ইদ্দত দ্রুত শেষ করার জন্য মেডিসিন ব্যবহার জায়েজ কী না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার ইদ্দত চলছে, ২ হায়েজ শেষ হয়েছে, আরেকটা ১০ দিন পর হবে। এখন যদি আমি ২-৩ দিনের মধ্যে হায়েজ যেনো হয় তার যদি মেডিসিন ব্যবহার করি তবে কী তা জায়েজ হবে?
Answer
ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর: ইদ্দত দ্রুত শেষ করার জন্য কৃত্রিমভাবে হায়েজ আনার ওষুধ ব্যবহার করা হানাফি মাজহাব অনুযায়ী জায়েজ নয়। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নির্ধারিত সময়সীমার সাথে হস্তক্ষেপের শামিল এবং ইদ্দতের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
নিম্নে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. ইদ্দতের শরয়ী হিকমত (উদ্দেশ্য)
মহান আল্লাহ বলেন:
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন কুরূ (হায়েজ) পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
এই আয়াতে তিন কুরূ’ অর্থ তিনটি পূর্ণ হায়েজ চক্র। ইদ্দতের মূল উদ্দেশ্য:
- গর্ভাশয় পবিত্র কিনা তা নিশ্চিত করা (বারা’আতুর রাহিম)।
- সম্ভাব্য মিলন ও পুনর্বিবাহের সুযোগ রাখা।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সময় দেওয়া।
এই উদ্দেশ্যগুলো পূর্ণ হয় শুধুমাত্র স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন হায়েজ চক্রের মাধ্যমে। কৃত্রিমভাবে হায়েজ এনে ইদ্দত দ্রুত শেষ করলে এই উদ্দেশ্যগুলো ব্যাহত হয়।
২. হানাফি ফিকহের মূলনীতি
হানাফি ফকিহগণ বলেছেন—যদি কোনো নারী হায়েজ দ্রুত আনার জন্য ওষুধ সেবন করে, তাহলে যে রক্ত আসে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু এই কাজটি বৈধ নয়। বিশেষ করে ইদ্দত দ্রুত শেষ করার নিয়তে করলে তা নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ।
ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ বলেন:
وَأَمَّا إذَا أَخَذَتْ دَوَاءً لِإِنْزَالِ الْحَيْضِ فَيَكُونُ حَيْضًا وَلَكِنَّهَا تَأْثَمُ إنْ قَصَدَتْ بِذَلِكَ تَعْجِيلَ انْقِضَاءِ الْعِدَّةِ "যদি মহিলা হায়েজ আনার জন্য ওষুধ সেবন করে, তাহলে তা হায়েজই হবে। কিন্তু যদি সে এর দ্বারা ইদ্দত দ্রুত শেষ করতে চায়, তাহলে সে গুনাহগার হবে।"
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক, বাবুল ইদ্দাহ)
একই মত ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.) এবং ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী দা.বা.)-এ উল্লেখ আছে।
৩. মূল ফয়সালা ও সতর্কতামূলক নির্দেশনা
- জায়েজ নয়: আপনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ইদ্দত দ্রুত শেষ করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা জায়েজ নয়। কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে হায়েজের চক্র পরিবর্তন করে আল্লাহর হুকুমের সাথে খেলার শামিল।
- হায়েজ গণ্য হবে কিনা: যদি আপনি তবুও ওষুধ সেবন করেন এবং নির্ধারিত ন্যূনতম ৩ দিন রক্ত আসে, তাহলে তা হায়েজ গণ্য হবে এবং ইদ্দত পূর্ণ হবে। তবে আপনি গুনাহগার হবেন। আর যদি ৩ দিনের কম রক্ত আসে, তাহলে তা হায়েজ নয় (ইস্তিহাযা) এবং ইদ্দত পূর্ণ হবে না।
- ব্যতিক্রম: যদি আপনার হায়েজের কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে (যেমন অনিয়ম, দীর্ঘ বিলম্ব) এবং ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত করার জন্য ওষুধ নেন, তাহলে তা ভিন্ন কথা। কিন্তু ইদ্দত দ্রুত শেষ করার নিয়ত থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
উত্তম পথ: আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং স্বাভাবিকভাবে ১০ দিন পর হায়েজ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ইদ্দত শেষ হওয়ার পরই পুনর্বিবাহ বা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিন।
৪. প্রাসঙ্গিক দলিল ও গ্রন্থ নির্দেশিকা
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিতাবুত তালাক, বাবুল ইদ্দাহ – ওষুধ দ্বারা হায়েজ আনার বিধান।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী রহ.): খন্ড ২, ইদ্দত অধ্যায় – কৃত্রিম হায়েজের মাসআলা।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী দা.বা.): খন্ড ২, তালাক ও ইদ্দত – ইদ্দতে ওষুধ ব্যবহারের বিধান।
- বেহেশতী জেওর (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.): ইদ্দত সম্পর্কিত মাসআলা – স্বাভাবিক হায়েজের গুরুত্ব।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): খন্ড ১, কিতাবুত তালাক – ইদ্দতের শর্তাবলী।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ইদ্দত দ্রুত শেষ করতে হায়েজ আনার ওষুধ খাওয়া জায়েজ? | না, জায়েজ নয়। এটি গুনাহ ও শরীয়তের লক্ষ্যের পরিপন্থী। | | ওষুধ খেয়ে হায়েজ এলে কি ইদ্দত পূর্ণ হবে? | হ্যাঁ, যদি ন্যূনতম ৩ দিন রক্ত থাকে (হায়েজের শর্ত পূর্ণ হলে) তবে ইদ্দত পূর্ণ হবে। তবে গুনাহ থেকে যাবে। | | কী করা উচিত? | স্বাভাবিকভাবে হায়েজ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ধৈর্যধারণ করুন। |
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ইদ্দত সহজে পার করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)