আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করে ভঙ্গ করলে কি ক্ষমা হবে?

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 1397
Questioner: SEO expert
Question Asked: 09 Jun 2026, 09:02 AM
Reviewed & Published: 09 Jun 2026, 10:37 AM
Views: 46
Tokens: 5,018
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, আল্লাহ যদি আমাকে সমস্ত বিপদ দূর করে দেন, সহজ ও সুন্দর করে দেন , তাহলে আমি আজীবন গুনাহমুক্ত থাকার চেষ্টা করবো | আল্লাহ তার প্রতিজ্ঞা রেখেছেন | কিন্তু আমি পারি নি | দীর্ঘ ৩ বছর যাবৎ বেনামাজি | এখন আল্লাহ কি আমাকে মাফ করবেন যদি ইতোমধ্যে তিনি আমার জন্য দুনিয়াবী শাস্তির ফয়সালা করে থাকেন ?

Answer

প্রশ্নের উত্তর

আপনার প্রশ্নটি মূলত তিনটি বিষয়কে ঘিরে: (১) আল্লাহর কাছে করা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা, (২) দীর্ঘ তিন বছর নামাজ না পড়া (বেনামাজি থাকা), এবং (৩) আল্লাহ কি এখনও মাফ করবেন? নিচে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এবং সালাফি/আহলে হাদিস ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ আলিমদের মতামতের ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করা হলো।


১. আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা

আপনি আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি যদি আপনার বিপদ দূর করেন, তাহলে আপনি আজীবন গুনাহমুক্ত থাকার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ তাঁর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করেছেন, কিন্তু আপনি পারেননি। এটি একটি চুক্তি বা ওয়াদা ভঙ্গ, যা নিঃসন্দেহে একটি অপরাধ। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু এবং ক্ষমাশীল। পবিত্র কুরআনে তিনি বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)

এ আয়াতটি সকল গুনাহের জন্যই প্রযোজ্য, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাওবা করা হয়। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন, এই আয়াতটি তাওবার গুরুত্ব এবং আল্লাহর রহমতের বিশালতা বোঝায়। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি আন্তরিক তাওবা করে, আল্লাহ তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেন। (মজমুউল ফতোয়া, ১০/২৫৬)


২. দীর্ঘ তিন বছর বেনামাজি থাকা

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং এটি ফরজ। তিন বছর নামাজ না পড়া একটি অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ। এ বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ "নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮২)

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) এবং ইমাম ইবনু কাইয়িম (রহ.) সহ অধিকাংশ সালাফি আলিমের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগকারী ব্যক্তি কুফরি পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে, যদি সে তা ফরজ জেনেও ত্যাগ করে। তবে দুর্বলতার কারণে অথবা অলসতার কারণে নামাজ ত্যাগ করলে তা কুফর নয়, কিন্তু এটি বড় গুনাহ। (শারহুল মুমতি', ২/২৫; মজমুউল ফতোয়া, ২২/৪৬)

তবে আপনি যদি এখন আন্তরিকভাবে তাওবা করেন এবং নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করেন, তাহলে আল্লাহ তা কবুল করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ "গুনাহ থেকে তাওবাকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহ নেই।" (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নং ৪২৫০; সহিহ আল-জামি', হাদিস নং ৩০০৮)

শাইখ আল-আলবানী (রহ.) এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। তাই তাওবার সঙ্গে সঙ্গে অতীতের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।


৩. মাফ করা ও তাওবা করা

আল্লাহর দয়া তাঁর ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পায়। হাদিসে কুদসিতে এসেছে:

يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَىٰ مَا كَانَ مِنْكَ وَلَا أُبَالِي "হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমার গুনাহ ক্ষমা করব, তাতে কিছু আসে যায় না।" (সুনান তিরমিযি, হাদিস নং ৩৫৪০; সহিহুল জামি', হাদিস নং ৪৩৩৭)

আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তির জন্য দুনিয়ায় শাস্তি ঠিক করে থাকেন, তাহলে তা সাধারণত তার গুনাহের কারণে হয়। কিন্তু আন্তরিক তাওবা এবং নেক আমল সেই শাস্তি দূর করতে পারে। যেমন: আল্লাহ তাআলা ইউনুস (আ.)-এর তাওবা কবুল করে তাঁকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলেন। ইবনু কাইয়িম (রহ.) বলেন, "তাওবা শাস্তিকে প্রতিহত করে এবং তাকে পূর্ণরূপে রহমতে পরিণত করে।" (মাদারিজুস সালিকিন, ১/২৫১)

আর বর্তমান শাস্তি বাস্তবায়িত না হলেও ভয় না করে বরং একে ক্ষমার মাধ্যম মনে করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِذَا قَضَى اللهُ لِعَبْدٍ أَنْ يَمُوتَ بِأَرْضٍ جَعَلَ لَهُ إِلَيْهَا حَاجَةً "যখন আল্লাহ কোনো বান্দার জন্য কোনো জায়গায় মৃত্যু নির্ধারণ করেন, তখন তিনি তার জন্য সে জায়গায় প্রয়োজন সৃষ্টি করেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২২২২) — এটি বোঝায় যে, আল্লাহর ফয়সালার পেছনে হিকমত রয়েছে।

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: "যে ব্যক্তি গুনাহ করে এবং পরে আন্তরিক তাওবা করে, তার জন্য আল্লাহর রহমতের দ্বার খোলা। দুনিয়ার শাস্তি থেকে ভয় না করে বরং তাওবার মাধ্যমেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।" (আল-মুনতাকা, ২/২৮৭)


সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ

  • তাওবা করুন: এখনই আন্তরিক তাওবা করুন। তাওবার শর্ত হলো: (১) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, (২) লজ্জিত হওয়া, (৩) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা, এবং (৪) বান্দার হক থাকলে তা আদায় করা। আপনার বেলায় বান্দার হক না থাকায় কেবল আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন।

  • নামাজ শুরু করুন: এখনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়তে শুরু করুন।

  • নিরাশ হবেন না: আল্লাহর রহমত অসীম। তিনি বলেন: "আমার রহমত সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে।" (সুরা আল-আ'রাফ, আয়াত ১৫৬) তাই দুনিয়ার কোনো শাস্তি নিয়ে ভয় না করে বরং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।

  • ইসলামের বিধান গ্রহণ করুন: আপনার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কারণে বিশেষ কোনো কাফফারা প্রয়োজন নেই। তবে সাধারণ তাওবাই যথেষ্ট। তবে মনে রাখবেন, ইসলামে কখনোই নির্দিষ্ট গুনাহের জন্য দুনিয়াবী শাস্তির ফয়সালা করে দেওয়া হয় না; বরং তাওবা মুমিনের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত।

উপসংহার: হ্যাঁ, আল্লাহ আপনাকে মাফ করবেন, ইনশাআলাহ, যদি আপনি আন্তরিক তাওবা করেন এবং এখন থেকে নামাজে স্থির থাকেন। দুনিয়াবী শাস্তি নিয়ে চিন্তা না করে বরং আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার ওপর ভরসা করুন। "আল্লাহ তাআলা পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।"


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.