গোনাহ কি রিজিক কমিয়ে দেয়? শাতিমে রাসূলের সাথে কাজ শেখা জায়েয কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।গোনাহের কারনে কি রিজিক কমে যায়। আর যারা নেক আমলও করে গোনাহও করে তাদের রিজিক ঠিক থাকবে কিনা?
৩।গোনাহের কারনে যদি রিজিক কমে যায় এটাকি কোরআন হাদিসে সরাসরি আছে। অনেকে গোনাহ করে তার সম্পদ অনেক আছে?
Answer
প্রশ্নোত্তর: গোনাহ, রিজিক ও শাতিমে রাসূল (সা.)-এর সাথে কাজ করার বিধান
প্রশ্নকারী: Shawon
বিষয়: ফিকহ ও আকীদা
মাযহাব: হানাফী
উত্তর
আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর নিম্নে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহের আলোকে দেয়া হলো।
১. শাতিমে রাসূল (সা.)-এর সাথে সরকারিভাবে কারেন্টের কাজ শিখলে গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে কি?
উত্তর:
শাতিমে রাসূল (صلى الله عليه وسلم) অর্থাৎ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে গালি দেয় বা তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, সে যদি মুসলিম হয় তবে তা কুফরী (ইসলাম থেকে বের হওয়া) হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) সহ সকল ইমামের মতে, রাসূল (সা.)-কে গালি দেয়া বা অবমাননা করা কুফরী এবং এ কাজ করলে ব্যক্তি মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায়। (আল-হিদায়া, কিতাবুস সিয়ার; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৫৮; রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬)
তবে আপনার ক্ষেত্রে:
(ক) আপনি নিশ্চিত নন যে ঐ ব্যক্তি শাতিমে রাসূল কিনা।
(খ) তার নিয়ত কী ছিলো তাও আপনি জানেন না।
হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
- কোনো মুসলিমকে কাফির বা মুরতাদ বলার জন্য নিশ্চিত প্রমাণ জরুরি। সন্দেহের ভিত্তিতে কারো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া জায়েয নেই।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে, তবে তা তাদের দু’জনের একজনের ওপর ফিরে আসে (অর্থাৎ যদি সে কাফির না হয়, তবে বলকারী নিজে কাফির হয়ে যায়)।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১০৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬০)
সুতরাং: আপনি যেহেতু নিশ্চিত নন, তাই ঐ ব্যক্তিকে শাতিমে রাসূল বলার অধিকার আপনার নেই। উল্টো তার সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করা উচিত।
এখন কারেন্টের কাজ শেখা:
- কারেন্টের কাজ (বিদ্যুৎ সংক্রান্ত) একটি বৈধ পেশা। কোনো মুসলিমের কাছে থেকে এই কাজ শেখা জায়েয, যদি শিক্ষক নিজে নাজায়েয কাজে লিপ্ত না হন এবং শেখা অবস্থায় আপনার ঈমানের কোনো ক্ষতি না হয়।
- তবে যদি ব্যক্তিটি প্রকাশ্যে শাতিমে রাসূল হয় এবং ইসলাম বিদ্বেষী হয়, তাহলে তার সাথে উঠাবসা ও সঙ্গ রাখা নাজায়েয (হারাম)। কেননা আল্লাহ বলেন: “তোমরা তাদের সাথে বসো না, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বিদ্রূপ করে, যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত হয়। অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো গণ্য হবে।” (সূরা আন-নিসা ৪:১৪০)
