অনিয়মিত সালাত আদায়কারী ব্যক্তির বিধান কি ?

Miscellaneous Fiqh · Shafei

Questioner: Rased Hasan
Question Asked: 03 Jun 2026, 06:30 AM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 06:41 AM
Views: 43
This answer is according to the 'Shafei' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন ৩৫ বছর বয়সী বিবাহিত মুসলিম যুবক, যিনি চার বছর বয়সী এক পুত্রসন্তানের জনক। তিনি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজের সন্তানকে কুরআনের হাফেজ বানানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে অলসতাবশত তিনি ইসলামের বিধি-বিধান ও মৌলিক ইবাদতগুলো ঠিকমতো পালন করতেন না; বছরে মাত্র ২/৪ বার বা জীবনে খুব অল্প ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছেন।
কিছুদিন আগে তিনি নিজের পিতাকে বৈদ্যুতিক শক থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। বর্তমানে তাঁর পিতা জীবিত আছেন এবং যুবকের জানাজা শেষে তাঁকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হচ্ছে যে:
১. নামাজ না পড়ার কারণে যেখানে মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যের হাদিস রয়েছে, সেখানে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?
২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা?
৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কিনা?
৪. তাঁর পরিবার যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে কিনা?

বিঃদ্রঃ উক্ত যুবক হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল। আর আমি প্রশ্নকারি সালাফী মানহাজ অনুসরণ করি। তাঁর পরিবারের অনান্য সদস্য গন হানাফী মাযহাবের। প্রশ্ন কারির নিকট আত্মীয় উক্ত যুবক। প্রশ্ন কারি, উক্ত যুবক এর জন্য দুয়া করতে পারবেন কিনা? পরিবারের অনান্য সদস্য যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাঁরা দুয়া করতে পারবেন কিনা?

Answer

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

উত্তর :
প্রশ্নে উল্লেখিত যুবক ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন, কুরআন হাফেজ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন এবং পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে তিনি নামাজের ব্যাপারে অলস ছিলেন। নিচে কুরআন, সহিহ হাদিস ও শাফেঈ মাযহাবের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১. নামাজ না পড়ার কারণে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?

শাফেঈ মাযহাবের মত :
শাফেঈ মাযহাবে অলসতাবশত নামাজ পরিত্যাগকারী (যে ব্যক্তি নামাজের ফরজিয়ত অস্বীকার করে না) সে কাফির হয় না, বরং সে বড় পাপী (ফাসিক) মুসলিম। ইমাম নববী (রহ.) বলেন :

"নামাজ ত্যাগকারী যদি তা অবহেলা ও অলসতার কারণে হয়, তবে সে কাফির হবে না—এটাই সাহাবা, তাবিয়িন ও পরবর্তী ইমামদের মত।" (আল-মাজমু', ৩/১৬)

হাদিসে "যে নামাজ ত্যাগ করল সে কুফরি করল" (মুসলিম, ৮২) – এখানে কুফর অর্থ কঠিন পাপ, ধর্মত্যাগ নয়। (শরহে মুসলিম, নববী)

অতএব এই যুবক মুসলিম হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেছেন। তার শেষ পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছাধীন; তিনি তাকে ক্ষমা করতে পারেন অথবা তার পাপের শাস্তি জাহান্নামে দিতে পারেন, কিন্তু চিরস্থায়ী জাহান্নাম নয়। পিতাকে বাঁচানোর কাজটি একটি সওয়াবের কাজ, যা তার ক্ষমার কারণ হতে পারে। (সূরা আল-মায়িদা: ৩২; বুখারি, ৩২৯৭)


২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি?

হ্যাঁ, আছে।
যেহেতু তিনি মুসলিম ছিলেন এবং তাওহিদ ও ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই ক্ষমার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ বলেন :

"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করলে ক্ষমা করেন না, আর এছাড়া (অন্যান্য পাপ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)

ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন : "আহলে কিবলার কোনো পাপীই জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না, যদি সে তাওহিদের ওপর মৃত্যুবরণ করে।" (আল-উম্ম, ১/২২২)

পিতাকে বাঁচানোর ঘটনা তার জন্য সুপারিশ হতে পারে। রাসূল (সা.) বলেন : "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে দুনিয়ার বিপদ থেকে উদ্ধার করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন।" (বুখারি, ২৪৪২)


৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কি?

জি, অবশ্যই করা যাবে।
মৃত মুসলিমের জন্য দোয়া করা সুন্নত ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন :

"হে আমাদের রব, আমাদের এবং আমাদের আগে ঈমানদারদের ক্ষমা করুন।" (সূরা আল-হাশর: ৫৯:১০)

রাসূল (সা.) বলেছেন : "তোমরা তোমাদের মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।" (আবু দাউদ, ৩২০১; সহিহ)

প্রশ্নকারী (সালাফি মানহাজ) এবং পরিবারের অন্য সদস্য (হানাফি)—সকলেই তার জন্য দোয়া করতে পারবেন। দোয়া মৃতের উপকারে আসে। শাফেঈ মাযহাবে মৃতের জন্য দোয়া, ইসকাত-ই-সওয়াব ইত্যাদি বৈধ। (তুহফাতুল মুহতাজ, ৩/১৯১)


৪. তাঁর পরিবার যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে কি?

হ্যাঁ, উপকারে আসবে।
সহিহ হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করল : "আমার মা মারা গেছেন, আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে তা কি তার উপকারে আসবে?" তিনি বললেন : "হ্যাঁ।" (বুখারি, ২৭৫৬; মুসলিম, ১০০৪)

শাফেঈ মাযহাবের কিতাব মুহাজ্জাবমাজমু'-এ বলা হয়েছে : "মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করা, হজ করা, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া প্রেরণ করা—এসব মৃতের কাছে পৌঁছে এবং তার উপকার হয়।" (আল-মাজমু', ৫/২৮০)

সুতরাং পরিবারের পক্ষ থেকে তার জন্য দান-সদকা করা যেতে পারে এবং তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। তবে নামাজের কাজা আদায় করা সম্ভব নয়; ফকিহরা নামাজের কাজা মৃতের পক্ষ থেকে আদায়যোগ্য মনে করেন না। (শাফেঈ মতে)


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | উত্তর | |------|-------| | মৃত্যুর পর তার অবস্থান | মুসলিম হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেছেন; পাপের শাস্তি পেতে পারেন, কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। | | ক্ষমার সম্ভাবনা | আছে—ঈমান ও পিতার জীবন রক্ষার কারণে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। | | দোয়া | সকলের জন্য বৈধ; দোয়া তার উপকারে আসবে। | | দান-সদকা | বৈধ ও উপকারী; তার জন্য ইসওয়াব পৌঁছে। |

উপদেশ : পরিবারের উচিত তার জন্য বেশি বেশি দোয়া, ইসতিগফার ও সদকা করা। আল্লাহ তার দোষগুলো ক্ষমা করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।

রেফারেন্সসমূহ

  • কুরআন: সূরা আন-নিসা ৪:৪৮, সূরা আল-হাশর ৫৯:১০, সূরা আল-মায়িদা ৫:৩২।
  • হাদিস: মুসলিম ৮২, বুখারি ২৭৫৬ ও ২৪৪২, আবু দাউদ ৩২০১।
  • শাফেঈ কিতাব: আল-মাজমু' (ইমাম নববী) ৩/১৬ ও ৫/২৮০, আল-উম্ম (ইমাম শাফেঈ) ১/২২২, তুহফাতুল মুহতাজ (ইবনে হাজার হায়তামি) ৩/১৯১।

আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.