পড়ালেখায় মন বসে না;করণীয় কি?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রিয় বোন (নার্গিস আক্তার), আপনি যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তা একা নন। আপনার বর্ণনা—পড়তে বসলে হাই আসা, নিজ থেকে ম্যাথ করতে না পারা, পড়া মুখে না থাকা, সকালে পড়ে বিকেলে ভুলে যাওয়া—এগুলো স্পষ্টতই ওয়াসওয়াসা (শয়তানের খেয়াল ও কুমন্ত্রণা) এবং পরীক্ষার চাপজনিত মানসিক অবস্থার লক্ষণ। আপনি আগে ভালো ছাত্রী ছিলেন, বর্তমান অবস্থা অস্থায়ী। আপনি রুকইয়াহ ও দোয়া করেছেন, কিন্তু তাৎক্ষণিক ফল না পাওয়ায় নিরাশ হবেন না। আল্লাহর রহমত বড়।
১. সমস্যা বুঝুন—ওয়াসওয়াসা ও পড়ালেখায় জড়তা
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার (১/৪৭২) গ্রন্থে বলেন, ওয়াসওয়াসা অন্তরের এক রোগ যা সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, এমনকি সহজ কাজও করতে বাধা দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“নিশ্চয়ই শয়তান আদম সন্তানের রক্ত সঞ্চালনের মতো সঞ্চারিত হয়।” (সহীহ মুসলিম, ২১৭৫)
পরীক্ষার চাপ এলে শয়তান এ কুমন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দেয়। আপনার সকালে পড়ে বিকেলে ভুলে যাওয়া—এটি ওয়াসওয়াসার একটি সাধারণ লক্ষণ।
প্রথম করণীয়: আতঙ্কিত হবেন না। জেনে রাখুন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। আপনার অতীত রেকর্ড ভালো, বর্তমান অবস্থা অস্থায়ী, আল্লাহর ইচ্ছায় এটি কেটে যাবে।
২. আধ্যাত্মিক চিকিৎসা—উপেক্ষা ও অব্যাহত রাখা
ওয়াসওয়াসার প্রধান প্রতিকার হলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা।
ইমাম তাহাওয়ী (রহ.) তার শরহু মাআনিল আসার গ্রন্থে এবং আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) ফয়জুল বারী গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন, ওয়াসওয়াসার নিরাময় হলো খেয়ালের বিপরীত কাজ করা। যেমন, শয়তান বলছে “তুমি এই ম্যাথ পারবে না”, তখন আপনাকে বসে চেষ্টা করতে হবে, এমনকি ভুল হলেও। এই চেষ্টাই খেয়াল ভাঙবে।
অনুসরণীয় পদ্ধতি:
-
নিজেকে মূল্যায়ন বন্ধ করুন। ‘মনে আছে কি না’ তা বারবার চেক করবেন না। পড়তে বসলে আউযু বিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজীম বলে শুরু করুন। খেয়াল আসলে বলুন, “আমি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছি”, এবং চালিয়ে যান।
-
টাইমার ব্যবহার করুন। অল্প সময় (যেমন ২৫ মিনিট) পড়ুন, ৫ মিনিট বিরতি নিন। এতে মনোযোগ বাড়ে।
-
সবকিছু লিখে ফেলুন। ভুলে যাওয়ার ভয় থাকায় নোট তৈরি করুন, ম্যাথ কাগজে করুন। হাত ও চোখের ব্যবহার খেয়াল থেকে মন সরায়।
-
পড়ার আগে এই দো‘আগুলো পড়ুন:
- রাব্বি জিদনি ইলমা (হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন) (সূরা ত্বহা: ১১৪)
- আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ফাহমান নাবিয়্যিনা ওয়া হিফজাল মুরসালিন (হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে নবীগণের বোধ এবং রাসূলগণের স্মরণশক্তি প্রার্থনা করছি)
- প্রতিটি সেশনের আগে আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
৩. রুকইয়াহ—কেন উন্নতি হচ্ছে না?