তবে শুধু কাজ শেখার জন্য যদি তার কাছে যেতে হয় এবং আপনি তার আকীদা গ্রহণ করেন না, তাহলে আপনার ঈমানের সমস্যা হবে না, তবে অন্যায়ের সাথে সহযোগিতা না করাই উত্তম। আর যদি আপনি নিশ্চিত হন যে সে মুরতাদ, তাহলে তার সাথে কোনো ধরনের বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা জায়েয নয়।
সারসংক্ষেপ:
- আপনি নিশ্চিত না হওয়ায় গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে না।
- দূরে থাকাই নিরাপদ, তবে প্রয়োজনে কাজ শিখতে পারলে তা জায়েয।
- যদি পরে নিশ্চিত হন, তাহলে তার সঙ্গ ত্যাগ করা ওয়াজিব।
হানাফী কিতাবের উল্লেখ:
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪০৩-৪০৫ (শাতিমে রাসূলের বিধান)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/১৫১-১৫৩ (মুরতাদের সাথে সম্পর্ক)
- বাহিশতী জেওর, দশম অধ্যায় (শাতিমের সাথে চলাফেরা)
২. গোনাহের কারণে কি রিজিক কমে যায়? আর যারা নেক আমলও করে এবং গোনাহও করে, তাদের রিজিক ঠিক থাকবে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, গোনাহের কারণে রিজিকে বরকত কমে যায় এবং অনেক সময় আয় কমেও যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“إِنَّ الْعَبْدَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ”
“নিশ্চয় বান্দা তার কৃত গোনাহের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪০২২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭২১১ – ইমাম ইবনে হিব্বান ও হাকিম সহীহ বলেছেন)
ব্যাখ্যা:
- রিজিক শুধু অর্থ-সম্পদ নয়, বরং তাতে বরকত (আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ) থাকা জরুরি। গোনাহের কারণে বরকত উঠে যায়। যেমন: কম আয়েই যদি বরকত থাকে, তবে তা চলতে পারে; অথচ বেশি আয়েও যদি বরকত না থাকে, তবে অশান্তি ও অভাবে জীবন কাটে।
যারা নেক আমলও করে এবং গোনাহও করে:
তাদের ক্ষেত্রে দুটি অবস্থা:
- যদি তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাদের জন্য রিজিকের পথ খুলে দেন।
- যদি গোনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় নেক আমল করে, তবে রিজিক হয়তো বাহ্যিকভাবে আসে, কিন্তু তাতে বরকত থাকে না। অনেক সময় তাদের সম্পদ বাড়ে কিন্তু তা তাদের জন্য ইসতিদরাজ (ধীরে ধীরে শাস্তি) হয়। আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার কাছ থেকে গোনাহের কারণে দুনিয়ার বরকত উঠিয়ে নেন, আর যাকে অপছন্দ করেন, তাকে গোনাহ করেও দুনিয়ায় সম্পদ দিতে থাকেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন:
“গোনাহ পুণ্যকে ধ্বংস করে, যেমন আগুন শুকনো কাঠকে ধ্বংস করে। আর গোনাহ বরকত দূর করে এবং রিজিক সংকুচিত করে।” (আল-জাওয়াবুল কাফী, ১/৯২)
সারসংক্ষেপ:
- গোনাহের কারণে রিজিক কমে যেতে পারে ও নিশ্চয়ই বরকত কমে যায়।
- নেক আমল করলেও যদি গোনাহ না ছাড়ে, তবে রিজিকের স্থায়িত্ব ও বরকত থাকে না।
- তবে আল্লাহর কুদরতের কোনো বাধা নেই; তিনি কখনো কখনো গোনাহগারকেও দুনিয়ায় সম্পদ দেন, সেটা পরীক্ষাস্বরূপ।
হানাফী কিতাবের উল্লেখ:
- মাআরিফুল কুরআন, সূরা ত্বাহা ২০:১২৪ (সঙ্কীর্ণ জীবনের ব্যাখ্যা) – মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৭১ (গোনাহ ও রিজিক)
- বাহিশতী জেওর, ১/৮৫ (গোনাহের দুনিয়াবী ক্ষতি)
- রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৪ (গোনাহের কাফফারা ও রিজিক)
৩. গোনাহের কারণে রিজিক কমে যায় – এটা কি কুরআন ও হাদীসে সরাসরি আছে? অনেকে গোনাহ করেও সম্পদশালী কেন?
