ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এগুলোতে সেভিংস একাউন্ট খোলা এবং টাকা রাখা ও জমানো কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর প্রদানে হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নরূপ বিশ্লেষণ ও ফতোয়া পেশ করা হলো—
সারসংক্ষেপ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ও আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার দাবি করে। তাদের সেভিংস অ্যাকাউন্ট সাধারণত মুদারাবা নীতির ভিত্তিতে চালু থাকে। যদি ব্যাংকটি প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, অর্থ জমা দেওয়া ও তোলার ক্ষেত্রে কোনো সুদের প্রতিশ্রুতি না থাকে, এবং লভ্যাংশ প্রকৃত লাভের ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়—তবে তা জায়েয বলে গণ্য হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ইসলামী ব্যাংক কিছু শরিয়াহগত ত্রুটির (যেমন: কমোডিটি মুরাবাহার অবৈধ ব্যবহার, লাভের হার বেঞ্চমার্কের সাথে যুক্ত থাকা) কারণে পূর্ণাঙ্গভাবে শরিয়াহ সম্মত নয়। তাই অ্যাকাউন্ট খোলার আগে ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদিত পণ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং কোনো প্রকার সুদযুক্ত লেনদেন থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ
১. ইসলামী ব্যাংকের মূলনীতি ও মুদারাবা চুক্তি
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা হচ্ছে মুদারাবা ও মুশারাকা ভিত্তিক। এখানে ব্যাংক (মুদারিব) এবং আমানতকারী (রাব্বুল মাল) এর মধ্যে চুক্তি হয়। আমানতকারী পুঁজি সরবরাহ করে, ব্যাংক তা বিনিয়োগ করে এবং লাভ হলে পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়। লোকসান হলে শুধু আমানতকারী তা বহন করে—যদি না ব্যাংকের গাফিলতি প্রমাণিত হয়।
এই পদ্ধতি সহিহ মুদারাবা নামে পরিচিত এবং এটি হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহে বৈধ গণ্য হয়েছে। যেমন রদ্দুল মুহতার (৪/২৫৪) ও ফাতাওয়া আলমগীরি (২/৩০৬)-এ উল্লেখ আছে—মুদারাবায় লাভের হার নির্ধারিত না রেখে শতাংশে ভাগ করে নেওয়া জায়েয, তবে পুঁজির সুরক্ষা বা নির্দিষ্ট মুনাফার গ্যারান্টি দেওয়া জায়েয নয়।
২. ইসলামী ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের প্রকৃতি
প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টগুলো মুদারাবা ভিত্তিক বলে দাবি করা হয়। অর্থাৎ জমা টাকা (পুঁজি) দিয়ে ব্যাংক বিনিয়োগ করে, এবং নির্ধারিত সময় (যেমন মাসিক/ত্রৈমাসিক) পর লাভ (প্রফিট) হিস্যা প্রদান করে। যদি এই লাভ প্রকৃত বিনিয়োগের লাভের ভিত্তিতে হয় এবং কোনো সুদের (রিবা) সম্পর্ক না থাকে, তাহলে তা জায়েয।
কিন্তু বাস্তবে যেসব সমস্যা দেখা যায়:
- অনেক ব্যাংক লাভের হার শূন্য বা বেশি দেখানোর জন্য নগদ অর্থের পরিবর্তে কমোডিটি মুরাবাহার (টাওয়াররুক) ব্যবহার করে, যা অনেক ফকিহের মতে মাকরূহ বা নাজায়েয।
- তারা প্রফিট রেট সুদের হারের (যেমন LIBOR বা ব্যাংক রেট) সাথে সংযুক্ত রাখে, যা শরিয়াহসম্মত নয়। ইমাম আবু হানিফার মতে, মুদারাবায় লাভের ভিত্তি বাস্তব লাভ হওয়া জরুরি, সুদের হারের সাথে সম্পর্কিত করা জায়েয নয়। (আল-মাবসুত ১২/১১১)
- আবার কোনো কোনো ব্যাংক পুঁজি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, যা মুদারাবা চুক্তির পরিপন্থী।
৩. বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকসমূহ (ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক) বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি ও নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চলে। তবে বাস্তবে এদের অনেক লেনদেন (বিশেষ করে ট্রেজারি বিল, বন্ড, প্রাইমারি ডিলারশিপ) প্রচলিত সুদী ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ বিষয়ে আধুনিক ফকিহগণ মতভেদ করেছেন।
হানাফি পণ্ডিতদের মত:
