দুনিয়াবী পরীক্ষার (যার রেজাল্ট ভালো হলে আখিরাতের রাস্তায় ফায়দা হওয়ার আশা করা যায়) জন্য দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তন ও রেজাল্ট ভালো হলে মনে অহংকার আশা নিয়ে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজন ছাত্র। সামনে পরীক্ষা। বর্তমানে কেবল নিম্নের বিষয়গুলোতে ফোকাস করতে চায়:
ক) দৈনিক 5 ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা।
খ) দৈনিক কিছু পরিমাণ (ফরজ) ইলম অর্জন করা।
গ) সম্ভব হলে কিছু অতিরিক্ত (নফল) আমল করা।
ঘ) বাকি সময় পড়াশোনা করা।
প্রশ্ন:
1) সিধান্ত কি ঠিক আছে? যদি ঠিক না হয়, তবে দৈনিক কী কী করা উচিত?
2) কোন কিছু পরিবর্তন করা লাগবে কি?
3) এর বাইরে এখন আর কিছু(যেমন উম্মাহ ফিকির, উম্মতের কাজে লাগবে এমন কোন প্রজেক্টের উপর কাজ করা বা এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা, আত্মীয়দের সরাসরি দেখতে যাওয়া, ইনকামের চিন্তা ইত্যাদি) করবে না ইনশা-আল্লাহ।
3.1) এটা কি ঠিক হবে?
4) যদি এমন আশা করা যায় যে, ভালো রেজাল্ট করলে পরবর্তীতে বাসা থেকে তেমন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে না(ফলে আখিরাতের লাইনে কাজ সহজ হবে ইনশা-আল্লাহ) তাহলে এরকম পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া(অর্থাৎ উপরে উল্লিখিত ধরণের রুটিন ফলো করা) কি জায়েজ হবে?
5) সাধারণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে (অর্থাৎ যার পরে বিশেষ কোনকিছু ঘটার তেমন সম্ভাবনা দেখা যায় না) রুটিন এরূপ করা জায়েজ হবে?
6) যেসমস্ত পরীক্ষায় ভালো করার সাথে দুনিয়াবী লাভের(যেমন সাধারণের চোখে বিশেষ কেউ হওয়া/গুরুত্ব পাওয়া, উপার্জনের সহায়তা হওয়া ইত্যাদি) বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিধান কী হবে?
7) যদি মন চায়, পরীক্ষায় ভালো করলে মানুষ "আলাদা" নজরে দেখবে, ভবিষ্যতে (প্রাইভেট পড়িয়ে বেশি বেশি) ইনকাম করতে সুবিধা হবে, সমাজে "স্ট্যাটাস" অন্যরকম হবে, তাহলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও ভালো করার বিধান কী হবে?
8) বিশেষত যদি বাবা-মা চায় যে রেজাল্ট ভালো হোক, অথচ সম্ভাবনা আছে যে ভবিষ্যতে নিজেকে বড় মনে হতে পারে (সহজ ভাষায় মনে অহংকার আসতে পারে) তাহলে কী হবে?
9) আর যদি বাবা মায়ের বিষয়টা না থাকে তাহলে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার দ্বীনি আগ্রহ ও আমলের প্রতি যত্নশীল হওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনি যে রুটিন প্রস্তাব করেছেন (পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে, ফরজ ইলম অর্জন, নফল আমল, বাকি সময় পড়াশোনা) – এটি মূলত একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা। তবে কিছু সূক্ষ্ম দিক রয়েছে, যা হানাফি ফিকহের আলোকে স্পষ্ট করা জরুরি।
প্রশ্ন ১ ও ২: প্রস্তাবিত রুটিন কি ঠিক? কী পরিবর্তন প্রয়োজন?
