মেয়েদের চাকরি করা প্রসঙ্গে
Business and Job · Hanafi
Question
একটু মনোযোগ দিয়ে পড়বেন উস্তাদ একটা মেয়ে ছোট থেকেই ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড ছিলো। ভালো ছাত্রী ছিলো তাই তার ও তার বাবা মায়ের অনেক আশা ছিলো যে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে। সরকারী নার্সিং কলেজে চান্স পেয়েছে এবং ১ বছর পড়ার পর আল্লাহ মেয়েটাকে হেদায়েত দিয়েছে। মেয়েটার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালোনা কোনোমতে সংসার চলে। মেয়েটার এখন পড়াশোনা শেষ এবং দ্বীনের বুঝ আসায় সে চাকরি করতে চায়না।মেয়েটা অনেক দোয়া করে যাতে তার একজন দ্বীনদ্বার ছেলের সাথে বিয়ে হয় যাতে সে পর্দা মেইনটেইন করতে পারে আর তাকে চাকরি করতে না হয়। কিন্তু মেয়েটার এখনো বিয়ে হয়নি। তার বাড়িতে থাকা এখন তার জন্য খুবই অসহনীয় হয়ে পড়েছে, যেহেতু তার যাওয়ার আর কোনো জায়গাও নেই। বাবা মাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছে কিছুতেই বুঝেনা তারা বলে পর্দা করে কি চাকরি করা যায়না! মেয়েটার বাবা তাকে এখন অনেক ফোর্স করতেছে কোনো হস্পিটালে জয়েন করার জন্য। সে খুবই মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, কান্নাকাটি করে শুধু।বাড়িতে থেকেও শান্তি পাচ্ছে না। কি করবে মেয়েটি এখন উস্তাদ? সে কিছু বুঝতে পারছে না কি করবে। পরামর্শ দিন উস্তাদ।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ যে, আপনি দ্বীনের পথে ফিরে এসেছেন এবং পর্দা ও হালাল রিজিকের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন। এটি আপনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। আপনার বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন, তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু সমাধান ও পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
১. পর্দার গুরুত্ব বুঝুন এবং দ্বীনের উপর অটল থাকুন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
(সূরা আন-নূর: ৩১)
অর্থ: "মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত করবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযাত করবে এবং তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া।"
নার্সিং পেশায় সাধারণত পর্দা রক্ষা করা কঠিন, বিশেষ করে পুরুষ রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে। তবে যদি নার্সিং শুধুমাত্র মহিলা সেকশনে হয় এবং পর্দার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তা জায়েয হতে পারে। কিন্তু দেশের সাধারণ হাসপাতাল ব্যবস্থায় তা প্রায় অসম্ভব। তাই আপনি চাইলে মহিলা মাদরাসা, মহিলা স্কুল বা ঘরে বসে নার্সিং-সম্পর্কিত কাজ (যেমন: অনলাইন কনসালটেশন, স্বাস্থ্য পরামর্শ) করতে পারেন, যেখানে পর্দা রক্ষা সম্ভব।
২. বাবা-মাকে বোঝানোর সঠিক পদ্ধতি
বাবা-মা আপনার কল্যাণ চান, কিন্তু তারা দ্বীনের গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি। তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলুন। কুরআন ও হাদীসের আলোকে পর্দার গুরুত্ব বুঝান। যেমন:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ
(সহীহ বুখারী: ৫২)
অর্থ: "নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট।"
আপনি যদি পিতামাতাকে বলেন: "আমি আপনার সন্তান, আপনি আমার কল্যাণ চান। কিন্তু আমি যদি আল্লাহর নাফরমানী করি, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় আমার ক্ষতি হবে। দয়া করে আমাকে হালাল রিজিকের সন্ধান দিতে সাহায্য করুন।"
৩. বিয়ে ও স্বামীর সন্ধান করুন
আপনার জন্য উত্তম উপায় হলো এমন একজন দ্বীনদার স্বামী খোঁজা, যিনি আপনাকে পর্দা রক্ষা করতে সাহায্য করবেন এবং আর্থিকভাবে সক্ষম হবেন। আপনি বলেন, আপনি বিয়ের জন্য দোয়া করছেন। আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করে এবং মসজিদের ইমাম বা নির্ভরযোগ্য ইসলামি সংগঠনের মাধ্যমে পাত্র খোঁজার চেষ্টা করুন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
(তিরমিজি: ১০৮৫)
অর্থ: "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিবাহ করিয়ে দাও।"
৪. ঘরে অবস্থান করুন এবং ধৈর্য ধরুন
জোর করে চাকরি করতে বাধ্য করা হলে, আপনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করতে পারেন। কারণ, মা-বাবার আনুগত্য ওয়াজিব, তবে আল্লাহর নাফরমানীতে নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
(মুসনাদে আহমাদ: ১০৯৫)
অর্থ: "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।"
আপনার বাবা যদি খুব চাপ দেন, তাহলে আপনি নরমভাবে বলতে পারেন: "আব্বু, আমি চাকরি করতে পারব না, কারণ এতে আমার পর্দা নষ্ট হবে। আমি বরং ঘরে বসে সেলাই বা অনলাইনে কাজ করার চেষ্টা করব, যাতে পরিবারের উপকার করতে পারি।"
৫. দ্বীনি পরিবেশে চলে যান
যদি বাড়ির পরিবাস অসহনীয় হয় এবং বিয়ের ব্যবস্থা না হয়, তাহলে আপনি কোনো মহিলা মাদরাসা বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিতে পারেন। সেখানে থাকার ব্যবস্থা থাকলে পর্দার সাথে থাকতে পারবেন এবং দ্বীনের কাজও করতে পারবেন। অনেক মাদরাসায় নার্সিং জ্ঞানসম্পন্ন মহিলা শিক্ষকের প্রয়োজন হয়।
৬. সর্বদা দোয়া ও ইস্তেখারা করুন
আল্লাহর কাছে কান্না করে দোয়া করুন। আপনার মতো অসংখ্য নারী এই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং আল্লাহ তাদের পথ দেখিয়েছেন।
সূরা নূরের আয়াত:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
(সূরা আত-তালাক: ২)
অর্থ: "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (উত্তীর্ণ) পথ বের করে দেন।"
৭. বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করুন
নার্সিং ডিগ্রি থাকলে আপনি মহিলা স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করতে পারেন—যেমন: মহিলা ক্লিনিকে চাকরি (যেখানে শুধু মহিলা রোগী আসে), অথবা হোম নার্সিং (শুধু মহিলা রোগীর জন্য)। অথবা প্রাইভেট টিউশনি বা অনলাইন স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে উপার্জন করতে পারেন।
উপসংহার
আপনার কর্তব্য হলো:
- পর্দার উপর অটল থাকা—যে কোনো মূল্যে চাকরি না করা যদি পর্দা রক্ষা সম্ভব না হয়।
- বিয়ের জন্য চেষ্টা করা—একজন দ্বীনদার স্বামী খোঁজা।
- বাবা-মাকে নম্রভাবে বোঝানো।
- বিকল্প হালাল আয়ের ব্যবস্থা করা।
- সবর ও দোয়া করা।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আপনার জন্য সহজ পথ তৈরি করুন এবং দ্বীনের উপর অটল রাখুন। আমীন।
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা আন-নূর (৩১), সূরা আত-তালাক (২)
- হাদীস: সহীহ বুখারী (৫২), তিরমিজি (১০৮৫), মুসনাদে আহমাদ (১০৯৫)
- হানাফী ফিকহ: রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭৮), ফাতাওয়া উসমানী (২/৪২০)