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তার ‘আন-নিযামুল ইসলামি লিল বুনুক’ গ্রন্থে বলেন: যে ইসলামী ব্যাংকটি সম্পূর্ণ শরিয়াহ বোর্ডের নজরদারিতে থাকে এবং তার সকল প্রোডাক্ট শরিয়াহ কমিটি অনুমোদিত হয়, তাহলে তার সাথে লেনদেন জায়েয। কিন্তু যে ব্যাংকে শরিয়াহ লঙ্ঘনের ঘটনা জানা যায়, সেখানে সতর্ক থাকা আবশ্যক। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩০৫)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ (৪/২৫০)-এ বলেন: ব্যাংক যদি মুদারাবা বা মুরাবাহার মতো বৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করে, তাহলে সেখানে অর্থ জমা দেওয়া জায়েয; কিন্তু সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো পদ্ধতি থাকলে শ্রেণীবদ্ধভাবে জায়েয নয়।
- ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (৪/২২৪)-এ বলেন: প্রতিটি লেনদেনের স্বতন্ত্র বিচার করতে হবে; শুধুমাত্র মুখের দাবির ভিত্তিতে তা বৈধ ধরা যাবে না, বরং বাস্তব কার্যক্রম দেখতে হবে।
৪. ফতোয়া ও সিদ্ধান্ত
সুপ্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার জন্য সতর্কতামূলক জায়েয ফতোয়া দেওয়া যেতে পারে—যদি আপনি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ করে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেন:
- শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদন নিশ্চিত করুন: ব্যাংকের যে শাখা বা প্রোডাক্টে অ্যাকাউন্ট খুলছেন, তা তাদের নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত কি না তা জেনে নিন।
- সুদি লেনদেন থেকে দূরে থাকুন: অ্যাকাউন্টে জমা টাকার বিপরীতে প্রাপ্ত ‘লাভ’ যদি সুদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় (যেমন কোনো নির্দিষ্ট হার থাকে), তবে তা নাজায়েয বলে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় সেই লভ্যাংশ গ্রহণ না করে সদকা করে দেওয়া উচিত।
- লাভ ও লোকসানের নিয়ম মেনে চলুন: যদি ব্যাংক লোকসানের ক্ষেত্রে পুঁজি ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তবে তা মুদারাবার মূলনীতির পরিপন্থী; আলাদা পরিস্থিতিতে ফকিহগণ এ ধরনের চুক্তিকে নাজায়েয বলেছেন।
সামগ্রিক বিচার: আপনার উল্লেখিত ইসলামী ব্যাংকগুলো (ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক) রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত এবং তাদের নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড রয়েছে। অনেক হানাফি আলেম এগুলোকে জায়েয বলেছেন, তবে শর্ত সাপেক্ষে। যেহেতু শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা হয়, তাই সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলা ও টাকা জমানো জায়েয হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ পালনের মানসিকতা রাখতে হবে এবং কোনো সন্দেহজনক লেনদেন এড়িয়ে চলতে হবে।
উপসংহার
বর্তমান সময়ে বাসায় টাকা-পয়সা রাখা অনেকটা অনিরাপদ। অন্যদিকে সুদ হারাম,এবং সুদী কাজে সাহায্য করাও হারাম। , তাই বলা যায় যে, ব্যাংকে সেভিংস একাউন্টে টাকা রাখা যাবে না। কেননা তখন ব্যাংক কর্তৃত আইনগতভাবে উক্ত টাকা সুদী কারবারে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যদিও ব্যাংক চাহিবামাত্র গ্রাহককে উক্ত টাকা দিতে বাধ্য থাকে।
এজন্যই উলামায়ে কেরাম পরামর্শ দেন যে,উক্ত ব্যাংক সমূহে কারেন্ট একাউন্ট খুলে টাকা রাখতে হবে। কেননা কারেন্ট একাউন্টের টাকা আইনগতভাবে ব্যাংক ব্যবহার করতে পারেনা। , যদি কোনো কারণে ঐ সব ব্যাংক সমূহে কারেন্ট একাউন্ট খোলা দুস্কর হয়ে যায়, তাহলে সুদ গ্রহণ না করার শর্তে তাতে সেভিংস একাউন্ট খুলে টাকা রাখা যাবে। উলামায়ে কেরাম এ অনুমোদন দিয়েছেন।
★আপনি ইসলামী ব্যাংক গুলোর কোনো একটিতে কারেন্ট একাউন্ট খুলবেন। যদি কারেন্ট একাউন্ট খোলা সম্ভব না হয়, তাহলে বাধ্য হলে সেভিংস একাউন্টও জায়েজ আছে। তবে তার মুনাফাটি সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করে দিবেন।
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٢:١٧٣
অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোন পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু। (সূরা বাকারা-১৭৩) , মুনাফা গ্রহন করবেননা, উক্ত মুনাফা উত্তোলন করে তাহা সতর্কতা মূলক মুনাফা গরিব মিসকিনদের মাঝে ছওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করে দিবেন।
আল্লাহু আলাম (সর্বজ্ঞ)।