রুকইয়াহ কার্যকর, কিন্তু বিলম্ব হতে পারে নিম্নোক্ত কারণে:
- পূর্ণ বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল না থাকা।
- নিয়মিত না করা—অন্তত ৪০ দিন ধারাবাহিকভাবে করতে হবে।
- গুনাহের উপস্থিতি যা বাধা সৃষ্টি করে। নামাজ, জাকাত, হিজাব ইত্যাদি ফরজ বিষয়গুলো পরীক্ষা করে দেখুন এবং তওবা করুন।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৪১২)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) উল্লেখ করেন, রুকইয়াহ তখনই কাজ করে যখন রোগী আল্লাহর শক্তিতে বিশ্বাস করে এবং খেয়ালের ভয় দূর করে।
এখন করণীয়:
- এক গ্লাস পানিতে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁক দিন এবং সকাল-সন্ধ্যা পান করুন।
- প্রতিটি নামাজের পর মুআব্বিযাতাইন (কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক ও কুল আউযু বিরাব্বিন নাস) ৭ বার পড়ুন।
- তাৎক্ষণিক ফল আশা করবেন না; প্রভাব ধীরে ধীরে আসবে।
৪. ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ
পরীক্ষার আগে:
- পর্যাপ্ত ঘুমান। ঘুম কম হলে স্মৃতি দুর্বল হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন: “তোমার শরীরের তোমার ওপর হক আছে” (বুখারি)। সারারাত পড়বেন না।
- পরিমিত খাবার খান। তেলে ভাজা ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।
- পূর্বের সমস্যা সমাধান করুন— প্রথমে সহজ একটি সমস্যা সমাধান করে আত্মবিশ্বাস বাড়ান।
পরীক্ষার সময়:
- ব্রেন ফাঁকা লাগলে চোখ বন্ধ করুন, গভীর শ্বাস নিন, বিসমিল্লাহ ও লা হাওলা ওলা কুwwوّة إلا بالله পড়ুন। তারপর সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন নিয়ে শুরু করুন।
- মনে রাখবেন: নম্বর আল্লাহর হাতে। আপনার দায়িত্ব চেষ্টা করা; ফল তাঁর ফায়সালা।
সর্বদা এই দো‘আটি পড়ুন:
ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যূমু বিরাহমাতিকা আস্তাগীস, আসলিহ লি শানী কুল্লাহু ওয়া লা তাকিলনি ইলা নাফসী তরফাতা আইন
(হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের মাধ্যমে আমি সাহায্য চাই। আমার সকল অবস্থা সংশোধন করুন এবং আমাকে আমার নিজের ওপর চক্ষুর নিমিষের জন্যও ছেড়ে দেবেন না।)
(সহীহ ইবনে হিব্বান, ৩/১৫৭)
৫. হানাফি আলেমদের থেকে রেফারেন্স
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয়, সে যেন আল্লাহর জিকির বাড়ায় এবং জ্ঞানচর্চায় মশগুল হয়।” (আল-হিদায়া)
- ইমাম মুহাম্মাদ শায়বানী (রহ.) আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে বলেন: সন্দেহগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাবে।
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী, ৮/৭৯৮): বিস্মৃতি প্রায়শই একটি পরীক্ষা, যারা চেষ্টা করে তাদের আলাদা করে দেওয়ার জন্য।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী, ৩/২১৪): ওয়াসওয়াসাজনিত পড়ালেখার অসুবিধা আল্লাহর ওপর দৃঢ় ভরসা ও নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভাঙার মাধ্যমে সমাধান হয়।
৬. উৎসাহবাক্য
আপনার অবস্থা স্থায়ী নয়। আপনার আগে হাজারো শিক্ষার্থী একই সমস্যা অতিক্রম করেছে। আপনি এখনও নামাজ পড়ছেন, সাহায্য চাইছেন—এটাই আপনার ঈমানের প্রমাণ। শয়তানকে আপনাকে হতাশ করতে দেবেন না। আল্লাহ বলেন:
“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক: ৩)
কর্মপরিকল্পনা:
| সময় | করণীয় | |------|--------| | ফজরের পর | আয়াতুল কুরসি, সূরা ইনশিরাহ, ইলম বৃদ্ধির দো‘আ | | পড়তে বসার আগে | আউযু বিল্লাহ, ছোট টাইমার, একটি সহজ সমস্যা সমাধান | | পড়ার সময় | খেয়াল উপেক্ষা, সবকিছু লিখে নিন, বিরতি নিন | | প্রতিটি নামাজের পর | কুল আউযু ৩ বার, দো‘আ “ইয়া হাইয়্যু...” | | ঘুমানোর আগে | সূরা মুলক, আয়াতুল কুরসি, ডান কাতে শোয়া | | দৈনিক রুকইয়াহ | ফুঁক দেওয়া পানি পান করুন; বিশ্বস্ত সোর্স থেকে রুকইয়াহ শুনুন |
আপনার স্মৃতি উন্নত হয়েছে কি না তা চেক করা বন্ধ করুন। শুধু কাজ করে যান। উন্নতি নিজেই আসবে, আপনি টের পাবেন না।
আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় সাফল্য দিন, খেয়াল দূর করুন এবং পড়ালেখা সহজ করে দিন। আমীন।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين