সাক্ষর করার পরবর্তীতে কাজী ১৮ নং কলামে শর্তসাপেক্ষে তালাকের অনুমতি দিয়েছে, এদ্বারা কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার হাসবেন্ড এর নিয়ত ছিল সে আমাকে কোনো অধিকার দিবে না, তাই সে কিছু না দেখেই সাইন করে দিয়েছে কাবিন নামা তে। তখন সেখানে কোন কিছু লিখা ছিল না। আমার হাসবেন্ড তো জানত না , ভাবছে কাজি তাকে জিগ্যেস করবে। আর বিয়ের দিন খেয়াল ও ছিল না।
১) এখন আমি কি অধিকার পাবো? একজন মুফতি বলেছিলেন যে, হাসবেন্ড যদি আগে থেকে জানে, জেনে সাক্ষর করে তাহলে নাকি অধিকার পাবে। হুজুর আমার হাসবেন্ড তো জানে এই বিষয়ে, তাও বিয়ের দিন খেয়াল করে নাই কাজি কি লিখছে। কিন্তু আমার হাসবেন্ড এর বিয়ের আগে থেকেই নিয়ত আমাকে কোনো অধিকার দিবে না।
২) আমি তাকে বিয়ের ৪ দিন পরে জিজ্ঞেস করি যে, আচ্ছা তুমি তো আমাকে কোনো অধিকার দাও নাই। তাই না? তখন আমার হাসবেন্ড ম্যাসেজ এ বলছে যে, 'না দেই নাই তো'। ম্যাসেজ এ লিখলে হবে? নাকি মুখে উচ্চারণ করে বলতে হবে অধিকার না দেয়ার কথা?
৩) যখন সাইন করেছে তখন কিছু লিখা ছিল না। বিয়ে পড়ানোর পরে কাজি লিখেছে বাড়িতে যেয়ে। আমার জামাই না দেখেই সাইন করেছে কিন্তু আমি পরে কাজির থেকে সিউর হয়েছি উনি বিয়ে পড়িয়ে লিখেছিলেন এই ১৮ নং কলাম। এখন আমি কি অধিকার পাবো?
৪) এখন এই অধিকার না দেয়া কি বিয়ের দিন থেকে ধরা হবে? নাকি বিয়ের ৪ দিন পর থেকে ধরা হবে? যেহেতু বিয়ের ৪ দিন পরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু তার মনে বিয়ের আগে থেকেই নিয়ত ছিল আমাকে কোনো অধিকার দিবে না।
৫)আপনাদের সাইটে এক একবার এক একটা উত্তর দেয় এআই। আমাদের মত অজ্ঞরা কি করব দয়া করে উত্তর দিন।
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী ফিকহের আলোকে বিবাহের কাবিননামার ১৮ নং কলাম (তালাকের অধিকার প্রদান) একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এই অধিকার স্বামী স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে স্ত্রীকে প্রদান করেন। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হলো:
১) আপনি কি তালাকের অধিকার পাবেন?
-
হানাফি ফিকহের মূলনীতি: তালাকের অধিকার (তাফউইজ) প্রদানের জন্য স্বামীর স্পষ্ট ও সচেতন সম্মতি আবশ্যক। যদি স্বামী আগে থেকেই জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাক্ষর করে থাকেন, তাহলে তা বৈধ বলে গণ্য হয়। কিন্তু আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে:
- আপনার স্বামী বিয়ের আগেই জানতেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি এই অধিকার দেবেন না।
- কাজী ইজাব-কবুলের পর কাবিননামা লিখেছেন এবং আপনার স্বামী স্বাক্ষর করেছেন যখন কলামটি খালি ছিল (কারণ তিনি ভেবেছিলেন কাজী জিজ্ঞাসা করবেন)।
- আপনার স্বামীর নিয়ত ও ইচ্ছা ছিল অধিকার না দেওয়ার; তিনি অজান্তে বা ধোঁকায় স্বাক্ষর করেছেন।
ফলাফল: যেহেতু স্বামীর সচেতন ও স্বেচ্ছামূলক সম্মতি ছিল না, এবং তিনি পরে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন (ম্যাসেজে), তাই এই অধিকার আপনার জন্য প্রযোজ্য হবে না। তবে বিষয়টি জটিল, তাই একজন নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি ফতোয়া নেওয়া উত্তম।
২) ম্যাসেজে ‘না দেই নাই তো’ বলায় কি অধিকার না দেওয়া প্রমাণিত হয়?
