হাসপাতালে ভর্তি রোগী কীভাবে ওজু-তায়াম্মুম ছাড়া ইশারা দিয়ে মাগরিব ও ইশার কাজা সালাত আদায় করবেন

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 1785
Questioner: Orin 2379
Question Asked: 19 Jun 2026, 12:51 AM
Reviewed & Published: 19 Jun 2026, 03:19 AM
Views: 50
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।
আমার বান্ধবী আসরের পর হসপিটালে ভর্তি হয়েছে।ওর অবস্থা এত খারাপ ছিল আল্লাহ ছাড়া কিছু বলতে পারছিল না।এখন রাত ১২ টা বেজে গিয়েছে।এখন ও স্বাভাবিক আছে কিন্তু স্যালাইন চলছে।ওর দুই হাত ব্যথা। ওজু বা তায়াম্মুমের ব্যাবস্থা নেই।এখন কীভামাগরিব আর এশার সালাত আদায় করতে পারে?

Answer

উত্তর:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রথমে আমরা আপনার বান্ধবীর জন্য দোয়া করি—আল্লাহ তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি আসরের পর হাসপাতালে ভর্তি হন এবং কিছু সময় অচেতন ছিলেন। বর্তমানে রাত ১২টা বাজে, তিনি স্বাভাবিক আছেন কিন্তু স্যালাইন চলছে এবং দুই হাতে ব্যথা। ওজু বা তায়াম্মুমের সুযোগ নেই।

এখন তিনি যেসব সালাত আদায় করতে পারবেন তা হলো—মাগরিব, ইশা এবং ক্বাযা হিসেবে আসরের সালাত। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত পদ্ধতি ও দলিল দেওয়া হলো।


১. প্রথমে নির্ধারণ করুন কতগুলো ফরজ সালাত কাজা হয়েছে

  • তিনি আসরের পর ভর্তি হয়েছেন, তাই আসরের সালাত (যদি ওয়াক্তের মধ্যে আদায় না করে থাকেন) কাজা হয়েছে।
  • এরপর মাগরিব ও ইশার ওয়াক্তও পার হয়ে গেছে (যেহেতু এখন রাত ১২টা), তাই মাগরিব ও ইশা উভয়ই কাজা হয়েছে।
  • সুতরাং মোট ৩টি ফরজ সালাত (আসর, মাগরিব, ইশা) কাজা করতে হবে।

ক্বাযার ক্রম: হানাফি মতে ফরজ সালাতের ক্বাযা সময়ানুক্রমে আদায় করা ওয়াজিব (যে সালাত আগে কাজা হয়েছে, সেটি আগে পড়তে হবে)। তবে যদি সময় সংকীর্ণ হয় বা রোগীর পক্ষে ক্রম রক্ষা করা কষ্টকর হয়, তবে ক্রম ছাড়াও পড়া জায়েয (রদ্দুল মুহতার ২/৪২৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১২৬)।


২. পবিত্রতা (ওজু ও তায়াম্মুমের বিধান)

  • ওজু: বর্তমানে তার দুই হাতে ব্যথা এবং স্যালাইন চলছে। পানি ব্যবহার করলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই ওজু করা যাবে না।

  • তায়াম্মুম: হাতে ব্যথা থাকলেও যদি কোনোভাবে হাত মাটি বা পাথরে মারতে পারেন, তাহলে তায়াম্মুম করবেন। আর যদি তায়াম্মুম করাও অসম্ভব হয় (যেমন হাত নড়াতে পারেন না), তাহলে তায়াম্মুম ছাড়াই সালাত আদায় করবেন। হানাফি ফিকহে স্পষ্ট বলা হয়েছে—

    عن ابن عباس رضي الله عنهما قال: "إذا لم يستطع المريض الطهورين صلى على حاله"
    অর্থাৎ, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: ‘যখন রোগী পানি ও তায়াম্মুম উভয়ই করতে অপারগ হয়, তখন সে বিনা পবিত্রতায় সালাত আদায় করবে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৮৫৩২; রদ্দুল মুহতার ১/৩০৭)

    ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:

    إذا عجز عن التيمم صلى بلا طهارة
    অর্থাৎ, ‘যখন তায়াম্মুম করতে অক্ষম হয়, তখন বিনা পবিত্রতায় সালাত আদায় করবে।’ (রদ্দুল মুহতার ১/৩০৭, দারুল কুতুব ইলমিয়্যা)

    উপসংহার:

    • যদি হাতে ব্যথা সত্ত্বেও দেয়ালে বা বিছানার চাদরে হাত মেরে তায়াম্মুম করতে পারেন, তাহলে তা করুন।
    • আর যদি হাত নাড়ানোই কষ্টকর হয়, তাহলে তায়াম্মুম ছাড়াই ইশারা দিয়ে সালাত আদায় করবেন।

