স্বপ্নের ব্যাখ্যা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি ফজরের নামাজের পর বসে ছিলাম সাধারণত আমি ফজরের নামাজের পর হাটতে হাটতে যাই আম্মু সহ বা হালকা কিছু খেয়ে বই পড়তে বসি। কিন্তু আজকে কেন জানি অনেক খারাপ লাগতেছিল এরপর আর থাকতে না পেয়ে ৬:৩০ পর শুয়েই পড়ি এরপর স্বপ্ন দেখি আমার ছোটবোন প্রাইভেট থেকে আসলো আর সেদিনটা শুক্রবার ও ৩ তারিখ কিন্তু মাসটা জানিনা। এসে বললো আসার পথে একখানে কিসের দোকান বসছে। তো আমি বললাম চলো যাই আম্মু যাবেন বুঝলাম। কিন্তু বোন বলল না আজ নয়, ৫ তারিখ যাবো। এটা শুনে আমি একটু মন খারাপ করতেই একজন পুরুষ আসলেন যার বয়স আমার ঠিক মনে নেই কিন্তু তিনি আমলওয়ালা নেক বান্দা মনে হলো আমাকে উঠিয়ে এনে বললো তুমি কোথাও যাবেনা শুয়ে পড়(জোর দিয়ে বললেন আমিও ভয় পেয়েছি এমন করে শুয়ে পড়লাম) । উনি কাঁথা ঢেকে দিয়ে বললেন তুমি "ওয়ালা উহিব্বু" পড় ৩ বার করে করে ৮৭ হাজার বার। আমি বললাম আচ্ছা। এরপর একটু হাসলেন। আর মনে নেই আর আম্মু আমাকে ডাক দিয়ে উঠালেন তখন ৮ টা বাজে। আমি নাকি আমি যাব? আমি যাব? আমি যাব এটা বলতেছিলাম।
উনি যখন বললেন আমি তখন উনাকে ওটা আবার আমাকে বলতে বললাম কারণ আমি ফোনে একটা অ্যাপ ইউজ করি যেখানে দরকারি দোয়া ও তার অর্থ লিখে রাখি। তো ওটাও লিখে নিয়েছিলাম। আর অর্থ টাও জিজ্ঞেস করছিলাম ওনাকে উনি একটু হেসে আমাকে তা বলেও দিয়েছিলেন কিন্তু আমার একটুও মনে নেই এটার অর্থ উনি কি আর কেন পড়বো তা বলেছিলেন। এরপর আমি উঠেই অর্থ দেখতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেটাও ভুলে গেছিলাম পরে জোহরের সময় দেখলাম ওটার আর্থিক অর্থ : এবং আমি ভালোবাসিনা।
"এবং আমি ভালোবাসি না" এটা কি আল্লাহ আমাকে বাসেন না? নাকি অন্য কারও ইঙ্গিত? এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী হতে পারে?
আর কিছুদিন হলো আমার নামাজেও গাফিলতি আসছে। আগে আমি যতই ব্যস্ত হইনা কেন আউয়াল ওয়াক্তেই নামাজ পড়তাম। তাহাজ্জুদও মিস যেতনা। ইদানীং বসে,শুয়েই আছি কিন্তু আযান দিছে তাও ওভাবেই থাকি। নামাজ পড়ি, কিন্তু আগের মতো মন দিয়ে পড়া হচ্ছে না।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার স্বপ্ন ও ইবাদতে গাফিলতি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা আমি বুঝতে পেরেছি। আল্লাহর রহমত ও সাহায্য চেয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি।
প্রথমত: স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তার প্রকৃতি
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, স্বপ্ন তিন প্রকার:
১. রহমানি স্বপ্ন – যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা সতর্কবাণী।
২. শয়তানি স্বপ্ন – যা মানুষকে ভয় দেখানো, দুশ্চিন্তা বা হতাশ করার জন্য হয়।
৩. নফসানি স্বপ্ন – নিজের চিন্তা-ভাবনা, অভ্যাস বা দৈনন্দিন ঘটনার প্রতিফলন।
আপনার স্বপ্নে একজন নেক চেহারার ব্যক্তি এসে বলেছেন, "ওয়ালা উহিব্বু" (وَلَا أُحِبُ) পড়তে। কুরআনে এই বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে সূরা আল-আনআম (৬:৭৬)-এ, যেখানে হযরত ইবরাহিম (আ.) বলেছেন: "لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ" অর্থাৎ "যারা অস্তমিত হয়, আমি তাদের ভালোবাসি না।" এটি আল্লাহর প্রতি ইবরাহিম (আ.)-এর দৃঢ় ঈমান ও শিরক থেকে বিরত থাকার ঘোষণা।
আপনার স্বপ্নে বাক্যটির অর্থ "এবং আমি ভালোবাসি না"—এটি সম্ভবত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবাণী যে, আপনার জীবনে এমন কিছু (কাজ, অভ্যাস, সম্পর্ক বা দুনিয়াবী আসক্তি) আছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না এবং আপনাকে তা ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনাকে ভালোবাসা না পাওয়ার ঘোষণা নয়। বরং বিপরীতে, যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তাকেই তিনি অপ্রিয় কাজ থেকে বিরত করার জন্য সতর্ক করেন।
স্বপ্নে উল্লেখিত ৮৭,০০০ বার পড়ার বিষয়টি:
এটি কোনো কুরআন বা হাদিসে বর্ণিত নির্দিষ্ট আমল নয়। স্বপ্নকে শরীয়তের বিধান বা জরুরি আমলের ভিত্তি বানানো জায়েজ নেই। তাই আপনি এ সংখ্যা নিয়ে চিন্তা করবেন না। বরং স্বপ্নের সারমর্ম হলো: আল্লাহর অবাধ্যতা বা অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা—এটাই মূল শিক্ষা।
