আমার আত্মীয়-স্বজন কেউ পর্দা করে না। আমার বউকে কিভাবে পর্দা করাব?
Family Life · Hanafi
Question
আমি জেনারেলে পড়া স্টুডেন্ট,আলহামদুলিল্লাহ আমি নামাজ পড়ি।আমি চাই বিয়ের পর আমার বউকে পর্দা করাব।কিন্তু আমার আত্মীয়-স্বজন কেউ পর্দা করেনা।আমি যদি বিয়ে করি তারা ত সবাই আমার বউ দেখতে চাইবে। আমি না দেখালে তারা ত রাগ করবে।এমন একটা কঠিন পরিস্থিতিতে আমি কিভাবে আমার বউকে পর্দা করাব। আর আত্মীয়-স্বজনদেরকে ম্যানেজ করব। দয়া করে পরামর্শ দিবেন।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। পর্দার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং তা বাস্তবায়নে আগ্রহী হওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনার উদ্বেগটি খুবই বাস্তবসম্মত—পরিবারে প্রচলিত না থাকা সত্ত্বেও দ্বীনের বিধান পালন করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। ইনশাআল্লাহ, নিচে কোরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত পরামর্শ দেওয়া হলো।
১. পর্দার হুকুম ও এর সীমারেখা
পর্দা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যারা ও মুমিনদের স্ত্রীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং কেউ তাদেরকে কষ্ট দেবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সুরা আহযাব: ৫৯)
মাহরাম ও গায়রে মাহরামের সংজ্ঞা:
যেসব আত্মীয়-স্বজনের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থায়ীভাবে হারাম (যেমন: আপন চাচা, মামা, ভাই, বাবা, শ্বশুর, আপন ভাতিজা ইত্যাদি) তাদের সামনে পর্দা করা জরুরি নয়। কিন্তু চাচাতো-মামাতো ভাই, দেবর (স্বামীর ছোট ভাই), ইত্যাদি গায়রে মাহরাম। তাদের সামনে পূর্ণ পর্দা (অর্থাৎ সারা শরীর ঢেকে রাখা, চেহারা ও হাত সহ) ফরজ। হানাফি মাযহাব মতে, ফিতনার আশংকায় চেহারা ও হাতের তালু পর্যন্ত ঢেকে রাখাও ফরয। এটা, মুতাআখখিরিন ফকিহগণের সিদ্ধান্ত।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) : পর্দার বিধান ও মাহরাম-গায়রে মাহরামের পার্থক্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): পর্দা সংক্রান্ত মাসাইল।
- বাহিশ্তি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): পর্দার ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা।
২. আত্মীয়-স্বজনদের সামলানোর কৌশল
ক. দ্বীনের দাওয়াত ও সহানুভূতিপূর্ণ আলোচনা
আপনি যদি বিয়ের আগে থেকেই পরিবারের সদস্যদের সাথে ইসলামী পর্দার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন এবং জানিয়ে দেন যে “বিয়ের পর আমার স্ত্রী পর্দা করবে, এটি আমার দ্বীনের আবশ্যক বিধান”, তাহলে পরে অবাক হওয়ার সুযোগ কম থাকে। তবে কথা বলতে হবে মধুর ভাষায় ও হিকমতের সাথে। যেমন বলতে পারেন:
“আমার খুব ইচ্ছা, আমার স্ত্রী ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলুক। আপনারা তো সবাই আমার ভালো চান। তাই দয়া করে বুঝবেন, আমি তাকে গাযরে মাহরামদের সামনে দেখাতে পারব না। এটি আল্লাহর হুকুম।”
খ. বাস্তব সমাধান: মাহরাম ব্যতীত কাউকে বাড়িতে না আনা
বিয়ের পর যখন আত্মীয়-স্বজনরা বউ দেখতে আসবেন, তখন শুধুমাত্র মাহরাম আত্মীয়দের (যেমন: বাবা, আপন চাচা, আপন ভাই, শ্বশুর ইত্যাদি) দেখাতে পারবেন যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। গায়রে মাহরামদের (চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই/দেবর, ইত্যাদি) জন্য আলাদা সময় বা স্থান নির্ধারণ করবেন। আপনি সহজেই বলতে পারেন:
