ঘুষ ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক চাকরি গ্রহণের বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
প্রশ্ন হচ্ছে:
১. উনার বেতন কি হালাল, হালাল হলে এটা কি চাকরি কালিন হালাল নাকি পেনশন কালিন পাওয়া টাকাও হালাল?
২. হারাম হবে না কেন? হারাম হলে তাঁর বেতন কি শুধু হারাম হবে? সে যেহেতু অন্য কারো না কারো চাকরি অসদ ভাবে নিয়ে নিয়েছেন, তাই প্রকৃত পক্ষে চাকরিটা যার পাওয়ার কথা ছিল, সে চাকরি না পাওয়ার তাঁর এবং তাঁর অনাগত প্রজন্মের যে ক্ষতি হয়েছে তার দায়ভার কে নিবে?
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার বর্ণিত ঘটনায় চাকরিপ্রার্থী ব্যক্তি ঘুষ প্রদান, প্রতারণা (অন্যকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো) ও মিথ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে চাকরি অর্জন করেছেন। ইসলামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে হারাম। নিচে কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফি স্কলারদের মতামতের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. উক্ত ব্যক্তির বেতন ও পেনশন কি হালাল?
উত্তর: না, তাঁর বেতন ও পেনশন উভয়ই হারাম। কারণ চাকরিটি বৈধ পদ্ধতিতে অর্জিত হয়নি বরং ঘুষ, প্রতারণা ও অসদুপায়ে নেওয়া হয়েছে। ইসলামে আয়ের বৈধতা নির্ভর করে উপার্জনের মাধ্যম ও চুক্তির বৈধতার ওপর।
প্রমাণ:
- আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” (সূরা বাকারা ২:১৮৮) - রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
لَعَنَ اللَّهُ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ
“ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর আল্লাহর লানত।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, সহিহ) - তিনি আরও বলেছেন:
مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
“যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম)
সালাফি স্কলারদের ফতোয়া:
- শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি ঘুষ বা অসৎ উপায়ে চাকরি গ্রহণ করে, তার বেতন হারাম। তাকে তওবা করতে হবে এবং চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।”
- শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: “চাকরির জন্য ঘুষ দেওয়া হারাম, এবং এভাবে অর্জিত বেতনও হারাম। কেননা চুক্তিটি বাতিল।” (লিক্বাআতুল বাবিল মাফতুহ)
- শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: “প্রতারণা ও ঘুষের মাধ্যমে নেওয়া চাকরির বেতন ভোগ করা জায়েজ নেই।”
পেনশন: পেনশন চাকরির দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা, যা হারাম উপার্জনেরই অংশ। সুতরাং তাও হারাম। তবে তিনি যদি তওবা করে চাকরি ছেড়ে দেন, তাহলে পেনশন না নেওয়াই উত্তম।
২. কেন এই বেতন হারাম? এবং অন্যায়ভাবে বঞ্চিত ব্যক্তির দায় কে নেবে?
কেন হারাম?
১. ঘুষ: ঘুষ দেওয়া-নেওয়া উভয়ই হারাম। হাদিসে ঘুষদাতা ও গ্রহীতাকে লানত করা হয়েছে।
২. প্রতারণা (গিশ): অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো এবং নিজের নামে ফলাফল ভোগ করা স্পষ্ট প্রতারণা। এটি ‘তাদলীস’ (জালিয়াতি) এর অন্তর্ভুক্ত।
৩. অসৎ উপায়ে চাকরি দখল: যেখানে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী থাকতে পারে, সেখানে জালিয়াতি করে চাকরি নেওয়া জুলুম। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
“নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা কাসাস ২৮:৭৭)
বঞ্চিত ব্যক্তির ক্ষতি ও দায়ভার:
- এই ব্যক্তি প্রকৃত প্রার্থীর চাকরি কেড়ে নিয়ে তার ও তার পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
- শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ বা চাকরি দখল করে, তাকে তা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।” (মাজমু ফাতাওয়া ৩০/১৪৭)
- ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন: “জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ বরকতহীন, এবং এর প্রভাব পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।” (মিফতাহু দারিস সাআদাহ)
সমাধান:
১. তওবা: আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে এবং চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।
২. ক্ষতিপূরণ: যদি জানা যায় কাকে ঠকানো হয়েছে, তাহলে তাঁর পাওয়া বেতনের সমপরিমাণ টাকা ফিরিয়ে দেওয়া বা তাঁর সাথে মীমাংসা করা জরুরি।
৩. অজ্ঞাত ক্ষতি: অজ্ঞাত ব্যক্তির পক্ষে সাদকাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
৪. ভবিষ্যৎ: নিজের সন্তান-সন্ততির জন্য হালাল রিযিকের ব্যবস্থা করতে হবে।