দ্বিতীয়ত: "এবং আমি ভালোবাসি না" অর্থ আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন না?—এ নিয়ে ভুল ধারণা
মোটেও না! এটি একটি মারাত্মক ভুল বুঝে বসে থাকা। আল্লাহর ভালোবাসা অপরিসীম। পবিত্র কুরআনে এসেছে:
"وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ" (সূরা আল-আরাফ: ১৫৬)
"আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে।"
আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবা কবুল করেন এবং পাপী বান্দাকেও ভালোবাসেন যখন সে ফিরে আসে। আপনার স্বপ্নে ‘وَلَا أُحِبُ’ শব্দটি আপনার নিজের কোনো ভুল কাজের প্রতি আল্লাহর অপছন্দনীয়তা বুঝিয়েছে, আপনার সত্তার প্রতি নয়। এখানে "আমি ভালোবাসি না"—অধিক সম্ভাবনা হলো আপনি কোনো জিনিসকে (যেমন: দুনিয়ার মোহ, নামাজে গাফিলতি, বা অন্য কোনো অভ্যাস) ভালোবাসছেন, যেটাকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই স্বপ্নটি একটি নসীহত (উপদেশ) হিসেবে এসেছে।
তৃতীয়ত: নামাজে গাফিলতি ও দুর্বলতা—এর প্রতিকার
আপনি লিখেছেন—কিছুদিন ধরে নামাজে আগের মতো মনোযোগ নেই, আউয়াল ওয়াক্তে নামাজ পড়া কমে গেছে, এমনকি তাহাজ্জুদও মিস হচ্ছে। এটি একটি সাধারণ আধ্যাত্মিক অবস্থা, যাকে ইলমে তাসাওউফে "ফাতরা" (অবসাদ) বলা হয়। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা বা নিজের নফসের অলসতার কারণে হয়। প্রতিকার নিম্নরূপ:
১. তওবা ও ইস্তেগফার: প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়ুন। মহানবী (সা.) নিজে প্রতিদিন ৭০-১০০ বার ইস্তেগফার করতেন।
২. নামাজের আগে দোয়া: নামাজ শুরুতে এই দোয়া পড়ুন:
"اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ"
"হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।"
৩. তাহাজ্জুদের নিয়ত: রাতে ঘুমানোর আগে তাহাজ্জুদের নিয়ত করুন। তাহলে ঘুম ভাঙার তাওফিক আল্লাহ দেবেন।
৪. কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝা: প্রতিদিন অন্তত ১ আয়াত অর্থসহ পড়ার অভ্যাস করুন। এটি নামাজে মনোযোগ বাড়াবে।
৫. আম্বিয়াদের গল্প পড়া: বিশেষ করে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর терпение (সবর) ও আল্লাহর ওপর ভরসার গল্প পড়ুন।
চতুর্থত: স্বপ্নের দ্বারা বিভ্রান্ত না হওয়া ও ওয়াসওয়াসা দূরীকরণ
শয়তান স্বপ্নের মাধ্যমেও মানুষকে ওয়াসওয়াসা দিতে পারে। যেহেতু স্বপ্নের অর্থ আপনার বুঝতে অসুবিধা হয়েছে এবং এটি আপনাকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, তাই এ নিয়ে বেশি ভাববেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"الشَّيْطَانُ يُأَتِّي أَحَدَكُمْ فِي مَنَامِهِ فَيُحَزِّنُهُ" (মুসলিম)
"শয়তান তোমাদের কারো কাছে স্বপ্নে এসে তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে।"
আপনি যদি স্বপ্নের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হন, তবে বুঝবেন এটি শয়তানের কাজ। আল্লাহ বলেন:
"لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
"আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।"
সংক্ষিপ্ত সমাধান ও আমল:
- স্বপ্নের নির্দিষ্ট বাক্য (“ওয়ালা উহিব্বু”) নিয়মিত পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং স্বপ্নের শিক্ষা হলো: আপনার জীবনে এমন কিছু আছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না—তা চিহ্নিত করুন এবং তা পরিত্যাগ করুন।
- নামাজের সময় আরাম কক্ষে দাঁড়ানোর আগে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজিম" বলে শয়তানের প্রভাব থেকে আশ্রয় চান।
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বেশি করে পড়ুন। এটি অন্তরের মরিচা দূর করে।
- আপনি যদি মনে করেন স্বপ্নটি সত্যিই কোনো কল্যাণের ইঙ্গিত, তবে ৮৭ সংখ্যাটি নিয়ে চিন্তা না করে বরং সাধারণ ইস্তেগফার (যেমন: সূরা নূহ-এর শেষের দোয়া) বেশি পড়ুন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাব:
- কুরআনুল কারিম (সূরা আল-আনআম: ৭৬, সূরা আল-আরাফ: ১৫৬, সূরা আয-যুমার: ৫৩)
- সহিহ মুসলিম (স্বপ্ন ও শয়তান প্রসঙ্গ)
- বাহিশতি জেওর (স্বপ্ন ও ইবাদতের গাফিলতি)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
আপনার জন্য দুআ করি।