মাহরাম ছাড়া বিদেশ ভ্রমন করা যাবে কিনা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার বিয়ের ১৭ দিন পর আমার হাজব্যান্ড এক বছরের জন্য সৌদিতে চলে যান।এখন আমাদের বিয়ের ৪ মাস চলছে।উনার এভাবে একা একা সৌদি থাকা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।উনি যে চলে আসবে দেশে, উনার ওখানে সমস্যার জন্য আসতেও পারছেন না।
উনি আমাকে সৌদিতে যেতে বলে। কিন্তু আমি ওখানে গেলে আমাকে একাই যেতে হবে কোনোরকম মাহরাম ছাড়াই।
এভাবে মাহরাম ছাড়া যদিও স্বামীর প্রয়োজনে এতোদূর ভ্রমন করা কি জায়েজ হবে??আমি কি যেতে পারবো?
২.গ্রামের মহিলাদের বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ দেয়া হয়।পরে আবার কিস্তির মাধ্যমে মুনাফাসহ সেই ঋণ পরশোধ করতে হয় ।
এখন আমার প্রশ্ন হলো,আমাদের পাশের বাড়ির এক মহিলা এভাবে ঋণ নিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে সেই কিস্তি পরিশোধ করতে হয় কিন্তু উনারা সেও টাকাও মেনেজ করতে পারে না অভাবের জন্য।উনি যদি সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করার জন্য কারো কাছে থেকে টাকা ধার চায়, সে কি ধার দিতে পারবে যেহেতু সুদি কারবার আছে এখানে।
Answer
উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্ন দুটির উত্তর নিম্নে দেওয়া হলো। আমরা হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব ও ফতোয়ার ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করছি।
১. মাহরাম ছাড়া স্বামীর কাছে বিদেশ ভ্রমণ
প্রশ্ন: স্বামী সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তিনি আপনাকে সেখানে যেতে বলেছেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে কোনো মাহরাম (যেমন: পিতা, ভাই, চাচা) নেই। একা ভ্রমণ করা কি জায়েজ?
উত্তর:
ইসলামি শরিয়তে একজন নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা নিষিদ্ধ, বিশেষ করে তিন দিন (প্রায় ৪৮ মাইল বা ৭৭ কিমি) বা তার বেশি দূরত্বের সফর। হাদিসে এসেছে:
"কোনো নারী মাহরাম ছাড়া তিন দিনের পথ সফর করবে না।" (সহিহ বুখারি: ১০৮৬, সহিহ মুসলিম: ১৩৩৮)
হানাফি ফিকহের বড় বড় কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৩৯৬): "নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েজ নয়, যদিও তা নিরাপদ হয়।"
- ফতোয়া হিন্দিয়া (১/২৭৪): "মাহরাম ছাড়া সফর করা হারাম।"
ব্যতিক্রম: শুধুমাত্র ফরজ হজ বা ওমরার জন্য কোনো নির্ভরযোগা দলের সাথে যেতে কিছু মত আছে, কিন্তু এখানেও হানাফি মতে মাহরাম আবশ্যক (মা'রিফুল কুরআন ২/৩৩২)।
বর্তমান প্রসঙ্গ:
আপনার স্বামীর কাছে যাওয়া একটি বৈধ প্রয়োজন, কিন্তু ইসলাম এটাকে মাহরাম ছাড়া অনুমতি দেয়নি। আপনি যদি বিমানে একা ভ্রমণ করেন, তবুও শরিয়তের দৃষ্টিতে তা জায়েজ নয়, কারণ বিমানপথেও একা নারী নিরাপদ নয় এবং শরিয়তের বিধান ভ্রমণের মাধ্যম পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না।
সমাধান:
- আপনি যদি কোনো মাহরাম (পিতা, ভাই, চাচা, স্বামীর নিকট আত্মীয়) একই সফরে পেতে পারেন, তবে যেতে পারেন।
- স্বামী নিজে দেশে ফিরে আসার চেষ্টা করবেন, অথবা কিছু সময় পর তিনি যখন ফিরবেন, তখন দেখা করার চেষ্টা করুন।
- বর্তমানে প্রযুক্তির মাধ্যমে (ভিডিও কল) যোগাযোগ রেখে ধৈর্য ধরা উত্তম।
সিদ্ধান্ত: মাহরাম ছাড়া সৌদি আরব বা অন্য কোনো দূরবর্তী দেশে একা ভ্রমণ জায়েজ নয়। আপনি যেতে পারবেন না।
২. এনজিও থেকে সুদি ঋণ পরিশোধের জন্য ধার দেওয়া
প্রশ্ন: এক মহিলা এনজিও থেকে সুদি শর্তে ঋণ নিয়েছে। এখন সে সাপ্তাহিক কিস্তি (মুনাফাসহ) পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। সে যদি আপনাকে টাকা ধার চায়, তাহলে আপনি কি তাকে ধার দিতে পারবেন?
উত্তর:
প্রথমত, সুদি ঋণ নেওয়া মহাপাপ। আল্লাহ বলেছেন:
"আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৬)
এছাড়া হাদিসে সুদ খোর, সুদদাতা ও সাক্ষী সবাইকে লানত দেওয়া হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
ধার দেওয়ার বিধান:
আপনি যদি তাকে মুফি (সুদহীন) ধার দেন, যেমনটি সাধারণ ক্বারজে হাসানা (উত্তম ঋণ) হিসেবে হয়, তাহলে মূল কথা হলো: আপনি তাকে যে টাকা দিচ্ছেন, তা দিয়ে সে তার বৈধ প্রয়োজন পূরণ করবে কি না? কিন্তু এখানে বাস্তবতা হলো—সে সেই টাকা সরাসরি সুদি কিস্তি পরিশোধে ব্যবহার করবে।
হানাফি ফিকহের নীতি:
"পাপের কাজে সাহায্য করা হারাম" (لا تعاونوا على الإثم والعدوان) — সূরা মায়েদা: ২
তাই আপনি যদি জানেন যে সে টাকা নিয়ে সুদি কিস্তি পরিশোধ করবে, তাহলে সরাসরি তাকে ধার দেওয়া জায়েজ নয়, কারণ আপনি পরোক্ষভাবে সুদি ব্যবসায় সহায়তা করছেন।
ফতোয়া উসমানি (৫/২৫৭):
"যদি কেউ সুদি ঋণ পরিশোধের জন্য অন্য কারও কাছ থেকে সুদমুক্ত ধার চায়, তাহলে সেই ধার দেওয়া মাকরূহ তাহরিমি (নিকটবর্তী হারাম), কারণ এটি সুদের কাজকে সহায়তা করার শামিল।"