জিনকে হাজির করে গরু মিষ্টি দেওয়ার হুকুম
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজন পরিচিত ভাইয়ের বিষয়ে পরামর্শ চাই।
অনেক দিন ধরে তার প্রচণ্ড মাথাব্যথার সমস্যা ছিল। একদিন রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে থাকার পর হঠাৎ চোখে প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হয়, চোখ ফুলে যায় এবং পানি পড়তে থাকে। তার আগে এলার্জির কোনো পরিচিত সমস্যা ছিল না। বিভিন্ন ডাক্তার দেখিয়েছেন, কিন্তু তেমন কোনো উপকার পাননি। পরে একজন হুজুরের কাছে যাওয়ার পর সমস্যাটি নাকি ভালো হয়ে যায়।
কিছুদিন ধরে নতুন আরেকটি সমস্যা শুরু হয়েছে। তাদের বাড়ির পাশের একটি পুকুরের কাছে গেলেই তার বুকব্যথা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে পেটেও ব্যথা হয়। বুক ও পেটে ব্যথার সাথে শ্বাসকষ্ট, দম বন্ধ হয়ে আসা এবং বমি হয়। শরীর কাঁপে, দুর্বল লাগে, শক্তি পায় না। এ সমস্যার জন্যও বিভিন্ন ডাক্তার দেখিয়েছেন, কিন্তু এখনো স্থায়ী সমাধান পাননি।
সম্প্রতি একজন কবিরাজের কাছে গেলে তিনি ৭ হাজার টাকা নিয়ে বলেন যে তাকে কালো জাদু করা হয়েছে এবং তা নাকি রক্তের সাথে মিশে গেছে। তিনি বলেন, পরদিন এসে সমাধান জানতে হবে।
পরে আরেকজনের কাছে গেলে তিনি ১০১ টাকা নিয়ে বলেন, প্রায় ৫ মাস আগে তাকে কালো জাদু করা হয়েছে। তার দাবি, একটি মাছের গলায় তাবিজ বেঁধে পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আর সেই মাছ মারা গেলে তিনিও মারা যাবেন। তিনি আরও বলেন, মাছটি খুঁজে বের করে তাবিজ খুলতে হবে। তাবিজ নষ্ট করা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে মাছ মারা যেতে পারে এবং তারও মৃত্যু হতে পারে।
এছাড়া তিনি দাবি করেন, যে জিনের মাধ্যমে কাজটি করা হয়েছে, সেই জিন এখন তাকে পছন্দ করে এবং জিনকে হাজির করতে হবে। জিন যা চাইবে তা দিতে হবে। এর জন্য ৭টি বড় গরু এবং ৪০ কেজি মিষ্টি দেওয়ার কথাও বলেন। যখন ওই ভাই জানান যে তার এত সামর্থ্য নেই, তখন ওই ব্যক্তি বলেন যে তার বাবার অনেক টাকা আছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নাকি সময় ফুরিয়ে যাবে।
আমার প্রশ্ন:
১. এসব দাবির কোনো শরয়ি ভিত্তি আছে কি? ২. কালো জাদু, মাছের গলায় তাবিজ, মাছ মারা গেলে মানুষের মৃত্যু—এসব কথার কোনো সত্যতা আছে কি? ৩. এ ধরনের কবিরাজ বা গণকদের কথাকে কীভাবে দেখা উচিত? ৪. এ অবস্থায় শরিয়তসম্মত করণীয় কী? রুকইয়াহ, আমল বা অন্য কোনো পরামর্শ থাকলে জানাবেন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
প্রথমেই বলে রাখি, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি ও প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলিম হিসেবে এই ধরনের বিষয়ে শরিয়তসম্মত দিকনির্দেশনা জানা জরুরি। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব পবিত্র কোরআন, সহিহ হাদিস এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১: এসব দাবির কোনো শরয়ি ভিত্তি আছে কি?