- হানাফি ফিকহে: লিখিত বা মৌখিক উভয় মাধ্যমেই স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য, যদি তা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হয়।
- আপনার স্বামীর ম্যাসেজ “না দেই নাই তো” দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি অধিকার দিতে রাজি নন বা দেননি। এটি তার অস্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে, তবে এটি শুধু অস্বীকার; অধিকার প্রত্যাখ্যানের জন্য তাকে স্পষ্টভাবে বলতে হতো, “আমি এই অধিকার বাতিল করছি” বা “আমি তালাক দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে নিচ্ছি”। সুতরাং ম্যাসেজটি তার ইচ্ছা প্রকাশ করে কিন্তু আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যান নয়।
৩) স্বাক্ষরের পর কাজী বাড়িতে গিয়ে কলাম পূরণ করায় অধিকার বৈধ হবে কি?
- নীতিগতভাবে: স্বাক্ষর করার সময় কলামটি খালি থাকলে এবং পরে পূরণ করা হলে, তা স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হয়। যেহেতু স্বামী জানতেন না এবং তার সম্মতি ছিল না, তাই এটি বৈধ হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে প্রমাণ জরুরি যে স্বাক্ষরের সময় কলাম খালি ছিল এবং স্বামী অজ্ঞাত ছিলেন।
৪) অধিকার না দেওয়ার সময় কবে থেকে গণ্য হবে?
- আপনার স্বামীর নিয়ত বিয়ের আগে থেকেই ছিল অধিকার না দেওয়ার। কিন্তু যেহেতু তিনি বিয়ের দিন আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি, তাই বিয়ের দিন থেকে নয়, বরং চার দিন পর যখন আপনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন এবং তিনি ম্যাসেজে ‘না’ বলেছেন, সেটি থেকে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তবে ইসলামি ফিকহে ‘নিয়ত’ গোপনে থাকলে তা কার্যকর হয় না; প্রকাশ্যে বলতে হয় বা লিখতে হয়। তাই বিয়ের দিন থেকে অধিকার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।
৫) আপনার জন্য পরামর্শ:
- আপনি সরাসরি আলেমের শরণাপন্ন হোন: আপনার বিবরণে জটিলতা আছে (স্বাক্ষরের সময় কলাম খালি, পরে পূরণ, স্বামীর পূর্ব নিয়ত ইত্যাদি)। তাই কোনো স্থানীয় মুফতি বা ইসলামি স্কলারের কাছে পূর্ণাঙ্গ কাবিননামা ও ঘটনা তুলে ধরে ফতোয়া নিন।
- স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করুন: বিষয়টি স্বচ্ছভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন। যদি তিনি অধিকার দিতে রাজি না হন, তাহলে আপনি তালাক চাইতে পারেন (খুলা) অথবা অন্য কোনো সমাধান বের করতে পারেন।
- কাজীর ভূমিকা: কাজীর উচিত ছিল স্বামীর স্পষ্ট সম্মতি নেওয়া। তার ভুলের কারণে আপনার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আপনি ইচ্ছা করলে কাজীকে বিষয়টি জানাতে পারেন।
উপসংহার:
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, আপনার স্বামীর সচেতন সম্মতি ও ইচ্ছা না থাকায় ১৮ নং কলামের অধিকার আপনার জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে ম্যাসেজে ‘না দেই নাই’ বলায় তা প্রত্যাখ্যান নয়, বরং অস্বীকার। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য একজন বিশ্বস্ত মুফতির সরাসরি ফতোয়া নেওয়া জরুরি।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।