হারাম মাল দ্বারা কেনা জিনিস দিয়ে হালাল কাজ করে প্রাপ্ত আয় হালাল হবে কিনা এবং সেই আয় দিয়ে হারাম মূলধন পরিশোধ করা যাবে কিনা?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আর আরেকটি প্রশ্ন হলো এমন হারাম টাকা যা মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত নয় সেই হারাম টাকা দিয়ে বেবসার সকল সফটওয়্যার কিনলে আর সেই হারাম টাকা দিয়ে বেবসার সকল লাইসেন্স এবং বিজ্ঞাপন দিলে সেই বেবসার পন্ন কেনার টাকা হালাল টাকা হলে সেই বেবসার লাভের টাকা কি হালাল হবে আর এই বেবসা যে কম্পিউটার দিয়ে করব সেই কম্পিউটার হারাম টাকা দিয়ে কেনা এই হারাম টাকা মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত নয়
তাহলে লাভ কি হালাল হবে হারামের দায় সধ করার আগে আর এই বেবসা থেকে লাভ করে সেই লাভের টাকা দিয়ে হারামের দায় কি সধ করা যাবে
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – হারাম মাল দ্বারা কেনা জিনিস দিয়ে হালাল কাজ করে প্রাপ্ত আয় হালাল হবে কিনা এবং সেই আয় দিয়ে হারাম মূলধন পরিশোধ করা যাবে কিনা। হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নে স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হলো।
প্রথম প্রশ্ন: হারাম টাকা দিয়ে কেনা কম্পিউটার/ডিভাইস দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করলে আয় হালাল হবে কি?
উত্তর:
যদি কম্পিউটার, ক্যামেরা বা স্মার্ট ডিভাইস এমন হারাম টাকা দিয়ে কেনা হয় যা মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত নয় (যেমন: সুদ, জুয়া, ঘুষ, চুরি ইত্যাদি নয় বরং নিজের অন্যায় উপার্জন যেমন হারাম চাকরি বা ব্যবসার টাকা), তবে সেই ডিভাইসের মালিকানা আপনারই থাকবে। কিন্তু আপনি গুনাহগার হবেন ওই হারাম টাকা ব্যবহার করার কারণে।
ডিভাইসটি নিজে নাপাক বা হারাম নয়। তাই এটি দিয়ে হালাল কাজ (যেমন: ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, কন্টেন্ট রাইটিং) করলে সেই কাজের আয় হালাল হবে। কারণ আয় আসে আপনার পরিশ্রম ও দক্ষতা থেকে, ডিভাইসটি শুধু একটি মাধ্যম। তবে আপনাকে হারাম মূলধন (যে টাকা দিয়ে ডিভাইস কেনা হয়েছে) সদকা করে দিতে হবে। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৪/২১৮; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৮৪-৮৫)
তবে শর্ত:
- ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ হালাল হতে হবে।
- হারাম টাকার পরিমাণ জানা থাকলে তা অবশ্যই সদকা করে ফেলতে হবে।
- সদকা করার ক্ষেত্রে সওয়াবের নিয়ত করবেন না, বরং গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য করবেন।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ: হারাম টাকা দিয়ে ব্যবসার সফটওয়্যার, লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন কেনা, এবং পণ্য হালাল টাকায় কিনে লাভ করা
উত্তর:
এক্ষেত্রে ব্যবসার প্রকৃতি হালাল (যেমন বৈধ পণ্য বিক্রি) এবং পণ্য কেনার টাকা হালাল – তাহলে লাভের টাকা হালাল হবে। কারণ হারাম টাকা শুধু ব্যবসার সরঞ্জাম ও প্রচারণায় ব্যবহার হয়েছে, যা ব্যবসার মুনাফার উৎস নয়; লাভ আসে পণ্য বিক্রয় থেকে। (সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৫৪)
