একজন নামাজ ত্যাগকারী মুসলিম যুবক মৃত্যুবরণ করলেন। ইসলামের আলোকে জানুন তার আখিরাতের অবস্থা, ক্ষমার সুযোগ, দোয়া ও সদকার বিধান।

Miscellaneous Fiqh · Hanbali

Questioner: Rased Hasan
Question Asked: 03 Jun 2026, 06:24 AM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 06:43 AM
Views: 57
This answer is according to the 'Hanbali' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন ৩৫ বছর বয়সী বিবাহিত মুসলিম যুবক, যিনি চার বছর বয়সী এক পুত্রসন্তানের জনক। তিনি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজের সন্তানকে কুরআনের হাফেজ বানানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে অলসতাবশত তিনি ইসলামের বিধি-বিধান ও মৌলিক ইবাদতগুলো ঠিকমতো পালন করতেন না; বছরে মাত্র ২/৪ বার বা জীবনে খুব অল্প ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছেন।
কিছুদিন আগে তিনি নিজের পিতাকে বৈদ্যুতিক শক থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। বর্তমানে তাঁর পিতা জীবিত আছেন এবং যুবকের জানাজা শেষে তাঁকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হচ্ছে যে:
১. নামাজ না পড়ার কারণে যেখানে মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যের হাদিস রয়েছে, সেখানে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?
২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা?
৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কিনা?
৪. তাঁর পরিবার যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে কিনা?

বিঃদ্রঃ উক্ত যুবক হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল। আর আমি প্রশ্নকারি সালাফী মানহাজ অনুসরণ করি। তাঁর পরিবারের অনান্য সদস্য গন হানাফী মাযহাবের। প্রশ্ন কারির নিকট আত্মীয় উক্ত যুবক। প্রশ্ন কারি, উক্ত যুবক এর জন্য দুয়া করতে পারবেন কিনা? পরিবারের অনান্য সদস্য যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাঁরা দুয়া করতে পারবেন কিনা?

Answer

প্রশ্নোত্তর: নামাজ না পড়া মুসলিমের পরিণতি ও দোয়া করার বিধান

ভূমিকা

প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে ফয়সালা দিতে পারি না। এটি শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার এখতিয়ার। আমরা শুধু কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে সাধারণ নীতিমালা এবং বিধান বর্ণনা করতে পারি।

১. নামাজ না পড়ার কারণে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?

নামাজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ pillar এবং এটি মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যকারী ইবাদত। নিম্নোক্ত হাদীসগুলো এ বিষয়ে আলোকপাত করে:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ" "মানুষ ও শিরক ও কুফরের মধ্যে ব্যবধান হলো নামাজ ত্যাগ করা।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮২)

তিনি আরও বলেছেন: "الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ" "আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে অঙ্গীকার হলো নামাজ। যে ব্যক্তি তা ত্যাগ করল, সে কুফরি করল।" (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস নং ২৬২১; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন)

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি অলসতার কারণে নামাজ ত্যাগ করে, কিন্তু তার গুরুত্ব স্বীকার করে এবং পরিত্যাগকারীকে তিরস্কার করে, সে সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেয়ীনের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগকারী কাফির। ইবনে হাম্বল ও অন্যান্য আলেমদের একটি দলের মতে, যে ব্যক্তি অলসতার কারণে একটি নামাজও ত্যাগ করে, তাকে তওবা করতে বলা হবে; যদি তওবা না করে তবে তাকে হত্যা করা হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২২/৪১-৪২)

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে, সে দুটি অবস্থার একটিতে থাকতে পারে: ১. যদি সে নামাজের ওয়াজিবিতা অস্বীকার করে, তবে সে ইজমা অনুযায়ী কাফির। ২. যদি সে অলসতার কারণে ত্যাগ করে, তবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, সেও কাফির।" (শারহুল মুমতি', ২/২৫)

তবে উল্লেখ্য: প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজের সন্তানকে হাফেজ বানানোর ইচ্ছা পোষণ করতেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি নামাজের ফরজিয়ত অস্বীকার করতেন না, বরং অলসতা ও গাফিলতির কারণে তা আদায় করতেন না।

বিশেষ বিবেচনা:

  • তিনি পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন - এটি একটি সৎকর্ম
  • তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু ইবাদতে গাফিল ছিলেন
  • তাঁর জানাজা ও দাফন মুসলিম রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে (এটি ইঙ্গিত দেয় যে সমাজ তাকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করত)

২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা?

আল্লাহ তা'আলার রহমত অপরিসীম। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

"إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ" "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না; এবং এর নিচে (অন্যান্য পাপ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)

আয়াতটি স্পষ্ট করে যে শিরক ব্যতীত অন্যান্য পাপ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করতে পারেন। নামাজ ত্যাগ করা শিরক না হলে, এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন বিষয়।

ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী, কিন্তু বড় পাপে লিপ্ত, আল্লাহ চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন এবং চাইলে ক্ষমা করতে পারেন। তবে যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে আমার নিকট অধিক ভয়ংকর, কারণ সাহাবীগণ নামাজ ত্যাগ করাকে কুফর বলে গণ্য করতেন।" (আস-সালাত ওয়া আহকামু তারিকিহা)

তবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে তিনি ক্ষমা পাবেন কি পাবেন না। এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা।

৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কিনা?