উত্তর:
হ্যাঁ, কুরআন ও হাদীসে সরাসরি বলা হয়েছে যে গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি রিজিক ও জীবিকার সংকীর্ণতা আনে।
কুরআনের আয়াত:
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا
“যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবন।”
(সূরা ত্বাহা ২০:১২৪)
এখানে ‘সংকীর্ণ জীবন’ বলতে দুনিয়ার রিজিক ও বরকতের অভাব বুঝানো হয়েছে। তাফসীরকারকগণ (ইমাম কুরতুবী, ইমাম ইবনে কাসীর) বলেন: এটি সৎকর্ম ও তাকওয়া থেকে বিমুখ হওয়ার শাস্তি।
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“যদি জনপদবাসী ঈমান আনতো ও তাকওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিন থেকে বরকতের দরজা খুলে দিতাম; কিন্তু তারা মিথ্যারোপ করল, ফলে আমি তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের পাকড়াও করলাম।”
(সূরা আল-আরাফ ৭:৯৬)
আয়াতটি স্পষ্ট: তাকওয়া ও ঈমান রিজিকের বরকত আনে, আর পাপ ও কুফরী তাদের কাছ থেকে বরকত ছিনিয়ে নেয়।
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالْخَطِيئَةِ الَّتِي يُصِيبُهَا”
“মানুষ তার কৃত গোনাহের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪০২২; মুসনাদে আহমাদ ২২৩৮৩ – হাদীসটি সহীহ)
প্রশ্ন: অনেকে গোনাহ করেও সম্পদশালী – এর ব্যাখ্যা কী?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, দুনিয়ার সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টি বা ভালোবাসার নিদর্শন নয়। বরং আল্লাহ অপরাধীকে অনেক সময় দুনিয়ায় ধন-সম্পদ দিয়ে আখিরাতে তার শাস্তি বাড়িয়ে দেন। ইহাকে বলা হয় ‘ইসতিদরাজ’ (استدراج) – ধীরে ধীরে নিচের দিকে নিয়ে যাওয়া।
কুরআনে এসেছে:
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِّأَنفُسِهِمْ ۚ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا
“কাফেররা যেন না মনে করে যে, আমি তাদের যে অবকাশ দিচ্ছি তা তাদের জন্য কল্যাণকর; বরং আমি তাদের অবকাশ দিই যাতে তারা পাপে আরো বাড়ে।”
(সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৮)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“إِذَا رَأَيْتَ اللَّهَ يُعْطِي الْعَبْدَ مِنَ الدُّنْيَا مَا يُحِبُّ، وَهُوَ مُقِيمٌ عَلَى مَعَاصِيهِ، فَإِنَّمَا ذَلِكَ مِنْهُ اسْتِدْرَاجٌ”
“যখন তুমি দেখো যে আল্লাহ কোনো বান্দাকে দুনিয়ার সম্পদ দিচ্ছেন অথচ সে গোনাহে লিপ্ত, তবে জেনে রাখো সেটা ইসতিদরাজ (ক্রমান্বয়ে শাস্তি)।”
(মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৩৩০; সহীহ ইবনে হিব্বান)
সুতরাং, গোনাহগারের সম্পদশালী হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসা নয়, বরং পরীক্ষা বা ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের পূর্বাভাস।
সারসংক্ষেপ:
- কুরআন ও হাদীসে সরাসরি গোনাহের কারণে রিজিক কমে যাওয়া ও বরকত হরণের কথা এসেছে।
- যারা গোনাহ করে সম্পদশালী, তাদের সম্পদ বরকতহীন এবং তা ইসতিদরাজ হতে পারে।
- নিজেদের রিজিক বাড়াতে চাইলে তাওবা, তাকওয়া ও ইসতিগফার করতে হবে।
হানাফী কিতাবের উল্লেখ:
- মাআরিফুল কুরআন, ৫/৫০৩ (সূরা আরাফ ৭:৯৬-এর তাফসীর) – মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/৫৮১-৫৮২ (গোনাহ ও রিজিক)
- বাহিশতী জেওর, ১/৪৬-৪৭ (গোনাহের দুনিয়াবী ক্ষতি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৫১১-৫১৩ (ইসতিদরাজের ব্যাখ্যা)
- রদ্দুল মুহতার, ১/৪১-৪২ (রিজিকে বরকতের কারণ)
চূড়ান্ত পরামর্শ
- প্রথম প্রশ্ন: আপনি যদি নিশ্চিত না হন তবে কারো ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করবেন না। কাজ শেখা জায়েয, তবে সতর্ক থাকুন যেন তার কোনো নাজায়েয কর্মে আপনি অংশগ্রহণ না করেন।
- দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্ন: নিজের রিজিক বাড়াতে হলে ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও তাওবা’র অভ্যাস করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا
“তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল; তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি ধারা পাঠাবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন।”
(সূরা নূহ ৭১:১০-১২)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।
ওয়াল্লাহু তায়ালা আলাম বিস সওয়াব।