার ওপর হজ্জ ফরজই হবে না। বরং সে প্রথমে স্ত্রীর জন্য যথেষ্ট অর্থ (খোরপোষ ও অন্যান্য জরুরি খরচ) রেখে যাওয়ার পরই হজ্জের জন্য অর্থ গণ্য হবে।

আপনার অবস্থা:
যেহেতু আপনি প্রবাসী এবং স্ত্রী বিদেশে একা থাকবেন, তাই হজ্জে যাওয়ার সময় তাকে একা রেখে যাওয়ার অর্থ হলো তার ভরণপোষণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। যদি আপনার হজ্জের খরচ বাদ দিয়ে স্ত্রীর জন্য এ এক মাসের ও তার পরের কিছুদিনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ (ভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ইত্যাদি) না থাকে, তাহলে আপনার ওপর হজ্জ এখনো ফরজ হয়নি। বরং অর্থ সাশ্রয় করে স্ত্রীসহ বা স্ত্রীর নিরাপত্তার পূর্ণ ব্যবস্থা করে হজ্জে যাওয়া আপনার কর্তব্য।


(খ) স্ত্রীর হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত ও স্বামীর বিলম্ব

মহিলার জন্য হজ্জ ফরজ হওয়ার বিশেষ শর্ত হলো:

  • মাহরামের সঙ্গ: হানাফি মতে, ফরজ হজ্জের জন্য মহিলার সাথে একজন মাহরাম (যেমন স্বামী, পিতা, ভাই) থাকা ওয়াজিব। যদি মাহরাম না থাকে বা মাহরামের সঙ্গের ব্যবস্থা সম্ভব না হয়, তাহলে তার ওপর হজ্জ ফরজ হয় না।
    (আল-হিদায়া, ১/২৫৬; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৩৫)

  • আর্থিক সক্ষমতা: নিজের খরচ এবং মাহরামের খরচ (যদি মাহরাম নিজে টাকা না দেয়) বহনে সক্ষম হতে হবে।

এক্ষেত্রে আপনার স্ত্রীর নিজের হজ্জের জন্য টাকা নেই, এবং আপনি উভয়ের জন্য একসাথে হজ্জ করার পর্যাপ্ত টাকা এখন নেই। তাই স্ত্রীর ওপর হজ্জ ফরজ হয়নি। তবে যদি আপনার ওপর হজ্জ ফরজ হয়ে যায় (অর্থাৎ স্ত্রীর জন্য পর্যাপ্ত রেখে নিজের হজ্জের খরচ বেঁচে যায়), তাহলে বিলম্ব না করে হজ্জ সম্পাদন করা আপনার ওপর ফরজ। ফাতাওয়া উসমানীতে এসেছে:

"সামর্থ্য হওয়ার পর হজ্জে বিলম্ব করা জায়েয নয়; বরং দ্রুত আদায় করা আবশ্যক।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/২২২)

কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থা:
যেহেতু স্ত্রী বিদেশে একা থাকবেন এবং আপনাকে প্রায় এক মাস দূরে থাকতে হবে, তাই যদি আপনি নিশ্চিত করতে পারেন যে –

  • স্ত্রী নিরাপদ পরিবেশে আছেন,
  • তার ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ (এক মাসের বেশি সময় জন্য) রেখে গেছেন,
  • কোনো জরুরি প্রয়োজনে তার সাহায্যের ব্যবস্থা আছে (যেমন প্রতিবেশী, আত্মীয়);

তবে আপনার হজ্জ ফরজ হবে এবং বিলম্ব না করে তা আদায় করা উচিত।

কিন্তু যদি একা ফেলে রাখার কারণে স্ত্রীর কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে এই অবস্থায় হজ্জে বিলম্ব করা জায়েয। কেননা স্ত্রীর নিরাপত্তা ও ভরণপোষণ আপনার ওপর পূর্ববর্তী ফরজ এবং তা হজ্জের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, এমন পরিস্থিতিতে হজ্জের জন্য অর্থ বাঁচিয়ে রেখে পরে স্ত্রীসহ বা স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হজ্জ করতে পারেন।


সারসংক্ষেপ ও করণীয়

  1. আপনি বর্তমানে হজ্জের জন্য সক্ষম হলেও স্ত্রীকে একা ও অসুরক্ষিত রেখে যাওয়া নিজের ওপর হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত পূরণ করে না। তাই আপনার ওপর হজ্জ এখনো ফরজ হয়নি।
  2. আপনার জন্য করণীয়: প্রথমে এমন একটি ব্যবস্থা করা যাতে স্ত্রী আপনার অনুপস্থিতিতে নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন। যদি আপনি তাকে তার পরিবারের কাছে পাঠাতে পারেন বা কোনো বিশ্বস্ত মাহরামের কাছে রেখে যেতে পারেন, তবে তা উত্তম। তারপর নিজের হজ্জের ইচ্ছা পূরণ করুন।
  3. অথবা, যতদিন পর্যন্ত উভয়ের জন্য একসঙ্গে হজ্জ করার অর্থ সঞ্চয় না হয়, ততদিন হজ্জ না করাই আপনার জন্য নিরাপদ এবং স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনই অগ্রগণ্য। পরে একসঙ্গে হজ্জ করলে স্ত্রীও তার ফরজ আদায় করবেন এবং আপনারা উভয়েই সাওয়াব পাবেন।
  4. হজ্জে বিলম্বের জন্য কোনো গুনাহ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার ওপর হজ্জ ফরজ হয়নি। ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব করলে গুনাহ হবে।

উপসংহার: স্ত্রীকে বিদেশে একা রেখে স্বামীর একা হজ্জে যাওয়া যাবে না, যদি না স্ত্রীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে যেহেতু সেই ব্যবস্থা নেই, তাই স্বামী হজ্জ বিলম্ব করে স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং পরবর্তীতে একসাথে হজ্জ করার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ তায়ালা আপনার ইচ্ছাকে কবুল করুন এবং সহজ পথ দেখান। আমিন।

রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (২/৪৬০-৪৬১)
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/২২২-২২৩)
  • আল-হিদায়া (১/২৫৬)
  • ফাতাওয়া আলমগীরী (১/২৩৫)
  • বেহেশতী জেওর (হজ্জ অধ্যায়)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.