৩. সালাতের পদ্ধতি (ইশারা ও বসা)

রোগী শয্যাশায়ী হলে হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:

  • দাঁড়াতে অপারগ: বসে সালাত আদায় করবে (রুকু-সিজদা ইশারায়)।
  • বসতেও অপারগ: চিৎ হয়ে শুয়ে পা দু’টি কিবলার দিকে রেখে ইশারা করবে। রুকুর চেয়ে সিজদার ইশারা একটু বেশি ঝুকবে।
  • চিৎ হওয়া সম্ভব না: ডানে বা বামে কিবলামুখী হয়ে শুয়ে ইশারা করবে।

উল্লেখ্য, যদি কিবলার দিকে ফিরতে না পারেন, তবে যে দিকেই সম্ভব সে দিকে ফিরে পড়বেন। (রদ্দুল মুহতার ২/৯৬; আল-হিদায়া ১/২৮৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৪২)

বিশেষ টিকা: স্যালাইন লেগে থাকা অবস্থায় ইশারা করা যায়। স্যালাইন সুচ পুনরায় লাগানোর প্রয়োজন নেই; শুধু ইশারায় সালাত আদায় করলেই হবে।


৪. প্রতিটি কাজা সালাতের নিয়ত ও পদ্ধতি

  • প্রথমে পড়ুন আসরের কাজা:
    নিয়ত করবেন: "আমি আজকের (বা গতকালের) আসরের ফরজ সালাত কাজা আদায় করছি, আল্লাহর ওয়াস্তে।"
  • তারপর মাগরিবের কাজা:
    "আজকের (বা গতকালের) মাগরিবের ফরজ সালাত কাজা আদায় করছি।"
  • সবশেষে ইশার কাজা:
    "আজকের (বা গতকালের) ইশার ফরজ সালাত কাজা আদায় করছি।"

যদি আসর ফরজ হাতে হাতে কমে যায় এবং হাতের ব্যথার কারণে তাকবির বা কিরাআত করতে অসুবিধা হয়, তবে শুধু মনে মনে নিয়ত ও ইশারা করলেই সালাত শুদ্ধ হবে। কেননা, অক্ষম অবস্থায় কিরাআতের সওয়াব লেখা হয়—ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে। (রদ্দুল মুহতার ২/৯৭)


৫. রোগী অপারগ হলে দেরি করার সুযোগ

যদি বর্তমানে কোনোভাবেই সালাত আদায় করা সম্ভব না হয় (যেমন ব্যথায় অস্থির), তাহলে তিনি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবেন। তবে সাধ্যমতো চেষ্টা করা উত্তম। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতীত দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা ২:২৮৬)


সংক্ষেপে করণীয় টেবিল

| অবস্থা | কী করবেন | |--------|----------| | হাত ব্যথায় পানি ব্যবহার অসম্ভব | তায়াম্মুম করুন (যদি সম্ভব) | | তায়াম্মুমের ক্ষমতা না থাকলে | ওজু ও তায়াম্মুম ছাড়াই সালাত আদায় করবেন | | দাঁড়াতে না পারলে | বসে ইশারায় পড়বেন | | বসতেও না পারলে | চিৎ হয়ে বা কিবলামুখী হয়ে ইশারায় পড়বেন | | কিবলার দিকে ফিরতে অক্ষম | যে দিক সম্ভব সেদিকে ফিরে পড়বেন | | একসঙ্গে ৩ সালাতের কাজা | ক্রমানুসারে আসর → মাগরিব → ইশা |


কোরআন-হাদিস ও ফিকহি রেফারেন্স

  1. ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা (পূর্বে উল্লিখিত)
  2. সূরা বাকারা ২:২৮৬
  3. রদ্দুল মুহতার ১/৩০৭ (অক্ষম ব্যক্তির জন্য তায়াম্মুমের বিকল্প)
  4. রদ্দুল মুহতার ২/৯৬-৯৭ (শয্যাশায়ীর ইশারার নিয়ম)
  5. ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৪২ (কিবলা ও ইশারার বিস্তারিত)
  6. আল-হিদায়া ১/২৮৭ (মারিৎসের সালাত)
  7. ফাতাওয়া উসমানী (২/৫২) - মারিৎসের সালাতের সহজ বিধান

আখিরি কথা: আপনার বান্ধবী যেন দুর্বলতা ও কষ্ট সত্ত্বেও সালাত ত্যাগ না করেন। আল্লাহ তাআলা দুর্বল বান্দার ইবাদত কবুল করেন এবং সওয়াব দ্বিগুণ দেন। যদি বর্তমানে ইশারা করাও কষ্টকর হয়, তাহলে কিছুক্ষণ পর যখন ব্যথা কমে তখন পড়ে নেবেন। তবে দীর্ঘদিন বিনা কারণে দেরি করা জায়েয নয়।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ
আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.