তবে হারাম টাকার দায় থেকে যাবে। সেই দায় মেটানোর জন্য আপনাকে:
- যে পরিমাণ হারাম টাকা সফটওয়্যার, লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপনে খরচ করেছেন, সেই পরিমাণ টাকা সদকা করে দিতে হবে।
- আপনি উক্ত ব্যবসার লাভ থেকে সেই পরিমাণ সদকা করতে পারবেননা আপনাকে অন্য কোনো হালাল টাকা হতে সেই টাকা সদকাহ করতে হবে।
এক্ষেত্রে পরবর্তী হতে লাভ হালাল হবে।
- ব্যবসার মূলধনের মধ্যে হারাম টাকা মিশ্রিত থাকায় পুরো ব্যবসা চলাকালে আপনি গুনাহগার থাকবেন যতক্ষণ না সদকা সম্পন্ন করেন। তাই দ্রুত সদকার ব্যবস্থা করা উচিত।
কম্পিউটার হারাম টাকায় কেনা হলেও – তার জন্যও আলাদাভাবে সেই হারাম টাকার পরিমাণ সদকা করতে হবে। কম্পিউটার দিয়ে ব্যবসা করলে লাভ হালাল হবে, কিন্তু হারাম টাকার দায় সদকার মাধ্যমে দূর করতে হবে।
হারামের দায় সধ করার পদ্ধতি:
- প্রথমে হিসাব করুন: কম্পিউটার, সফটওয়্যার, লাইসেন্স, বিজ্ঞাপন – এ সব মিলিয়ে মোট কত হারাম টাকা খরচ করেছেন।
- সেই টাকা নেক নিয়ত ছাড়া গরিব-মিসকিন, এতিমখানা বা ইসলামি প্রতিষ্ঠানে সদকা করুন।
- লাভ থেকে ধীরে ধীরে সদকা করা জায়েজ, তবে দ্রুত করা উত্তম।
- তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকার সংকল্প করুন।
হানাফি ফিকহের দলিল:
-
রদ্দুল মুহতার (৪/২১৮):
“যদি কেউ হারাম মাল দিয়ে কোনো জিনিস ক্রয় করে, তবে তা তার মালিকানায় চলে আসে কিন্তু সে গুনাহগার হয়। সেই জিনিস ব্যবহার করে হালাল উপার্জন করলে তা হালাল, তবে হারাম মূলধন সদকা করা ওয়াজিব।” -
ফাতাওয়া উসমানী (২/৮৪-৮৫):
“সুদের টাকা দিয়ে কেনা জিনিস ব্যবহার করে ব্যবসা করলে লাভ হালাল, কিন্তু সুদের মূল টাকা সদকা করতে হবে।” -
শরহু মআনিল আসার (ইমাম তাহাবি, ৪/২৮৫):
“হারাম মালের বিনিময়ে প্রাপ্ত বস্তু ব্যবহার করা জায়েজ, তবে তার মূল্য সদকা করা আবশ্যক।”
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | হারাম টাকায় কেনা ডিভাইস দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং | আয় হালাল (শর্ত: কাজ হালাল) | | হারাম টাকায় কেনা ডিভাইস দিয়ে ব্যবসা | লাভ হালাল (শর্ত: পণ্য হালাল, পণ্য কেনার টাকা হালাল) | | হারাম টাকায় কেনা সফটওয়্যার/লাইসেন্স/বিজ্ঞাপন | লাভ হালাল কিন্তু ওই খরচের পরিমাণ সদকা ওয়াজিব | | হারাম টাকার দায় সধ করা | লাভ থেকে ধীরে ধীরে সদকা করা জায়েজ | | গুনাহ থেকে পবিত্রতা | সদকা ও তওবা করতেই হবে |
শেষ পরামর্শ:
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তৌফিক দিন এবং হারাম থেকে দূরে থাকার শক্তি দিন। আপনার প্রশ্নটি খুবই সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি আন্তরিকভাবে তওবা করেন এবং হারাম টাকার পরিমাণ সদকা করে দেন, ইনশাআল্লাহ আপনার উপার্জন পবিত্র হবে এবং দ্বীনি ও দুনিয়াবি বরকত লাভ করবেন।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।