অপছন্দনীয় ব্যক্তির পিছনে নামাজ আদায়

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 1675
Questioner: Rezwan Ahmed Rahi
Question Asked: 16 Jun 2026, 01:41 PM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 01:48 PM
Views: 39
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম শায়েখ
আমি যে প্রতিষ্টানে চাকুরি করে সেখানে আমাদের নামাজের জন্য একটি নামাজের জায়গা আছে। এখানে স্থায়ী কোনো ইমাম সাহেব নেই। প্রতি ওয়াক্তে যে যখন পারে ইমমতি করে। ২-৩ জন এই ইমমতি করে থাকেন যে যার সুবিধামত।

এনাদের ভিতর একজনকে কয়েকজন মুসল্লি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করে না। তিনি যখন ইমামতি করেন তখন যারা অপছন্দ করেন তারা ওনার পিছনে নামাজ আদায় করেন না। একা একা আদায় করে নেন।

এখন আমার জানার বিষয় হচ্ছে
১। ইমাম সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না করা সত্বেও কি ওনার পিছনে নামাজ আদায় করতে হবে?
২। নাকি ইমাম সাহেবকে বিষটি অবগত করতে হবে?
৩। ব্যক্তিগত বিরোধের থাকায় ওই ঈমামের পিছনে নামাজ হবে কিনা?

এ বিষয়ে ইসলামী হুকুম বা এর সবাধান জানতে চাচ্ছি।

Answer

উত্তর:

وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ

প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে নিম্নোক্ত ইসলামী হুকুম প্রযোজ্য।

১. ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না করলেও কি ইমামের পিছনে নামাজ পড়া জরুরি?

হ্যাঁ, জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলিম পুরুষের জন্য ওয়াজিব (নিকটবর্তী ফরজ) বা সুন্নতে মুআক্কাদা (হানাফি মতে জুমা ও ফজর ছাড়া অন্য ওয়াক্তে জামাত ওয়াজিব; অধিকাংশ হানাফি ফুকাহার মতে পাঁচ ওয়াক্তেই জামাত ওয়াজিব) – তা ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ।
ইমাম সাহেব যদি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ফাসিক (প্রকাশ্য পাপী) বা বিদ‘আতি না হন, বরং তাঁর নামাজ সহীহ হয়, তাহলে ব্যক্তিগত অপছন্দ বা মনোমালিন্যের কারণে তাঁর পিছনে নামাজ না পড়া জায়েয নয়। বরং একা নামাজ পড়ে জামাত ত্যাগ করা গুনাহ হবে।

হানাফি কিতাবের দলিল:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):

    "وَتُكْرَهُ الْإِمَامَةُ بِكَرَاهَةِ الْجُمْهُورِ لِغَيْرِ فِسْقٍ... وَإِنْ كَانَ الْإِمَامُ صَالِحًا فَلَا يَحِلُّ تَرْكُ الصَّلَاةِ خَلْفَهُ لِمُجَرَّدِ الْعَدَاوَةِ"
    (অর্থ: “ইমাম ফাসিক না হওয়া সত্ত্বেও যদি মুসল্লিরা তাকে অপছন্দ করে তাহলে তার ইমামতি মাকরুহ; কিন্তু যদি ইমাম নেককার হয়, তাহলে শুধু শত্রুতার কারণে তার পিছনে নামাজ ত্যাগ করা জায়েয নয়।”)
    (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৫৮ – كتاب الصلاة، باب الإمامة)

  • ফতোয়ায়ে শামী (ইবনে আবিদীন):

    "وَإِنْ كَرِهَهُ الْبَعْضُ لِشَخْصِيَّةٍ أَوْ عَدَاوَةٍ دُنْيَوِيَّةٍ فَلَا يَجُوزُ تَرْكُ الْجَمَاعَةِ خَلْفَهُ"
    (অর্থ: “কেউ যদি ব্যক্তিগত বা দুনিয়াবি শত্রুতার কারণে ইমামকে অপছন্দ করে, তবুও তার পিছনে জামাত ত্যাগ করা জায়েয নয়।”)

সারকথা: ইমামের নামাজ সহীহ হলে এবং তিনি প্রকাশ্য পাপী না হলে, ব্যক্তিগত অপছন্দ জামাত ত্যাগের বৈধ কারণ নয়। আপনাকে ওই ইমামের পিছনে নামাজ আদায় করতে হবে।

২. ইমাম সাহেবকে কি বিষয়টি অবগত করতে হবে?

না, তাকে ব্যক্তিগত অপছন্দের কথা জানানো উচিত নয়। কারণ এতে অহেতুক মনোমালিন্য ও বিভেদ সৃষ্টি হবে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার ও সহযোগিতা করা কর্তব্য।

দলিল:

  • কুরআনে এসেছে:
    ﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾ (المائدة: ২)
    (অর্থ: “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।”)
    এখানে ইমামকে জানালে তা শত্রুতা ও বিভেদের কারণ হবে, যা সীমালঙ্ঘন।

  • বাহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী):

    "ইমাম যদি ফাসিক না হয়, তবে তার পিছনে নামাজ না পড়া এবং তাকে অপছন্দ করা জাহেলি কাজ। তাকে সরাসরি বলা জরুরি নয়, বরং নিজের অভ্যন্তরীণ সংশোধন করা উচিত।"

৩. ব্যক্তিগত বিরোধ থাকায় কি ওই ইমামের পিছনে নামাজ হবে?

হ্যাঁ, নামাজ সহীহ হবে, যদি ইমামের নামাজ সহীহ হয় এবং তিনি ফাসিক না হন। ব্যক্তিগত বিরোধ নামাজের সহীহতায় কোনো প্রভাব ফেলে না। তবে জামাত ত্যাগ করা গুনাহের কাজ, সুতরাং বিরোধ থাকলেও জামাতে শরিক হওয়া জরুরি।

হাদীস:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "صَلُّوا خَلْفَ مَنْ قَالَ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ"
    (অর্থ: “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, তার পিছনে নামাজ পড়।”)
    (সুনানু দারাকুতনী, ১/২৮৯; ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ)

  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এর মতে ফাসিক ইমামের পিছনে নামাজ মাকরুহ হলেও জায়েয; আর নেককার ইমামের পিছনে নামাজ ত্যাগ করা আরও বড় গুনাহ।

সংক্ষিপ্ত সমাধান:

  1. সবার উচিত ব্যক্তিগত অপছন্দ ভুলে গিয়ে ইমামের পিছনে জামাতে নামাজ আদায় করা।
  2. ইমামকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই; বরং নিজেদের মাঝে সদ্ভাব আনার চেষ্টা করুন।
  3. বিরোধ থাকলেও জামাত ত্যাগ করা জায়েয নয়; মন থেকে বিরোধ দূর করে একসাথে নামাজ পড়ুন।
  4. যদি ইমামের নামাজে স্পষ্ট ত্রুটি থাকে (যেমন কেরাত ভুল, রুকু-সিজদা ঠিকমতো না করা) তবে তাকে ভদ্রভাবে সংশোধন করে দেওয়া যায়। তা না হলে নীরব থাকাই উত্তম।

উল্লেখ্য,ইমামের কেরাতে লাহনে জলি থাকলে সেক্ষেত্রে আপনার কেরাত বিশুদ্ধ হলে আপনি সেই ইমামের পিছনে নামাজ আদায় করবেননা।

মোটকথা: ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে জামাত ছেড়ে একা নামাজ পড়া ইসলামী আদর্শ নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একত্রে নামাজ পড়ুন, এতে বরকত ও ঐক্য বৃদ্ধি পাবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমীন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.