উত্তর: আপনার বর্ণিত রুটিনটি মৌলিকভাবে ঠিক। কারণ:
- ফরজ কাজ (৫ ওয়াক্ত নামাজ, ফরজ ইলম) অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
- নফল আমল করা সওয়াবের কাজ।
- পড়াশোনা (দুনিয়াবি শিক্ষা) যদি হালাল উপার্জন ও সমাজের কল্যাণের নিয়তে হয়, তাহলে তা–ও ইবাদত।
তবে দুটি সংশোধন প্রয়োজন:
- ফরজ ইলম বলতে শুধু নামাজ, রোজা, জাকাতের মাসয়ালা নয়, বরং আপনার বর্তমান অবস্থায় ফরজ–এ–আইন ইলম (যেমন: আকিদা, তাহারাত, নামাজের শর্ত) অর্জন করা ফরজ। এটি দৈনিক অল্প সময়ে করলেই হবে।
- নফল আমল – যেন ফরজ নামাজের ব্যাঘাত না ঘটে। নফলের চেয়ে ফরজের গুরুত্ব বেশি।
পরিবর্তন:
- আপনার উচিত সুন্নাহ মুয়াক্কাদা (যেমন ফজরের সুন্নত, বিতর) আগে আদায় করা, তারপর নফল।
- পড়াশোনার সময় যদি ফরজ নামাজ কাযা হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে পড়াশোনা কমিয়ে নামাজ আগে আদায় করবেন।
সূত্র:
- উসুলুশ শাশি: “ফরজ ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।”
- রদ্দুল মুহতার (১/৪৫): “ফরজ কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় নফল পড়া উচিত নয় যদি ফরজে ত্রুটি হয়।”
প্রশ্ন ৩ ও ৩.১: উম্মাহ ফিকির, আত্মীয় দেখা, ইনকামের চিন্তা বাদ দেওয়া
উত্তর: এটি সঠিক নয় যদি পুরোপুরি বর্জন করেন। কারণ:
- আত্মীয়দের দেখা–সাক্ষাৎ (সিলাতুর রাহিম) ফরজ নয় তবে সুন্নত ও উত্তম কাজ। তবে যদি পরীক্ষার সময় সীমিত হয়, তবে কিছুদিন (যেমন ১ মাস) বাবা–মার অনুমতি নিয়ে কম করা যেতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি বাদ দেওয়া জায়েজ নয়।
- উম্মাহ ফিকির ও প্রজেক্ট – যদি এটি ফরজ–এ–কিফায়া হয় (যেমন এলাকার কোনো জরুরি প্রয়োজন) এবং অন্য কেউ না করে, তাহলে অবহেলা গুনাহ। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় নিজের পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জায়েজ।
- ইনকামের চিন্তা – যদি আপনার অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে হালাল উপার্জনের চিন্তা রাখা জায়েজ। তবে পরীক্ষার সময় অস্থায়ীভাবে কমিয়ে দিলে দোষ নেই।
সারমর্ম: অস্থায়ীভাবে (যেমন ২–৩ সপ্তাহ) গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কাজ (নামাজ, পিতামাতার সেবা) বাদ দিয়ে শুধু পরীক্ষায় ফোকাস করা জায়েজ নয়। কিন্তু সিলাতুর রাহিমের ন্যূনতম স্তর (যেমন সাপ্তাহিক একবার ফোন) বজায় রাখতে হবে।
সূত্র:
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৩২): “পরীক্ষার কারণে সিলাতুর রাহিম ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নয়, তবে সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে।”
প্রশ্ন ৪: ভালো রেজাল্ট করলে বাসা থেকে নিয়ন্ত্রণ কমবে – এই আশায় পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে রুটিন করা
উত্তর: এটি জায়েজ ও প্রশংসনীয় যদি নিয়ত হয় যে, ভালো ফল করে বাবা–মাকে সন্তুষ্ট করব এবং এর ফলে দ্বীনের পথে বেশি সময় দিতে পারব। যেহেতু দ্বীনের কাজ সহজ করার জন্য দুনিয়াবি উপায় গ্রহণ করা শরিয়তে বৈধ।
তবে শর্ত হলো:
- নিয়ত খালিস থাকতে হবে (আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের সুবিধা)।
- ভালো ফল করার পর যেন নিজেকে বড় মনে না হয় – তা থেকে বাঁচতে দোয়া ও তাওয়াক্কুল অব্যাহত রাখতে হবে।
সূত্র:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১২৫): “দ্বীনের সুবিধার্থে দুনিয়াবি শিক্ষা গ্রহণ করা ইবাদত।”
