শীতকালে বৃদ্ধর জন্য তায়াম্মুম করার সুযোগ আছে কি? ভাড়ী মেকাপের কারণে নামায কাযা হলে পরবর্তীতে কাযা আদায় করলে হবে কি?
Taharah Purity · Hanafi
Question
২। বিয়ের অনুষ্ঠানে ভারী মেকআপ এর কারণে ওযু করা সম্ভব হয়না। এর মধ্যে সালাতের ওয়াক্ত হলে সালাত আদায় করাও হয়না। তখন বাসায় গিয়ে কাযা নামায আদায় করলে নামায কবুল হবে?
Answer
প্রশ্ন ১: শীতকালে ফজরের সময় ঠান্ডাজনিত কারণে উযু করতে কষ্ট হলে তায়াম্মুম করা যাবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, উক্ত মহিলার জন্য তায়াম্মুম করে নামায পড়া জায়েয হবে, তবে শর্ত হলো—ঠান্ডাজনিত কারণে পানি ব্যবহার করলে তার রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার বা শরীরের ক্ষতি হওয়ার প্রকৃত আশঙ্কা থাকতে হবে। হানাফী ফিকহের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যদি পানির ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় বা এমন শীত হয় যে পানি গরম করার কোনো উপায় না থাকে, তাহলে তায়াম্মুম বৈধ।
প্রমাণ ও হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি:
-
কুরআন (সূরা মায়িদাহ, ৫:৬): "তোমরা যদি পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।" ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, 'পানি না পাওয়া' শুধু পানির অভাবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পানির ব্যবহারে অপারগতা বা ক্ষতির আশঙ্কাও এর অন্তর্ভুক্ত। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৩৩)
-
হাদীস: এক সাহাবী ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাযি.) শীতের রাতে অপবিত্র অবস্থায় পানির ব্যবহারে অসুস্থতার আশঙ্কা করে তায়াম্মুম করে নামায পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তা শুনে হাসলেন এবং возраজ্ঞতা দিলেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৪; সহীহ ইবনু হিব্বান)
-
হানাফী ফিকহের গ্রন্থ:
- রদ্দুল মুহতার (১/২৩৫): "যদি পানি ব্যবহারের কারণে রোগ বৃদ্ধি বা সুস্থতা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তায়াম্মুম জায়েয।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/১০৫): "শীতের তীব্রতার কারণে পানি গরম করার সামর্থ্য না থাকলে এবং পানি ব্যবহারে অসুস্থতার ভয় থাকলে তায়াম্মুম বৈধ।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২৪): "পানি ব্যবহারে ভয়াবহ শীতের কারণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তায়াম্মুম করবে।"
শর্তাবলী: ১. ঠান্ডাজনিত সমস্যা এমন হতে হবে যে পানি ব্যবহার করলে রোগ বাড়বে বা নতুন কোনো অসুখ দেখা দেবে। ২. পানি গরম করার কোনো ব্যবস্থা না থাকা (যেমন: বিদ্যুৎ, গ্যাস না থাকা বা শারীরিক সক্ষমতা না থাকা)। ৩. ওযুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করার নিয়তে মাটি বা মাটির জিনিস ব্যবহার করা।
সুতরাং, ৬০ বছরের উক্ত মহিলার জন্য যদি ঠান্ডায় পানি ব্যবহার করলে অসুস্থতা বাড়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থাকে এবং পানি গরম করার সুযোগ না থাকে, তাহলে তিনি তায়াম্মুম করে ফজরের নামায পড়তে পারবেন। তবে সম্ভব হলে পানি গরম করে ওযু করাই উত্তম।
প্রশ্ন ২: বিয়ের অনুষ্ঠানে ভারী মেকআপ করে সালাতের ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে বাসায় গিয়ে কাযা নামায পড়লে তা কবুল হবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, কাযা নামায আদায় করলে নামায আদায়ের ফরজ দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে—অর্থাৎ নামায কবুল হবে এবং গোনাহ মাফের আশা করা যায়। তবে মূলত সালাতের ওয়াক্তের মধ্যেই নামায পড়া ফরজ। ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াক্ত পার করে দেওয়া কবীরা গোনাহ। কিন্তু যদি এমন অবস্থা হয় যে ওযু করা সম্ভব ছিল না (ভারী মেকআপের কারণে) এবং সালাতের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে, তাহলে ওই নারীর জন্য ওয়াজিব হলো—যখনই সুযোগ হবে, তখনই কাযা আদায় করা। এই কাযা নামায আদায় করলে ফরজ আদায় হবে, তবে তিনি গাফলতি ও আয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে গোনাহগার হবেন না, যদি তার কাছে সত্যিই কোনো বিকল্প না থাকে।
হানাফী ফিকহের বিস্তারিত:
- মেকআপের অবস্থা: ভারী মেকআপ (যেমন: ফাউন্ডেশন, প্রাইমার, ওয়াটারপ্রুফ মাস্কারা) ওযুর পানি ত্বকে পৌঁছতে বাধা দেয়। এই অবস্থায় ওযু সহীহ হবে না। তাই সালাতের জন্য ওযু করতে হলে অবশ্যই মেকআপ পুরোপুরি অপসারণ করতে হবে।
- সালাতের সময়: বিয়ের অনুষ্ঠানে সালাতের ওয়াক্ত শুরু হলে দ্রুত মেকআপ মুছে ফেলে ওযু করে নামায পড়া ওয়াজিব। যদি তা না করা হয় এবং ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়, তাহলে গোনাহ হবে।
- কাযা পালন: সালাতের কাযা করা জরুরি। ইসলামী শরীয়তে কাযা নামায আদায় করলে তা আদায় বলে গণ্য হয়। ইচ্ছাকৃত বিলম্ব ছাড়া কাযা নামায কবুল হয়। রদ্দুল মুহতার (২/৮৪)-এ বলা হয়েছে: "যে ব্যক্তি ওয়াক্তের মধ্যে নামায পড়তে পারে না, তার জন্য কাযা ওয়াজিব। কাযা করলে সে ফরজ থেকে মুক্তি পাবে।"
- অজুহাত গ্রহণ: যদি মহিলা বলতে পারেন, "আমি মেকআপ অপসারণ করতে পারিনি কারণ ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সেটা সম্ভব ছিল না"—তবে এটি গ্রহণযোগ্য কিনা তা নির্ভর করে তার সততার ওপর। তবে সাধারণত বিয়ের অনুষ্ঠানে সালাতের জন্য বিরতি নেওয়া সম্ভব। হানাফী ফিকহের ফাতাওয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে—যে কোনো বৈধ ওজরের কারণে নামায কাযা করা জায়েয, কিন্তু নামায ছেড়ে দেওয়া জায়েয নয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৭)
সারাংশ:
- তিনি বাসায় গিয়ে কাযা নামায পড়বেন, ইনশাআল্লাহ তা কবুল হবে—অর্থাৎ ফরজ আদায় হবে।
- তবে ভবিষ্যতে এড়িয়ে চলা উচিত। প্রয়োজনে বিয়ের অনুষ্ঠানে আগেভাগে মেকআপ না করা বা হালকা মেকআপ করা, অথবা সালাতের জন্য অল্প সময় নির্ধারণ করে নেওয়া কর্তব্য।
- কাযা নামায আদায় করলে গোনাহ মাফের জন্য তওবা ও ইস্তিগফার করাও জরুরি।