ইসলামে সন্তান সংখ্যা নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: ইসলামে সন্তান সংখ্যা নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কি? যেমন কতগুলো সন্তান হবে তা নির্ধারণ করা বা সীমিত করার বিধান কী?
উত্তর:
ইসলামে সন্তান সংখ্যা নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা বাধ্যতামূলক সংখ্যা নেই। তবে কিছু মৌলিক নীতি ও নির্দেশনা রয়েছে, যা হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। নিচে এ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ উল্লেখ করা হলো:
১. সন্তান লাভের প্রতি উৎসাহ
ইসলাম সন্তান লাভকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হলো জীবন-উপকরণ..." (সূরা আল-কাহফ: ৪৬)
এছাড়া হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বহু সন্তান ও বংশবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করেছেন:
"তোমরা বিবাহ করো এবং সন্তান জন্ম দাও, কেননা আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্যের জন্য গর্ব করবো।" (ইবনে মাজাহ: ১৮৪৬; সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪০২৮)
২. সন্তান সংখ্যা নির্ধারণ বা পরিবার পরিকল্পনার বিধান
ইসলামে অর্থনৈতিক বা অন্যান্য বৈধ কারণে সন্তান সংখ্যা নির্ধারণ বা জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুমতি আছে, তবে শর্ত হলো:
- এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (পুরুষের জন্য নসবন্দি বা নারীর জন্য টিউবেক্টমি) না হয়। কারণ এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম (যেহেতু এটি সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়)।
- তবে অস্থায়ী পদ্ধতি (যেমন কনডম, পিল, আইইউডি ইত্যাদি) ব্যবহার করা জায়েজ, যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকে এবং কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না থাকে।
- বিশেষ প্রয়োজন যেমন: মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি, শারীরিক অক্ষমতা, বা সন্তান লালন-পালনে সক্ষমতার অভাব ইত্যাদি কারণে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ বৈধ।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (২/৩৪২) ও ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৩৪১) এ উল্লেখ আছে:
"যদি কোনো ব্যক্তির স্ত্রী বারবার সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে স্বামী তার জন্য 'আজল' (বীর্য বাইরে নিক্ষেপ) করতে পারে।"
সতর্কতা: স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ শুধুমাত্র জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজনে (যেমন জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধে) বৈধ, অন্যথায় তা নাজায়েজ ও কবিরা গুনাহ।
৩. সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব
ইসলাম সন্তান সংখ্যার চেয়ে তাদের সঠিক তালিম ও তরবিয়ত (শিক্ষা-দীক্ষা ও নৈতিক প্রশিক্ষণ) দেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (বুখারি: ৮৯৩; মুসলিম: ১৮২৯)
অতএব, যদি কেউ বেশি সন্তান গ্রহণ করে কিন্তু তাদের লালন-পালন, শিক্ষা ও দ্বীনি প্রশিক্ষণ দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হবে।
৪. হানাফি আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের মতে, সন্তানের সংখ্যা সীমিত করার জন্য অস্থায়ী পদ্ধতি বৈধ, তবে বিনা প্রয়োজনে তা অপছন্দনীয়।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসির মাআরিফুল কুরআন (৬/৫৭৩) এ বলেন: "সন্তান সংখ্যা আল্লাহর মর্জির প্রতি তাওয়াক্কুল রেখে নির্ধারণ করা উচিত। কেবল অর্থনৈতিক চিন্তা করে সন্তান সংখ্যা কমানো মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।"
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফতোয়াসমূহে বলেন: "স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ হারাম। অস্থায়ী পদ্ধতি শুধুমাত্র ওজর (প্রয়োজনীয় কারণ) থাকলে জায়েজ।"
সারসংক্ষেপ ও দিকনির্দেশনা:
- ইসলাম নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দেয়নি, বরং সুস্থ সন্তান ও দায়িত্বশীল পরিবার গঠনে উৎসাহিত করে।
- প্রয়োজন ছাড়া সন্তান সংখ্যা নির্ধারণ বা সীমিত করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)।
- বৈধ কারণ (যেমন মায়ের স্বাস্থ্য, জটিল রোগ, বা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা) থাকলে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ বৈধ।
- স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নাজায়েজ (হারাম), যদি না এটি চিকিৎসার জন্য জরুরি হয়।
- বেশি সন্তান হলে তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি শিক্ষা দেওয়া ওয়াজিব; এ দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে গুনাহ হবে।
সর্বোত্তম পন্থা হলো: আল্লাহর রিজিকের ওপর ভরসা রেখে তাওয়াক্কুল করা, প্রাকৃতিকভাবে সন্তান গ্রহণ করা, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যত সন্তান দান করেন তাদের যথাযথ লালন-পালন ও দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া।