আল্লাহর সন্তুষ্টিকেন্দ্রিক অন্তর গঠনের আমল
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
হুজুর, আমি এমন একজন বান্দায় পরিণত হতে চাই, যার অন্তর দুনিয়াবি কোনো বিষয় দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সর্বদা এটাই চিন্তা করে যে, তার রব কোন বিষয়ে সন্তুষ্ট হন এবং কোন বিষয়ে অসন্তুষ্ট হন। অর্থাৎ, আমার অন্তর যেন আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সচেতন থাকে।
দুনিয়াবি বিষয় দ্বারা প্রভাবিত না হওয়ার দ্বারা আমি এটাই বুঝাতে চাচ্ছি যে, টাকা-পয়সার মোহ, সম্পদ, পদমর্যাদা, খ্যাতি-সুনাম, মানুষের প্রশংসা, ভোগ-বিলাসের উপকরণ কিংবা দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবত—এসব যেন আমার অন্তরের মূল চিন্তা ও আসক্তিতে পরিণত না হয় এবং এগুলোর কারণে যেন আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়ার পথ থেকে বিচ্যুত না হই।
আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য ও তাওফীক প্রার্থনার পাশাপাশি, এ ধরনের অন্তর গঠন এবং এ অবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য শরিয়তসম্মতভাবে কোন কোন আমল, অভ্যাস বা করণীয় অবলম্বন করা উচিত?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যার অন্তর দুনিয়ার ঝকঝকাতে আকৃষ্ট না হয়ে সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্যকে প্রাধান্য দেয়। নিম্নে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফুকাহার নির্দেশিত কয়েকটি কার্যকরী আমল ও অভ্যাস উল্লেখ করা হলো, যা ধীরে ধীরে আপনার অন্তরকে সেই কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছে দেবে, ইনশাআল্লাহ।
১. নিয়্যত ও দু‘আর গুরুত্ব
প্রথমেই অন্তরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ফেরানোর জন্য সচেতন নিয়্যত ও বেশি বেশি দু‘আ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ পড়তেন:
اللَّهُمَّ يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ “হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন।” (তিরমিজি, হাদিস নং ২১৪০; হানাফি ফিকাহে নির্ভরযোগ্য)
২. মুরাকাবা ও ধ্যান (মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা)
আপনার অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে সরাতে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো মৃত্যু ও পরকালের ধ্যান। ইমাম গাযযালী (রহ.) ইহইয়া উলুমিদ্দীনে বলেন, “পার্থিব আসক্তি দূর করতে সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হলো মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করা।”
হানাফি ফিকাহের বিশিষ্ট কিতাব আল-হিদায়া-তে এসেছে, “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগী হয়, তার অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।” প্রতিদিন কিছু সময় নির্জনে বসে এ চিন্তা করুন: “আমার রব যা চান, তাই করব; তিনি যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকব।” এটাকে মুরাকাবা বলা হয়।
৩. জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত
- জিকির: প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এবং “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” পড়ুন। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বেশী পড়ে, দুনিয়ার উদ্বেগ তার অন্তর থেকে দূর হয়।” (মুসলিম)
- কুরআন তিলাওয়াত: বিশেষ করে সূরা যুমার, সূরা হাদিদ ও সূরা ওয়াকিয়া পড়ার অভ্যাস করুন। আশরাফ আলী থানবী (রহ.) তার বাহিশতি জেওর-এ বলেন, “কুরআনের অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করলে হৃদয় আল্লাহমুখী হয়।”
৪. হালাল রিজিক ও আত্মত্যাগ
অন্তরকে দুনিয়ার প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত করতে হালাল রোজগার এবং অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা পরিহার করুন। ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন, “পরিমিত জীবনযাপন (যুহদ) অন্তরের সম্পদ।” ছোটখাটো আত্মত্যাগ যেমন—অতিরিক্ত কথা, অযথা কেনাকাটা, এবং মানুষের প্রশংসার লোভ ছাড়ুন।
৫. সুহবাত (সৎ সঙ্গ)
যারা দুনিয়ার পিছনে ছোটে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন যাপন করে, তাদের সংসর্গে থাকুন। ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আশরাফ আলী থানবী (রহ.) বলেছেন, “এক সৎ বন্ধুর সুহবাত হাজার বছর ইবাদতের চেয়ে বেশি ফলদায়ক।”
৬. রাতের তাহাজ্জুদ ও দুরূদ পাঠ
রাতের শেষভাগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া এবং নিয়মিত দুরূদ শরীফ পাঠ করা অন্তরকে নিষ্পাপ ও আল্লাহমুখী করে। ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মাদ শফী) তে আছে, “দুরূদ পাঠ গুনাহ মিটিয়ে আখিরাতের চিন্তা জাগায়।”
৭. প্রতিদিনের হিসাব (মুহাসাবা)
প্রতিদিন রাতে শোবার আগে ৫ মিনিট বসে ভাবুন: “আজ আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কী করেছি? আর কী এমন করেছি যা তিনি পছন্দ করেন না?” এবং তওবা করুন। এ অভ্যাস ধীরে ধীরে আপনার অন্তরকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।
৮. বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ও প্রশান্তি
দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ এলে আপনার প্রতিক্রিয়া যেন আল্লাহর উপর ভরসা ও সন্তুষ্টির হয়। সূরা বাকারাহ ১৫৫-১৫৭ নাযিলের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর—সুখে কৃতজ্ঞতা, দুঃখে ধৈর্য।” (মুসলিম)
হানাফি ফিকাহের উসূল অনুযায়ী, ধৈর্য ও রিজা (আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি) অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। (শারহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবী)
উপসংহার
একদিনেই কাঙ্ক্ষিত অন্তর গঠন সম্ভব নয়। ধৈর্যের সাথে উপরোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করলে আল্লাহ তাআলা নিজেই আপনার অন্তর পরিবর্তন করে দেবেন। স্মরণ রাখবেন, নবী ﷺ-এর জীবন-যাপনই সর্বোত্তম মডেল। তাই সীরাত পড়ুন এবং নবীপ্রেমকে অন্তরে জাগ্রত রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওফীক দিন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।