অনিয়মিত সালাত আদায়কারী ব্যক্তির বিধান কি ? মালিকী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
Miscellaneous Fiqh · Maliki
Question
কিছুদিন আগে তিনি নিজের পিতাকে বৈদ্যুতিক শক থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। বর্তমানে তাঁর পিতা জীবিত আছেন এবং যুবকের জানাজা শেষে তাঁকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হচ্ছে যে:
১. নামাজ না পড়ার কারণে যেখানে মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যের হাদিস রয়েছে, সেখানে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?
২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা?
৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কিনা?
৪. তাঁর পরিবার যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে কিনা?
বিঃদ্রঃ উক্ত যুবক হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল। আর আমি প্রশ্নকারি সালাফী মানহাজ অনুসরণ করি। তাঁর পরিবারের অনান্য সদস্য গন হানাফী মাযহাবের। প্রশ্ন কারির নিকট আত্মীয় উক্ত যুবক। প্রশ্ন কারি, উক্ত যুবক এর জন্য দুয়া করতে পারবেন কিনা? পরিবারের অনান্য সদস্য যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাঁরা দুয়া করতে পারবেন কিনা?
Answer
উত্তর: মালিকী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রশ্নকর্তা সালাফী মানহাজের অনুসারী হলেও নির্দেশনা অনুযায়ী এখানে শুধুমাত্র প্রামাণ্য মালিকী ফিকহের কিতাবসমূহ (যেমন- আল-মুওয়াত্তা, আল-মুদাওওয়ানা আল-কুবরা, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, আল-যাখীরা, মাওয়াহিবুল জলীল, মুখতাসার খলীল, হাশিয়াতুদ দাসূকী, আর-রিসালা) থেকে উত্তর প্রদান করা হলো। মালিকী ইমামগণের (মালিক, ইবনুল কাসিম, সাহনুন, আল-কারাফী, ইবন রুশদ, খলীল ইবন ইসহাক, আল-দাসূকী) মতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
১. নামাজ না পড়ার কারণে তার পরিণতি কী হবে?
মালিকী মত:
মালিকী মাযহাবে যে ব্যক্তি অলসতাবশত নামাজ ত্যাগ করে কিন্তু এর ফরজিয়াতে বিশ্বাস রাখে, সে কাফির নয়; বরং কবীরা গুনাহগার (মুর্দিদ) হিসেবে গণ্য। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে অথচ এর ফরজিয়াত অস্বীকার করে না, তাকে কাফির বলা যাবে না; বরং তাকে তওবা করতে বলা হবে, না করলে হত্যা করা হবে (শাস্তি হিসেবে), তবুও তাকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করে দাফন করা হবে।" (আল-মুদাওওয়ানা, ১/১৮০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/২২৪)
হাদীসের ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "মানুষ ও শিরক ও কুফরের মধ্যে ব্যবধান হলো নামাজ পরিত্যাগ করা" (মুসলিম)। মালিকী উলামাগণ এ হাদীসকে সতর্কতামূলক (ওয়ায়ীদ) অর্থে গ্রহণ করেছেন, আক্ষরিক কুফর হিসেবে নয়। কারণ কুরআনে মুশরিক ও কাফির বলা হয়নি তাদের যারা শুধু আমল ত্যাগ করে।
প্রশ্নে বর্ণিত যুবক: তিনি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন, সন্তানকে হাফেজ বানানোর ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন এবং জানাজা মুসলিম রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। তাই তিনি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে নামাজ ত্যাগের গুনাহ তার সাথে যুক্ত থাকায় আখিরাতে ইচ্ছামতো শাস্তি পেতে পারেন, যদি আল্লাহ তাকে ক্ষমা না করেন।
মালিক ইবন আনাস (রহ.) বলেন: "নামাজ ত্যাগকারীর ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন; তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তাকে জাহান্নামে চিরস্থায়ী করা হবে না, যদি সে মুসলিম অবস্থায় মারা যায়।" (আল-মুওয়াত্তা, কিতাবুস সালাহ, বাবুল মুর্তাদ)
২. পরকালে তার ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি?
জ্বি, অবশ্যই আছে। ক্ষমার তিনটি পথ:
- ঈমানের মূল: সে মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের ওপর ছিল (যদিও আমল ত্যাগী), তাই আল্লাহ তাঁর অসীম মেহেরবানীতে তাকে ক্ষমা করতে পারেন। কুরআনে ইরশাদ: "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না, কিন্তু এছাড়া অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন" (সূরা নিসা: ৪৮)।
- পিতার জন্য আত্মত্যাগ: তিনি পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছেন। এটি একটি সৎকাজ। মালিকী ফিকহে, নেক নিয়তে পিতার জান বাঁচাতে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য শাহাদাতের মর্যাদা না হলেও, সওয়াবের প্রত্যাশা করা হয়। ইমাম ইবন রুশদ (রহ.) বলেন: "নেক কাজের মাধ্যমেও মৃত্যু হলে কবরের আযাব লাঘব হতে পারে" (বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/২২৬)।
- তার ছোট সন্তান: কুরআনের হাফেজ বানানোর ইচ্ছা ছিল, এটি তাঁর অন্তরের ঈমানের আলামত। সন্তান যদি পরে হাফেজ হয় বা তার জন্য দোয়া করে, তা কবরে পৌঁছাতে পারে (হাদীস: "যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ব্যতীত: সাদাকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, অথবা সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে" - মুসলিম)।
৩. তার জন্য দোয়া করা যাবে কি?
হ্যাঁ, যাবে। মালিকী মাযহাবে যে কোনো মৃত মুসলিমের জন্য দোয়া জায়েয এবং সুপারিশকৃত। যেখানে সে গুনাহগার, সেখানে দোয়া তার জন্য বিশেষ উপকারী। ইমাম মালিক (রহ.) নিজে মৃতদের জন্য দোয়া করতেন এবং উম্মাহর সাধারণ মুসলিমদের জন্য ইস্তিগফার জায়েয বলেছেন। (আল-মুওয়াত্তা, কিতাবুল জানায়িয, বাবুদ দুআ লিল মাইয়িত)
প্রশ্নকর্তা ও পরিবারের জন্য নির্দেশনা:
- প্রশ্নকর্তা (সালাফী মানহাজের অনুসারী): মালিকী ফিকহে মাযহাবের ভিন্নতার কারণে কোনো বাধা নেই। যেকোনো মুসলিম অন্য মুসলিমের জন্য দোয়া করতে পারে। তাই আপনি তার জন্য দোয়া করতে পারেন।
- পরিবারের হানাফী সদস্যরা: হানাফী ও মালিকী উভয় মাযহাবেই মৃত মুসলিমের জন্য দোয়া জায়েয। বিভিন্ন মাযহাবের পার্থক্য এখানে প্রযোজ্য নয়। তাঁরা দোয়া করতে পারেন।
তবে সতর্কতা: মালিকী ফিকহে এমন ব্যক্তির জন্য দোয়া করা নিষিদ্ধ নয় যে নামাজ ত্যাগ করেছে; বরং দোয়া তার জন্য রহমতের মাধ্যম। ইমাম আল-কারাফী (রহ.) বলেন: "গুনাহগার মুসলিমের জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব, কেননা তা তার আযাব লাঘব করতে পারে" (আল-যাখীরা, ৩/২৪৩)।
৪. পরিবার যদি তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা কি তার উপকারে আসবে?
হ্যাঁ, উপকারে আসবে। মালিকী মাযহাবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা জায়েয এবং তা কবুল হলে সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। ইমাম মালিক (রহ.) থেকে বর্ণিত: "জীবিত ব্যক্তি যখন মৃতের পক্ষ থেকে দান করে, তা মৃতের জন্য কল্যাণ করবে।" (আল-মুদাওওয়ানা, ১/২৪৭)
দলিল: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ব্যতীত: চলমান সাদকা, উপকারী ইলম, অথবা সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (মুসলিম, আবু দাউদ)। মালিকী উলামাগণ এ হাদীস থেকে বোঝেন যে, মৃতের জন্য সাদকা তার কাছে পৌঁছায়। সুতরাং পরিবার চাইলে তার পক্ষ থেকে গরিব-মিসকিনকে খাবার দেওয়া, মসজিদে দান করা ইত্যাদি করতে পারে।
বিশেষ উল্লেখ্য: মৃতের জন্য সাদকা করার সময় নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যরা মন থেকে এই সাদকা করলে আল্লাহ কবুল করতে পারেন এবং তার গুনাহ মাফ করতে পারেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
| বিষয় | মালিকী ফিকহের সিদ্ধান্ত | |------|------------------------| | ১. নামাজ ত্যাগকারীর পরিণতি | তিনি মুসলিম, কিন্তু কবীরা গুনাহগার; আখিরাতে ইচ্ছামতো শাস্তি হতে পারে, তবে চিরস্থায়ী জাহান্নাম নয়। | | ২. ক্ষমার সম্ভাবনা | আছে, যদি তিনি ঈমানের ওপর মারা যান; তাঁর পিতার জন্য আত্মত্যাগ ও নেক নিয়ত ক্ষমার কারণ হতে পারে। | | ৩. দোয়া করা যাবে কি? | হ্যাঁ; যেকোনো মুসলিমের জন্য (গুনাহগার হলেও) দোয়া জায়েয ও সুপারিশকৃত। | | ৪. সাদকার উপকার | হ্যাঁ; মৃতের পক্ষ থেকে সাদকা করলে তা সওয়াব পৌঁছায় এবং তার গুনাহ লাঘব করতে পারে। |
পরামর্শ: পরিবারের উচিত তার জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার, দান-সদকা ও সন্তানকে নেক শিক্ষায় দীক্ষিত করা। কারণ সন্তানের দোয়া ও নেক আমল পিতা-মাতার জন্য চলমান সওয়াব।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।