নাসিখ ও মানসুখ নিয়ে মতপার্থক্যর কারণ কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: GOLAM OHIB
Question Asked: 03 Jun 2026, 09:09 PM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 09:21 PM
Views: 61
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ।
কুরআনের আয়াত নিয়ে দেখলাম কোন কোন আলেমের মতে একটি আয়াত নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন মানসুখ কেউ বলেছেন নাসিখ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম কি এই বিষয়ে পরিপূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়ে যান নি? দ্বীন ত পরিপূর্ণ। তাহলে এর হেকমত কি?

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة

প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন, যা দ্বীনের পরিপূর্ণতা ও ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়।

দ্বীনের পরিপূর্ণতা ও মতপার্থক্যের হেকমত

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।"
(সূরা মায়িদা: ৩)

এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যে দ্বীন পরিপূর্ণ। কিন্তু এই পরিপূর্ণতা মানে এই নয় যে প্রতিটি ছোট-বড় মাসআলার ব্যাখ্যা এককভাবে এবং সুস্পষ্টভাবে কুরআন-হাদীসের নসে বিদ্যমান থাকবে। বরং পরিপূর্ণতা হলো দ্বীনের মূলনীতি, আহকাম ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগ ও পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। ইজতিহাদ ও মতপার্থক্য দ্বীনের অপূর্ণতা নয়, বরং এরই অংশ।

নাসিখ-মানসুখ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তবে নাসিখ-মানসুখ (রহিত ও রহিতকারী) বিষয়টি মূলত নাযিলের ধারাবাহিকতা ও সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পর্কিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কিরাম (রা.) সরাসরি তাঁর কাছে জানতে পারতেন কোন আয়াত নাসিখ আর কোনটি মানসুখ। কিন্তু পরে যখন ইসলামের ভৌগোলিক সীমা বেড়ে যায়, তখন সাহাবা ও তাবেঈনের ইজতিহাদে কিছু আয়াতকে নাসিখ বা মানসুখ নির্ধারণে মতপার্থক্য দেখা দেয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্পষ্টভাবে সব বিষয় বলে দেওয়া প্রয়োজন ছিল না, বরং ইজতিহাদের পথ খোলা রাখা এর অন্যতম হেকমত। যেমন:

  • হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন কোনো বিচারক নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তার জন্য দ্বিগুণ সওয়াব। আর যদি ভুল করে, তার জন্য এক সওয়াব।" (বুখারী, মুসলিম)

অতএব, ইজতিহাদী মতপার্থক্য দ্বীনের দুর্বলতা নয়, বরং দ্বীনের গভীরতা ও বিজ্ঞানসম্মত চর্চার প্রমাণ।

আলেমদের মতপার্থক্যের হেকমত

১. দ্বীনের সংরক্ষণ ও সহজতা:
ইমামদের মতপার্থক্য উম্মতের জন্য রহমতস্বরূপ। যেমন ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন: "আলেমদের ইখতিলাফ উম্মতের জন্য রহমত।"

২. ইজতিহাদের দরজা উন্মুক্ত রাখা:
দ্বীনের অনেক বিষয়ে নসের পরিমাণ সীমিত, কিন্তু পরিস্থিতি অসীম। তাই ইজতিহাদের মাধ্যমে নস থেকে আহকাম বের করার পদ্ধতি কুরআন-হাদীসেই নির্ধারিত হয়েছে। ইজতিহাদ বন্ধ হলে দ্বীন স্থবির হয়ে যেত।

৩. উম্মতের সামর্থ্যানুযায়ী দায়িত্ব:
আল্লাহ বলেন: "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
অতএব, প্রতিটি যুগের আলেমরা নিজ নিজ জ্ঞান, ফিকহি উসুল ও দলিলের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করেন। তাই নিজ যুগের প্রেক্ষাপটে তাদের ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য।

নাসিখ-মানসুখের মতপার্থক্যের কারণ

১. নাযিলের সময় ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জ্ঞানের ভিন্নতা:
কোন আয়াত আগে নাযিল হয়েছে, পরে কোনটি, তা জানা সবসময় সহজ নয়। তাই কোনো আয়াতকে কেউ নাসিখ আবার কেউ মানসukh বলতে পারেন।

২. উসুলে ফিকহের পার্থক্য:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর উসুলে কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি ইজমা, কিয়াস, ইস্তিহসান ইত্যাদির ব্যবহার রয়েছে। তাই নাসিখ-মানসুখের ক্ষেত্রেও তাদের নিজস্ব উসুল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে।

৩. ব্যাখ্যার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য:
কোনো আয়াতকে কেউ আম (সাধারণ) আবার কেউ খাস (বিশেষ) বলতে পারেন। এ থেকে নাসিখ-মানসুখের মতভেদ সৃষ্টি হয়।

হানাফি কিতাবের রেফারেন্স

  • কুরআন: সূরা মায়িদা: ৩ (দ্বীনের পরিপূর্ণতা)
  • হাদীস: ইমাম বুখারী ও মুসলিমের হাদীস (ইজতিহাদ ও সওয়াব)
  • ফিকহের উসুল:
    • আল-হিদায়া: ইমাম আলী ইবনে আবী বকর আল-মারগীনানী (রহ.) লিখেছেন, নাসিখ-মানসুখ নির্ধারণে উসুল ও ইজতিহাদের গুরুত্ব অপরিসীম।
    • রদ্দুল মুহতার: ইবনে আবেদীন (রহ.) নাসিখ-মানসুখের মতপার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, এবং ইমামদের ইজতিহাদকে সম্মান জানিয়েছেন।
    • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরি): এখানে নাসিখ-মানসুখের নীতিমালা এবং হানাফি মাযহাবের অবস্থান স্পষ্টভাবে বর্ণিত।
    • উসুলুশ শাশী: নাসিখ-মানসুখের উসুল ও ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সারকথা

  • দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার অর্থ এই নয় যে ইজতিহাদ ও মতপার্থক্যের কোনো জায়গা নেই। বরং দ্বীনের মধ্যে ইজতিহাদ করার পদ্ধতি ও দলিলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের মূলনীতি ও পদ্ধতি দিয়েই গেছেন, যা থেকে ইজতিহাদ করে মাসআলা বের করা সহজ হয়েছে।
  • আলেমদের মতপার্থক্য উম্মতের জন্য রহমত, এবং এটি দ্বীনের সংরক্ষণ ও সহজতার মাধ্যম।

আল্লাহ আমাদের সঠিক বোঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.