“আপনারা তো আমার আপনজন। কিন্তু ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী গায়রে মাহরামদের সামনে আমার স্ত্রীকে আসতে বারণ করা হয়েছে। আমি চাই আপনাদের সম্মান রাখতে, কিন্তু আল্লাহর হুকুমের আগে কাউকে রাখতে পারি না।”
গ. স্ত্রীর সাথে পূর্ব আলোচনা ও পরিকল্পনা
বিয়ের আগেই সম্ভাব্য স্ত্রীকে (বা তার অভিভাবককে) পর্দার শর্ত জানিয়ে দিন। বিয়ের পর দাম্পত্য জীবনে উভয়েই একে অপরকে সাহায্য করবেন। স্ত্রীকে বলবেন, “আমার আত্মীয়রা যদি চাপ দেয়, তুমি শুধু বলবে— আমার স্বামীই আমাকে পর্দা করতে বলেছেন।” এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দৃঢ় ঐক্যের পরিচয় বহন করে।
ঘ. সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও ধৈর্য
পরিবারের কেউ কেউ রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারেন। তখন ধৈর্য ধরে ব্যাখ্যা করবেন। মনে রাখবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অপমান বা কষ্ট সহ্য করলে তা ইবাদতে পরিণত হয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন:
"আর যারা ধৈর্যশীল, তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে দেওয়া হবে।" (সুরা যুমার: ১০)
হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম বস্তু দান করেন।" (মুসনাদে আহমাদ)
ঙ. বাড়ির ভেতরে পর্দার ব্যবস্থা
বাড়ির ড্রইংরুম বা মেহমানখানা এমনভাবে সাজান যাতে স্ত্রীকে মেহমানদের সামনে আসতে না হয়। একটি আলাদা পর্দা বা স্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন। অনেক আধুনিক বাড়িতেও এটি সম্ভব।
৩. গুরুত্বপূর্ণ হানাফি ফাতাওয়ার রেফারেন্স
- ফাতাওয়া উসমানী (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৪) : “যদি মাহরাম ও গায়রে মাহরাম উভয়েই একত্র হয়, তাহলে মহিলার জন্য পুরুষদের সামনে বের হওয়া জায়েয নয়, যদিও তাতে আত্মীয়রা রাগ করে।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): “পর্দা ফরজ হওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনের রাগ বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় পর্দা ছাড়ার অনুমতি দেয় না। বরং ধৈর্য ধরে বুঝাতে হবে।”
- আল-হিদায়া (মারগীনানী): “মহিলার জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে চেহারা ও হাত ছাড়া অন্য অঙ্গ প্রকাশ করা হারাম।”
- শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী): পর্দার হাদিসসমূহের ব্যাখ্যা।
৪. ব্যবহারিক টিপস ও সারসংক্ষেপ
| সমস্যা | সমাধান | |--------|---------| | আত্মীয়রা বউ দেখতে চায় | শুধুমাত্র মাহরামদের ডাকুন; গায়রে মাহরামদের জন্য আলাদা সময় বা দূর থেকে দেখা (পর্দার আড়ালে) | | রাগ বা অসন্তোষ | ধৈর্য ও সহানুভূতির সাথে দ্বীনের কথা বলুন; দোয়া করুন তারা বুঝতে পারেন | | স্ত্রীর সম্মতি | বিয়ের আগে পর্দার শর্ত দিয়ে বিয়ে করুন; পরে নিজেও পর্দা মেনে চলুন | | সামাজিক চাপ | মনে রাখবেন, আল্লাহর আইন মেনে চললে সমাজের চেয়ে আল্লাহর নৈকট্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ |
মহান আল্লাহ আপনার ইচ্ছাকে কবুল করুন এবং পর্দার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ পালনে আপনাকে সাহায্য করুন। আমিন।