উত্তর: না, আপনার বর্ণিত দাবিগুলোর (মাছের গলায় তাবিজ, মাছ মারা গেলে মানুষের মৃত্যু, জিনকে হাজির করে গরু ও মিষ্টি দেওয়া) কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। ইসলামে কালো জাদু (সিহর) এর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, তবে এর প্রকৃতি, প্রভাব এবং চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারিত।
-
কালো জাদুর বাস্তবতা: পবিত্র কোরআনে সিহরের কথা এসেছে। সূরা আল-বাকারায় (২:১০২) উল্লেখ আছে যে, হযরত সুলায়মান (আ.)-এর সময়ে বাবিলে হারুত ও মারুত ফেরেশতার মাধ্যমে জাদু শিক্ষা দেওয়া হতো। তবে জাদু কেবল আল্লাহর অনুমতিক্রমেই কার্যকর হয় এবং তা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। (সূরা আল-ফালাক ও আন-নাস-এ জাদু থেকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ রয়েছে)।
-
হানাফি ফিকহের অবস্থান: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জাদুর বাস্তবতা আছে এবং তা মানুষের ক্ষতি করতে পারে। তবে জাদু করা কবিরা গুনাহ। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৬/৪০৬; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৪)।
-
আপনার বর্ণিত দাবিগুলো কেন ভিত্তিহীন:
- মাছের গলায় তাবিজ বেঁধে পানিতে ছেড়ে দেওয়া এবং মাছ মারা গেলে মানুষের মৃত্যু হওয়ার কোনো প্রমাণ কোরআন-হাদিসে নেই।
- জিনকে হাজির করে গরু ও মিষ্টি দেওয়ার দাবি শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কারণ জিন বা কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর মতো কিছু দাবি করা বা তাদের সন্তুষ্টির জন্য কিছু উৎসর্গ করা শিরক। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন: “আর জিনদেরকে তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে, অথচ তিনিই তাদের সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আনআম: ১০০)।
- কবিরাজের দাবিকৃত টাকা ও মালামাল দেওয়া জায়েজ নয়, বরং এটি প্রতারণা ও জালিয়াতি।
সারসংক্ষেপ: কালো জাদুর অস্তিত্ব আছে, কিন্তু আপনার বর্ণিত কবিরাজের দাবি ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কার, ভিত্তিহীন এবং শরিয়তবিরোধী।
প্রশ্ন ২: কালো জাদু, মাছের গলায় তাবিজ, মাছ মারা গেলে মানুষের মৃত্যু—এসব কথার কোনো সত্যতা আছে কি?
উত্তর: না, এসব কথার কোনো সত্যতা নেই।
- মাছ মারা গেলে মানুষের মৃত্যু: এটি ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারো মৃত্যু আল্লাহর ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: “কোনো প্রাণী আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মরতে পারে না।” (সূরা আলে ইমরান: ৩:১৪৫)। একটি মাছের মৃত্যু মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে—এটি কুসংস্কার ও তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) এর পরিপন্থী।
- জিনকে হাজির করা ও গরু-মিষ্টি দেওয়া: কোনো জিন কখনো এই ধরনের দাবি করে না বা এই ধরনের বস্তু চায় না। এটি কবিরাজদের একটি সাধারণ প্রতারণার কৌশল। তারা মানুষের ভয় ও অর্থের লোভকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায় করে।
সতর্কতা: এই ধরনের কবিরাজরা সাধারণত মানুষের ভয় ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে। তাদের কথায় কান না দেওয়া এবং তাদের কাছে না যাওয়াই উত্তম।
প্রশ্ন ৩: এ ধরনের কবিরাজ বা গণকদের কথাকে কীভাবে দেখা উচিত?