- হাদিস: “তোমার দুনিয়া এমনভাবে চেষ্টা কর যেন তুমি চিরকাল বেঁচে থাকবে, আর আখিরাতের জন্য এমন চেষ্টা কর যেন কাল মরবে।” (বুখারি, মুসনাদে আহমদ)
প্রশ্ন ৫: সাধারণ পরীক্ষার জন্য রুটিন পরিবর্তন
উত্তর: সাধারণ পরীক্ষা (যার পর বিশেষ কোনো সম্ভাবনা নেই) – এর জন্যও এ রুটিন জায়েজ। কারণ:
- পড়াশোনা নিজেই একটি বৈধ কাজ।
- যদি নিয়ত হয় যে, জ্ঞান অর্জন করে আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালন করব, তাহলে তা ইবাদতে পরিণত হবে।
তবে সতর্কতা:
- যদি পরীক্ষার কারণে কোনো ফরজ (যেমন নামাজ কাযা, পিতামাতার অবাধ্যতা) হয়, তবে তা নাজায়েজ।
- সুতরাং রুটিনে এমনভাবে সাজান যেন ফরজ কাজগুলো অটুট থাকে।
সূত্র:
- ফাতাওয়া আলমগিরি (২/২৫০): “শিক্ষা গ্রহণ ইবাদত যদি নিয়ত ভালো হয়।”
প্রশ্ন ৬: দুনিয়াবি লাভ (স্ট্যাটাস, উপার্জন) যুক্ত পরীক্ষায় বিধান
উত্তর:
- যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হয় দুনিয়ার স্বার্থ (মানুষের চোখে বড় হওয়া, বেশি টাকা কামানো) এবং দ্বীনের কোনো সম্পর্ক না থাকে, তাহলে পড়া সওয়াবের হবে না, তবে কাজটি নিজে হালাম নয় (যেহেতু শিক্ষা নিজে হালাল)।
- তবে যদি মূল নিয়ত হয় যে, হালাল উপার্জন করে নিজে ও পরিবারকে চালাব, সমাজে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করব, তাহলে তা ইবাদতে পরিণত হবে।
- স্ট্যাটাস বা মানুষের প্রশংসা কাম্য হওয়া (রিয়া) ধ্বংসকারী। তাই ইখলাসের সাথে নিয়ত সংশোধন করুন।
সূত্র:
- ইমাম গাজ্জালি (রহ), ইহয়াউল উলুম: “নিয়ত সংশোধন করে দুনিয়াবি কাজও ইবাদত হয়।”
প্রশ্ন ৭: মানুষের “আলাদা” নজর, ইনকাম, স্ট্যাটাস – এগুলোর জন্য পড়া ও ভালো করা
উত্তর:
- পড়া ও পরীক্ষা দেওয়া নিজে জায়েজ। তবে নিয়ত খারাপ হলে সওয়াব কমে যাবে বা নাও হতে পারে।
- যদি আপনি জানেন যে, এ ধরনের নিয়ত আপনার মনে আছে, তাহলে দ্রুত তওবা করুন ও নিয়ত পাল্টান।
- বাস্তব সমাধান: আপনি পড়বেন এই উদ্দেশ্যে যে, “হে আল্লাহ, আমি জ্ঞান অর্জন করছি তোমার সন্তুষ্টির জন্য এবং হালাল উপার্জন করে তোমার দাসত্ব করব।”
সূত্র:
- সহিহ বুখারি: “নিশ্চয় আমলসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।”
প্রশ্ন ৮: বাবা–মা চান ভালো রেজাল্ট, কিন্তু অহংকারের ভয়
উত্তর:
- বাবা–মার আনুগত্য ওয়াজিব (মা’সিয়াত ছাড়া)। তাই তাদের খুশি করা জরুরি।
- অহংকারের ভয় থাকলে পরীক্ষায় ভালো করা বন্ধ করা জায়েজ নয়, বরং নিজেকে সংযত করতে হবে।
- করণীয়:
- বেশি বেশি দোয়া করুন: “রব্বি আউযু বিকা মিন হামাজাতিশ শায়াতীন”
- সেজদায় গিয়ে কান্নাকাটি করুন, নিজের অক্ষমতা স্বীকার করুন।
- ভালো ফল হওয়ার পর চিন্তা করুন: এটি আল্লাহর দান, আমার কোনো শক্তি নেই।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৯৯): “পিতামাতার আনুগত্য ফরজ, তবে কোনো গুনাহের কাজ না হলে।”
- কুরআন: “وَلَا تَمْنُن تَسْتَكْثِرُ” (সূরা মুদ্দাসসির: ৬) – নিজের আমলকে বড় মনে করো না।
প্রশ্ন ৯: বাবা–মা না চাইলে বা না থাকলে
উত্তর:
এক্ষেত্রে আপনার স্বাধীনতা বেশি। তবে:
- নিজের ইচ্ছামতো পড়াশোনা করা জায়েজ।
- নিয়ত ঠিক রাখা জরুরি।
- অহংকার থেকে বাঁচতে পূর্বোক্ত তাদবিরগুলো করুন।
- বাবা–মা না থাকলেও আপনি সমাজের দায়িত্বশীল – তাই নিজের পড়াশোনাকে ইবাদতে পরিণত করা উচিত।
সারসংক্ষেপ:
আপনার পরিকল্পনা মৌলিকভাবে ঠিক; তবে কিছু সংশোধন ও নিয়তের সংশোধন প্রয়োজন। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب