ভাগচাষের ক্ষেত্রে ফসলের উশর/যাকাত কার ওপর ওয়াজিব হবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
এ অবস্থায় উৎপাদিত ফসলের উশর (ফসলের যাকাত) কার ওপর ওয়াজিব হবে? জমির মালিকের ওপর, নাকি ভাগচাষির ওপর? নাকি উভয়ের প্রাপ্ত অংশ অনুযায়ী উভয়ের ওপর উশর আদায় করা আবশ্যক হবে?
অনুগ্রহ করে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিষয়টির বিধান ব্যাখ্যা করবেন।
Answer
উত্তর: ফসলের উশর (যাকাত) কার ওপর ওয়াজিব?
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
উশর (ফসলের যাকাত) আদায়ের দায়িত্ব নির্ভর করে বীজ কে সরবরাহ করেছে তার ওপর।
- যদি জমির মালিক বীজ দেয়, তাহলে উশর মালিকের ওপর (পুরো ফসলের ওপর) ওয়াজিব। ভাগচাষি তার প্রাপ্ত অংশ পাওয়ার আগেই উশর কেটে নেওয়া হবে।
- যদি ভাগচাষি বীজ দেয়, তাহলে উশর ভাগচাষির ওপর (পুরো ফসলের ওপর) ওয়াজিব। সে উশর দেওয়ার পর জমির মালিককে তার অংশ দেবে।
- যদি উভয়ে যৌথভাবে বীজ দেয় (অংশীদারিত্বে), তাহলে প্রত্যেকের প্রাপ্ত অংশ অনুযায়ী উশর আদায় করা ওয়াজিব।
এটি হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত। নিচে কুরআন, হাদিস ও প্রামাণ্য ফিকহি কিতাবের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. উশরের ভিত্তি ও গুরুত্ব
কুরআনের দলিল:
সূরা আল-আন‘আম (৬:১৪১) ও সূরা আল-বাকারাহ (২:২৬৭)-এ ফসলের যাকাত (উশর) বোঝানো হয়েছে। তবে সরাসরি শব্দটি কুরআনে নেই; হাদিসে বিধান স্পষ্ট।
হাদিসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُونُ الْعُشْرُ، وَفِيمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ
“যা আসমানি পানি ও ঝরনা দ্বারা সেচ করা হয়, তাতে এক-দশমাংশ (উশর); আর যা কূপ বা যন্ত্র দ্বারা সেচ করা হয়, তাতে বিশ ভাগের এক ভাগ (নিসফ উশর) দেওয়া ওয়াজিব।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৪৮৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৯৮১)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
উশর জমির ওপর ধার্য হয়, ব্যক্তির ওপর নয়। তবে জমির ফল যে ব্যক্তির মালিকানায় আসে, তার ওপর তা আদায় করা ওয়াজিব। ভাগচাষের ক্ষেত্রে বীজের মালিকই মূল ফসলের মালিক গণ্য হয়। (আল-হিদায়া, ২/১৬১; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯২)
২. ভাগচাষে উশরের দায়িত্ব (হানাফি মাজহাব)
হানাফি ফকিহগণ বলেন:
فِي الْمُزَارَعَةِ الْعُشْرُ عَلَى صَاحِبِ الْبَذْرِ
“ভাগচাষে উশর বীজের মালিকের ওপর ওয়াজিব।”
(ফতোয়া আলমগীরী, ১/১৯০; ইমদাদুল ফতোয়া, ২/২৫৪; ফতোয়া উসমানী, ২/৪৪৩)
এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
ক. যখন জমির মালিক বীজ সরবরাহ করে
- এ অবস্থায় সমস্ত ফসল জমির মালিকের সম্পত্তি। ভাগচাষি শুধু শ্রমিকের মতো (উজরতের ভিত্তিতে) নির্ধারিত অংশ পায়।
- তাই মালিকের ওপর পুরো ফসলের উশর দেওয়া ওয়াজিব। তিনি উশর কেটে নেওয়ার পর ভাগচাষিকে তার অংশ দেবেন।
- দলিল: সাহাবি ইবনে উমর (রা.) ভাগচাষের সময় বীজ নিজে দিতেন এবং ঝাড়াইয়ের আগেই পুরো ফসল থেকে উশর দিয়ে দিতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, বাবুল মুজারাআ)
খ. যখন ভাগচাষি বীজ সরবরাহ করে
- এ অবস্থায় সমস্ত ফসল ভাগচাষির সম্পত্তি। জমির মালিক শুধু জমির ভাড়া হিসেবে নির্ধারিত অংশ (ফসলের) পান।
- তাই ভাগচাষির ওপর পুরো ফসলের উশর দেওয়া ওয়াজিব। সে উশর আদায় করে অবশিষ্ট অংশ থেকে জমির মালিককে তার অংশ দেবে।
- হাদিসে এসেছে: الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ – “যার জিম্মায় উৎপাদন, তার ওপর খরচ ও দায়িত্ব।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫০৮) – এখানে ‘খরাজ’ বলতে উশরও বুঝানো হয়।
গ. যখন উভয়ে যৌথভাবে বীজ দেয় বা অংশীদারিত্বে চাষ করে
- যদি জমির মালিক ও ভাগচাষি উভয়েই বীজ সরবরাহ করে (যেমন ৫০:৫০ অংশীদারিত্ব), তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রাপ্ত ফসলের অংশের ওপর উশর দেবে।
- হানাফি ফকিহগণ বলেন:
وَإِذَا كَانَ الزَّرْعُ بَيْنَ اثْنَيْنِ فَالْمُسْتَحَبُّ أَنْ يُؤَدَّى الْعُشْرَ مِنْ حِصَّةِ كُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا
“যখন দুইজনের মধ্যে ফসল হয়, তখন (উশর দেওয়ার জন্য) মুস্তাহাব হচ্ছে প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ থেকে আদায় করা।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯৩; আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ১/২৯২)
৩. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি মনীষীদের মত
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) : উশরের দায়িত্ব বীজের মালিকের ওপর। (আল-মাবসুত, ৩/৩৭)
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) : বীজদাতার ওপর উশর; তবে জমির মালিকও ভাড়ার অংশ থেকে বাড়তি কিছু দিতে পারেন। (কিতাবুল আছার)
- ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) : একই মত।
- ইবনে আবেদীন (রহ.) : রদ্দুল মুহতারে বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন যে উশর জমিনের উৎপাদনের ওপর; শর্ত হলো বীজ যার মালিকানায়। (৩/২৯২-২৯৩)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) : মাআরিফুল কুরআনে উশরের বিধান বর্ণনা করে ভাগচাষের ক্ষেত্রে বীজ মালিকের দায়িত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
- মুফতি তকি উসমানি (দা.বা.) : ফতোয়া উসমানী, ২/৪৪৩-৪৪৪-এ একই বক্তব্য দিয়েছেন।
৪. প্রচলিত ভুল ধারণার জবাব
প্রশ্নে উল্লেখ আছে: “চুক্তি অনুযায়ী ভাগচাষি জমিতে চাষাবাদ করে এবং জমির মালিককে নির্ধারিত পরিমাণ ফসল প্রদান করে।” এখানে বীজ কে দিয়েছে তা উল্লেখ নেই। সাধারণত বাংলাদেশের অধিকাংশ ভাগচাষে ভাগচাষি নিজেই বীজ ও সার দেয়; জমির মালিক কেবল জমি দেন। তাহলে উশর ভাগচাষির ওপর ওয়াজিব। কিন্তু যদি জমির মালিক বীজ দেয়, তাহলে মালিকের ওপর ওয়াজিব। তাই প্রশ্নকারীকে বীজদাতা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া জরুরি।
৫. ব্যবহারিক নির্দেশনা
-
উশর আদায়ের সময়:
ফসল পাকার পর, ঝাড়াই ও পরিমাপের আগেই উশর কেটে নেওয়া ওয়াজিব। (ফতোয়া আলমগীরী, ১/১৯০) -
উশরের পরিমাণ:
- প্রাকৃতিক সেচে (বৃষ্টি, নদী) – ১০% (অর্থাৎ ১/১০)
- কৃত্রিম সেচে (পাম্প, কূপ) – ৫% (অর্থাৎ ১/২০)
(সহীহ বুখারি, হাদিস: ১৪৮৩)
-
উশরের খাত:
উশর যাকাতের মতোই আট খাতে ব্যয় হবে। (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬০)
৬. গ্রন্থপঞ্জি (প্রামাণ্য হানাফি কিতাব)
- আল-হিদায়া (২/১৬১-১৬২) – উশরের অধ্যায়
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৯২-২৯৩) – ইবনে আবেদীন
- ফতোয়া আলমগীরী (আল-ফতোয়াতুল হিন্দিয়্যাহ) (১/১৯০) – বাবুল উশর
- ইমদাদুল ফতোয়া (২/২৫৪) – মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
- ফতোয়া উসমানী (২/৪৪৩-৪৪৪) – মুফতি তকি উসমানি
- বেহেশতি জেওর (২য় খণ্ড, উশর অধ্যায়) – মাওলানা থানভী
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা আল-আনআম, ১৪১ আয়াতের তাফসির) – মুফতি মুহাম্মদ শফি
- উসুলুশ শাশী (উশর সম্পর্কিত মূলনীতি) – নিযামুদ্দিন শাশী
৭. চূড়ান্ত ফতোয়া
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়:
ভাগচাষে উশরের দায়িত্ব বীজের মালিকের ওপর। যদি জমির মালিক বীজ দেয়, তাহলে উশর তার ওপর; আর যদি ভাগচাষি বীজ দেয়, তাহলে উশর ভাগচাষির ওপর। যদি উভয়ে বীজের অংশীদার হয়, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রাপ্ত ফসলের অংশের ওপর উশর দেবে।
(ফতোয়া উসমানী, ২/৪৪৪; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯২)
সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি:
উশর আদায়ের সময় সতর্ক থাকবেন যেন ভাগচাষি ও জমির মালিকের মধ্যে কোনো বিরোধ না হয়। চুক্তি লেখার সময়ই বলে নেওয়া ভালো যে, “উশর কে দেবে”।