উত্তর: এ ধরনের কবিরাজ বা গণক (কাহিন) – তাদের কথায় বিশ্বাস করা এবং তাদের কাছে যাওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- হাদিসের সতর্কবাণী: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে যায় এবং তার কথায় বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করল।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৯০৪; মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯৫৩৯)।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: এই ধরনের কাজ করা কবিরা গুনাহ এবং এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হারাম। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৬/৪০৬)।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন: “কবিরাজ ও জাদু-টোনার ব্যবসা করা সম্পূর্ণ হারাম। এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।” (মা’আরিফুল কুরআন, ১/২৯০)।
তাই, এই ধরনের কবিরাজদের কথা ও কাজকে সম্পূর্ণরূপে প্রতারণা ও শিরক হিসেবে দেখতে হবে। তাদের কাছে যাওয়া, তাদের কথা বিশ্বাস করা এবং তাদের টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
প্রশ্ন ৪: এ অবস্থায় শরিয়তসম্মত করণীয় কী? রুকইয়াহ, আমল বা অন্য কোনো পরামর্শ থাকলে জানাবেন।
উত্তর: শরিয়তসম্মত করণীয় নিচে উল্লেখ করা হলো:
ক. তাওবা ও ইস্তেগফার:
প্রথমেই আপনাকে এবং ওই ভাইকে কবিরাজের কাছে যাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। এটি একটি বড় গুনাহ। নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করেন।
খ. চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া:
ডাক্তারি চিকিৎসা বন্ধ না করে চলতে হবে। রোগের চিকিৎসা করা ইসলামে উৎসাহিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “প্রতিটি রোগের জন্য চিকিৎসা আছে; যে চিকিৎসা খুঁজে পাবে, সে আল্লাহর অনুমতিক্রমে আরোগ্য লাভ করবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০৪)। ওই ভাইয়ের বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও পেটের সমস্যার জন্য ভালো ডাক্তার দেখানো চালিয়ে যেতে হবে। এটি শারীরিক রোগ হতে পারে, যা জাদুর কারণে নয়।
গ. রুকইয়াহ (কোরআনিক চিকিৎসা):
রুকইয়াহ করার জন্য নির্ভরযোগ্য ও আলেম ব্যক্তির সাহায্য নেওয়া ভালো, তবে নিজেও করতে পারেন। নিচের আমলগুলো নিয়মিত করবেন:
- আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারা: ২৫৫): প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর ৩ বার পড়ে শরীরে ফুঁ দেবেন। শোয়ার আগে পড়ে ফুঁ দেবেন। এটি জাদু, জিন ও শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
- সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার করে পড়ে শরীরে ফুঁ দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এই সূরাগুলো তিনবার পড়তেন এবং বলেন: “এগুলো আমার জন্য সবকিছু থেকে যথেষ্ট।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮২)।
- সূরা আল-ফাতিহা: এটি পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করানো বা গোসল করানো খুবই কার্যকর। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদেরকে সূরা ফাতিহা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করার অনুমতি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৪১)।
- অন্যান্য আয়াত: সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬), সূরা ইউনুসের ৮১ ও ৮২ নম্বর আয়াত, সূরা ত্বা-হার ৬৯ নম্বর আয়াত ইত্যাদি পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করানো যায়। (বিস্তারিত জানতে ‘হিসনুল মুসলিম’ বই দেখুন)।
- দুআ: নিয়মিত দুআ করতে থাকুন। বিশেষ করে এই দুআটি পড়ুন:
- بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামায়ি ওয়াহুয়াস সামিউল আলিম) অর্থ: “আল্লাহর নামে (শুরু করছি) যার নামের সাথে আসমান ও জমিনে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার করে পড়বেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮৮)।
ঘ. পানি ও তেলের উপর পড়ে ব্যবহার:
পানি বা অলিভ অয়েলের উপর উপরোক্ত আয়াত ও দুআগুলো পড়ে ফুঁ দিয়ে গোসল করা বা শরীরে মাখা যায়। এটি জাদুর প্রভাব দূর করতে সহায়ক।
ঙ. দান-সাদকা করা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “দান-সাদকা রোগ নিরাময় করে এবং বিপদ দূর করে।” (তিরমিযি, হাদিস: ৩৫১৯)। তাই নিয়মিত দান-সাদকা করলে আল্লাহর রহমত আসে এবং বিপদ দূর হয়।
চ. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল:
ধৈর্য ধরতে হবে এবং সবকিছু আল্লাহর কাছ থেকে জানতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন: “আর ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে দেওয়া হবে।” (সূরা আয-যুমার: ১০)।
মনে রাখবেন: ওই কবিরাজদের ভয় পাবেন না। তাদের বলা কথাগুলো (মাছ মারা যাওয়া, সময় ফুরিয়ে যাওয়া) সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা আপনার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতে চায়। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন: “নিশ্চয়ই শয়তান তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। তাই তোমরা তাদের ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা আলে ইমরান: ৩:১৭৫)।
উপসংহার
আপনার ভাইয়ের সমস্যার জন্য নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
- কবিরাজের কাছে যাওয়া বন্ধ করুন এবং তাওবা করুন।
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন এবং সকাল-সন্ধ্যার দুআ ও জিকির করুন।
- উপরোক্ত কোরআনিক রুকইয়াহ নিয়মিত করুন।
- ডাক্তারি চিকিৎসা চালিয়ে যান।
- নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমের সাহায্য নিন, যিনি কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী চিকিৎসা করেন।
আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞানী ও আরোগ্যদাতা। তিনি যেন আমাদের সবাইকে কুসংস্কার ও শিরক থেকে রক্ষা করেন এবং উত্তম পথ দেখান। আমিন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান