সহশিক্ষার ব্যাপারে আলহামদুলিল্লাহ বলা নিয়ে প্রশ্ন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আলহামদুলিল্লাহ কখন বলতে হয়?
কেউ যদি সহশিক্ষায় পড়ে এবং আমি বলি যে আলহামদুলিল্লাহ,এই অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলা কি ঠিক নাহ?
আলহামদুলিল্লাহ ত সব পরিস্থিতিতে বলা যায় কি?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আলহামদুলিল্লাহ একটি অত্যন্ত বরকতময় ও পবিত্র বাক্য। এটি সকল অবস্থায় বলার অনুমতি রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ত ও প্রসঙ্গভেদে এর ব্যবহারের মর্ম ভিন্ন হতে পারে।
১. আলহামদুলিল্লাহ কখন বলতে হয়?
আলহামদুলিল্লাহ বলা সর্বাবস্থায় জায়েয ও মুস্তাহাব। কেননা এটি আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাক্য। নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে এটি বিশেষভাবে বলতে উৎসাহিত করা হয়েছে:
- সুখের সময়: যখন কোনো নিয়ামত বা ভালো কিছু পাওয়া যায় (যেমন: খাবার খাওয়ার পর, নতুন পোশাক পরার সময়, কাজ সফল হলে)।
- দুঃখের সময়: কোনো বিপদ বা কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে বললে তা ইমানের পরিচয় বহন করে।
- সাধারণ জিকির: দৈনন্দিন জীবনে জিকির হিসেবে নিয়মিত বলা।
- হাঁচির পর: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, হাঁচির পর "আলহামদুলিল্লাহ" বলা (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৫০২৯)।
কুরআনের নির্দেশনা:
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ "তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করব এবং আমার শুকরিয়া আদায় কর; অকৃতজ্ঞ হয়ো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫২)
২. সহশিক্ষা (Co-education) পরিবেশে আলহামদুলিল্লাহ বলা
প্রশ্নে উল্লেখিত প্রসঙ্গে দুটি দিক বিবেচনা করা জরুরি:
ক) সহশিক্ষা নিজেই একটি শরয়ী সমস্যাঃ ইসলামী শরীয়তে পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা ও সহশিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, বিশেষ করে বেপর্দা অবস্থায়। তবে কেউ যদি এই পরিবেশে পড়াশোনা করতে বাধ্য হয় এবং নিজে তাওবা করে, তবে সেই ব্যক্তির জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলা জায়েয। কিন্তু যদি সে পাপকে স্বাভাবিক মনে করে এবং গুনাহের কাজে লিপ্ত থেকে আল্লাহর প্রশংসা করে, তাহলে তা কপটতা হবে।
খ) ফতোয়ার নীতিঃ হানাফি ফিকহের কিতাবে আছে, কোনো ব্যক্তি গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকলে এবং সেটাকে প্রতিরোধ না করলে তার উচিত প্রথমে গুনাহ ত্যাগ করে তাওবা করা। এরপর আলহামদুলিল্লাহ বলার অর্থ হবে।
قال الإمام ابن عابدين في حاشيته: "ولا يقال الحمد لله على المعصية؛ لأنه كفران للنعمة" (رد المحتار: ٦/٣٩٩) অর্থাৎ: "গুনাহের উপর আলহামদুলিল্লাহ বলা উচিত নয়; কেননা এটি নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা।"
সুতরাং, আপনি যদি আপনার পরিচিতকে সহশিক্ষায় পড়তে দেখেন এবং তাকে "আলহামদুলিল্লাহ" বলেন, তাহলে এর নিয়ত হতে পারে দু'আ বা তার হেদায়েত কামনা। এটি ঠিক আছে। তবে গুনাহকে সমর্থন বা উৎসাহিত করার নিয়তে বললে তা নাজায়েয হতে পারে।
৩. সর্বাবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলা যাবে কি?
হ্যাঁ, যেকোনো পরিস্থিতিতে আলহামদুলিল্লাহ বলা জায়েয। তবে নিম্নলিখিত ব্যতিক্রমগুলি মনে রাখতে হবে:
- গুনাহের কাজ করার মুহূর্তে: যখন কেউ প্রকাশ্যে গুনাহ করছে, তখন তার প্রশংসা হিসেবে আলহামদুলিল্লাহ বলা নাজায়েয। বরং তার প্রতি নিষেধ করা ওয়াজিব।
- বিদআতের ক্ষেত্রে: কোনো বিদআতের কাজে অংশ নেওয়ার পর "আলহামদুলিল্লাহ" বলা ভুল।
- খারাপ পরিণতি দেখে: কাউকে বিপদে পড়তে দেখে "আলহামদুলিল্লাহ" বলা (অর্থাৎ খুশি হওয়া) মাকরূহ।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (৪/৩৮২): "الْحَمْدُ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ" – সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহর জন্য।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৭): "আলহামদুলিল্লাহ বলা সব সময় জায়েয, তবে গুনাহের প্রশংসা করা নাজায়েয।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/১৮৪): "আলহামদুলিল্লাহর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, তাই তা শুধু ভালো কাজ বা নিয়ামতের সময়ই মুস্তাহাব।"
সারসংক্ষেপ:
| পরিস্থিতি | আলহামদুলিল্লাহ বলার হুকুম | |------|------| | সাধারণ ভালো কাজ বা নিয়ামত প্রাপ্তি | মুস্তাহাব ও সওয়াবের কাজ | | গুনাহর কাজে লিপ্ত ব্যক্তি | তাকে তাওবা করতে বলা উচিত, প্রশংসা নয় | | সহশিক্ষায় পড়া ব্যক্তিকে দুআর নিয়তে বলা | জায়েয, তবে গুনাহকে সমর্থন করা নয় | | যে কোনো সময় আল্লাহর জিকির হিসেবে | অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ |
মোট কথা: আপনি যদি কাউকে সহশিক্ষায় পড়তে দেখে "আলহামদুলিল্লাহ" বলেন এবং আপনার নিয়ত হয় তার জন্য হেদায়েতের দু'আ বা আপনার নিজের দীনের প্রতি সন্তুষ্টি, তাহলে তা জায়েয ও উত্তম। কিন্তু যদি আপনি গুনাহের কাজকে ভালো মনে করে প্রশংসা করেন, তাহলে তা জায়েয নয়।
والله أعلم بالصواب