স্বামীর শারীরিক সমস্যা, সন্তান জন্মদানে অক্ষম হলে করণীয় কি
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার বাবা মারা গেছে ছোট বেলায়।আমরা দুই বোন,আমি বড়।আমাদের কোনো ভাই নেই।আমার ছোট বোনটা বিবাহযোগ্য হয়ে গিয়েছে।তাঁর বিবাহের জন্য চেষ্টা চলছে।আমাদের পরিবারে কোনো পুরুষ মানুষ নেই।আমার মায়ের বয়স হয়েছে।তিনি কিছুটা অসুস্হ।আমাকে নিয়ে অনেক চিন্তা করেন,অসুস্হ হয়ে যাচ্ছেন।আমার মা নাতি-নাতনী চায়,তাদের সাথে সময় কাটাতে চায়। আমাকে তিনি ২য় বার বিবাহ করার পরামর্শ দিয়েছেন।মুহতারাম আমার এই অবস্হায় করণীয় কি? আমি কয়েক বছর যাবৎ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।আমি নিজেকে মাঝেমধ্যে ধরে রাখতে পারি না।আমাকে এই বিষয় টা অনেক কষ্ট দেয়।আমার সংসারে কাজ কর্ম করতে ভালো লাগে না।আমার কিছুই ভালো লাগে না।আমি এই পরীক্ষার ভার বহন করতে পারছি না মুহতারাম।কারো সাথে এই সব বিষয়ে কথা শেয়ার করতে পারি না।অন্যের বাচ্চা দেখলে এখন আমার কষ্ট হয়,অবশ্যই আমি তাদের জন্য দুআ করি।আমার স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও আমার কষ্ট হয়।আমার এই অবস্হায় কি করণীয় মুহতারাম? সমাজে একজন পুরুষ মানুষের সমস্যা থাকলেও আঙুল তুলে একজন মেয়ের মানুষের দিকে সবাই কথা বলে।আমাকে পরামর্শ দিন মুহতারাম।আমার করণীয় কি?আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তা'আলা আপনাকে উত্তম জাযা দিন আমীন
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُم السَّلَام وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রথমেই বলব, আপনার যে মানসিক কষ্ট ও পরীক্ষা—তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি যাকে চান পরীক্ষা করেন, আর ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। আল্লাহ বলেন:
"وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ"
(সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)
অর্থ: "আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, প্রাণ ও ফলমূলের ক্ষতি দ্বারা। আর терпеливымиদের সুসংবাদ দিন।"
আপনার স্বামীর এজোস্পার্মিয়া (শুক্রাণু না থাকা) একটি চিকিৎসাগত সমস্যা, যার কারণে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তান হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ইসলামে সন্তানহীনতা বিবাহ বাতিলের কারণ নয়, যদি স্বামী স্ত্রীর সাথে সহবাসে সক্ষম হন এবং দাম্পত্য জীবন উপভোগ করতে পারেন। তবে স্ত্রীর সন্তানের আকাঙ্ক্ষা একটি বৈধ চাওয়া।
এখন আপনার করণীয় সম্পর্কে কয়েকটি মাসআলা উল্লেখ করছি, সালাফ ও বড় বড় আলেমদের ফতোয়া অনুসারে:
১. স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি
ইসলামে স্ত্রী চাইলে স্বামীর শারীরিক ত্রুটি (যেমন: পুরুষত্বহীনতা বা সন্তান উৎপাদনে অক্ষমতা) কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। কিন্তু এটি জরুরি নয়; বরং স্ত্রী যদি সন্তান ছাড়াই জীবনযাপনে রাজি থাকেন, তবে তা উত্তম।
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সহবাসে অক্ষম হয় (অর্থাৎ পুরুষত্বহীন), তাহলে স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইতে পারে। কিন্তু এখানে আপনার স্বামী সহবাসে সক্ষম, শুধু শুক্রাণু নেই—এটি একটি ভিন্ন বিষয়। অনেক সালাফি আলেমের মত: স্ত্রী যদি সন্তান না হওয়ার কারণে কষ্ট পান, তবে তিনি খুলা (মোহর ও কিছু অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে) বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। তবে এটি তার ইচ্ছাধীন, বাধ্যতামূলক নয়।
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: স্বামী যদি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়, তাহলে স্ত্রী কি বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারে? তিনি বলেন: "হ্যাঁ, স্ত্রী যদি চায় যে তার সন্তান হোক, আর স্বামী অক্ষম, তাহলে সে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারে। তবে যদি সে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, তবে সেটা উত্তম।" (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনু বায, ২১/৪৩৫)
২. সন্তান লাভের হালাল পদ্ধতি
আপনার প্রশ্নে বলেছেন: "হালাল পদ্ধতিতে আমাদের সন্তান হওয়া কখনোই সম্ভব হবে না।" এটি সঠিক। কারণ স্বামীর শুক্রাণু না থাকায় নিষিক্তকরণ সম্ভব নয়। আর পরপুরুষের শুক্রাণু ব্যবহার করা (ডোনার স্পার্ম) হারাম। একইভাবে ভ্রূণ দান করাও হারাম। তাই চিকিৎসার মাধ্যমে সন্তান লাভের কোনো হালাল উপায় নেই।
তবে আপনি সন্তান লাভের জন্য অন্য পন্থা অবলম্বন করতে পারেন:
-
দত্তক নেওয়া (ফস্টার কেয়ার): ইসলামে দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে সন্তানের পিতৃত্ব পরিবর্তন হয় না, তবে একজন অনাথ শিশুকে লালন-পালন করা এবং তার জন্য দুআ করা বৈধ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "আমি এবং যে ইয়াতিমের দায়িত্ব নেয়, জান্নাতে এরূপ (দুই আঙ্গুল একসাথে দেখিয়ে) থাকব।" (বুখারী: ৫৬৫৯)
-
আল্লাহর কাছে দুআ করুন: নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য আল্লাহ অলৌকিকভাবেও সন্তান দিতে পারেন। যেমন হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর ঘটনা, যিনি বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভ করেছিলেন। আপনি ও আপনার স্বামী আল্লাহর কাছে ক্রন্দন করে সন্তানের জন্য দুআ করতে পারেন।
৩. আপনার মানসিক অবস্থা ও সমাজের কথা
আপনি লিখেছেন, সমাজে পুরুষের সমস্যা থাকলেও মেয়ের দিকে আঙুল তোলা হয়। এটা একটি অন্যায় ও জাহেলি আচরণ। আপনাকে এসব কথা কানে না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। আল্লাহই বিচারক। আপনার ধৈর্য ও ঈমান এখানে পরীক্ষিত হচ্ছে।
শাইখ সালেহ আল-ফওজান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "বিবাহের উদ্দেশ্য শুধু সন্তান নয়, বরং শান্তি, ভালোবাসা ও সংসার। সন্তান আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তাই সন্তান না হলেই বিবাহ ভেঙে দেওয়া জরুরি নয়।" (আল-মুনতাকা, ৫/৩২২)
৪. আপনার মায়ের পরামর্শ সম্পর্কে
আপনার মা আপনাকে দ্বিতীয় বিবাহের পরামর্শ দিয়েছেন। এটি জায়েয, তবে শর্ত হলো প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করা বা তার অনুমতি নেওয়া। একজন নারীর একসঙ্গে দুই স্বামী থাকতে পারে না। তাই আপনি যদি দ্বিতীয় বিবাহ করতে চান, তাহলে আপনার বর্তমান স্বামীকে তালাক দিয়ে বা খুলা দিয়ে বিচ্ছেদ হতে হবে। তবে এটা বাধ্যতামূলক নয়। আপনি যদি প্রথম স্বামীর সাথেই থাকতে চান, তাহলে সেটাই উত্তম, বিশেষ করে যেহেতু তিনি সম্ভবত আপনার প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ।
৫. চূড়ান্ত পরামর্শ
-
প্রথমে ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। আপনার মানসিক কষ্টের জন্য নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করুন, নামায পড়ুন এবং বেশি বেশি দুআ করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে চায়, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন।" (বুখারী: ১৪৬৯)
-
স্বামীর সাথে খোলামেলা কথা বলুন। তাকে জানান আপনার চাওয়া ও কষ্ট। একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিন—হয় সন্তানহীন জীবন মেনে নেওয়া, অথবা বিচ্ছেদ। যদি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সম্মানের সাথে ও ভালোভাবে আলাদা হন।
-
দুটি পথ বিবেচনা করুন:
- পথ ১: স্বামীর সাথে থাকুন, সন্তানহীনতা মেনে নিন, দত্তক সন্তান গ্রহণ করুন এবং আল্লাহর কাছে দুআ করুন। এটি অধিক সওয়াবের কাজ।
- পথ ২: যদি সন্তানের আকাঙ্ক্ষা আপনার জন্য অসহনীয় হয়, তাহলে আপনার স্বামীকে জানিয়ে খুলার মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করুন, তারপর দ্বিতীয় বিবাহ করুন। তবে সতর্ক থাকুন—দ্বিতীয় স্বামীও নিঃসন্তান হতে পারেন। ভাগ্য আল্লাহর হাতে।
-
পেশাদার সাহায্য নিন: আপনার মানসিক অবস্থা খারাপ হলে কোনো ইসলামিক কাউন্সেলরের সাথে পরামর্শ করুন। নিজেকে একা মনে করবেন না।
শেষ কথা: আপনি একা নন। বহু নারী এ ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। ইতিহাসে নবী-পত্নী আয়েশা (রা.) সন্তানহীন ছিলেন, অথচ তিনি উম্মুল মুমিনীন হয়েছেন। সন্তানহীনতা জীবনের শেষ নয়; বরং আল্লাহ অন্য ক্ষেত্রে আপনার জন্য কল্যাণ রেখেছেন। আপনার কর্তব্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া।
اللَّهُمَّ ارْزُقْهَا الصَّبْرَ وَالْفَرَجَ وَاجْعَلْ لَهَا مِن كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِن كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا
(হে আল্লাহ, তাকে ধৈর্য ও মুক্তি দান করুন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করুন এবং প্রতিটি সংকীর্ণতা থেকে উত্তরণের পথ বের করে দিন।)
আমীন।