এ বিষয়ে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

প্রথম দিক: যেহেতু তিনি মুসলিম হিসেবে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে, তাই সাধারণভাবে মুসলিমদের জন্য দোয়া করার নিয়ম প্রযোজ্য।

দ্বিতীয় দিক: যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগকারীকে কাফির গণ্য করে, তাহলে তার জন্য দোয়া করা কি জায়েজ?

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করার কারণে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি, তার জন্য দোয়া করা জায়েজ নয়, যেমনিভাবে অন্য কাফিরদের জন্য দোয়া করা জায়েজ নয়। কিন্তু আমরা যদি তার ইসলামের বাহ্যিক লক্ষণ (যেমন: জানাজা পড়া, মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন) দেখি, তাহলে আমরা তাকে মুসলিম গণ্য করব এবং তার জন্য দোয়া করতে পারব।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২৪/২৫৪)

বিশেষ বিবেচনা ও সম্মানিত আলেমদের মতামত:

শায়খ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি অলসতার কারণে নামাজ ত্যাগ করে, আমরা তাকে কাফির বলতে পারি না যতক্ষণ না তার কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে তার জন্য দোয়া করা জায়েজ, এবং তার পক্ষ থেকে দান-সাদাকা করা যায়। কেননা তার ইসলামের বাহ্যিক লক্ষণ বিদ্যমান।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২৯/৩০)

শায়খ সালেহ আল-ফাওজান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে পরিচিত এবং মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়, তাহলে তার জন্য দোয়া করা জায়েজ। তবে আমরা আশা করি যে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন যদি তিনি তাওবা করার সুযোগ পেতেন।" (আল-মুনতাকা, ৪/২২৯)

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত: যেহেতু উক্ত ব্যক্তি:

  1. ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন
  2. মুসলিম রীতি অনুযায়ী জানাজা ও দাফন হয়েছে
  3. নামাজের ফরজিয়ত অস্বীকার করতেন না (বরং অলসতার কারণে ত্যাগ করতেন)
  4. পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন (সৎকর্ম)

সুতরাং তাঁর জন্য দোয়া করা জায়েজ। তবে দোয়ায় নির্দিষ্টভাবে ক্ষমা দাবি না করে বরং বলা উচিত: "اللهم اغفر له إن كان من المؤمنين" (হে আল্লাহ, যদি সে মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তাকে ক্ষমা করুন) অথবা "اللهم إن كان مستحقًا للرحمة فارحمه" (হে আল্লাহ, যদি সে রহমতের উপযুক্ত হয় তবে তাকে রহমত করুন)।

৪. পরিবার যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা উপকারে আসবে কিনা?

হ্যাঁ, মৃত মুসলিমের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা জায়েজ এবং এটি তার উপকারে আসে। এ ব্যাপারে সহীহ হাদীস বিদ্যমান।

আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলল: "إِنَّ أُمِّي افْتُلِتَتْ نَفْسُهَا، وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ لَتَصَدَّقَتْ، فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا؟" "আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মনে করি তিনি যদি কথা বলতে পারতেন তবে দান করতেন। আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান করি, তবে কি তার জন্য সওয়াব হবে?" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: "نَعَمْ" (হ্যাঁ) (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০০৪)

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা জায়েজ এবং তা মৃতের উপকারে আসে। তবে শর্ত হলো, মৃত ব্যক্তি মুসলিম হতে হবে। যদি সে কাফির হয়, তবে তার জন্য দান করা উপকারে আসবে না।" (শারহুল মুমতি', ৫/২২৯)

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মৃত মুসলিমের পক্ষ থেকে দান-সদকা, হজ্জ, উমরাহ, রোজা ইত্যাদি করা জায়েজ এবং তা মৃতের উপকারে আসে। এ বিষয়ে ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২৪/৩১৬)

প্রশ্নকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য দোয়া করার বিধান

প্রশ্নকর্তা (সালাফী মানহাজের অনুসারী): আপনি উক্ত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে পারবেন, কারণ তিনি বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছিলেন এবং মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে দোয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যেমন উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের অন্যান্য সদস্য (হানাফী মাযহাবের অনুসারী): তাঁরাও তাঁর জন্য দোয়া করতে পারবেন। মাযহাবের পার্থক্য দোয়া করার বৈধতাকে প্রভাবিত করে না। সকল মুসলিমের জন্যই দোয়া করার অনুমতি রয়েছে বাহ্যিক ইসলামের ভিত্তিতে।

গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ

১. আমরা কাউকে কাফির ফতওয়া দিতে পারি না যতক্ষণ না তার কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সে জেনে-বুঝে অস্বীকার করে।

২. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া জায়েজ নয়। আল্লাহ বলেন: "لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

৩. মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও দান-সদকার পাশাপাশি জীবিতদের জন্য শিক্ষণীয় যে, নামাজের গুরুত্ব কত বেশি। আমাদের উচিত সময়মতো নামাজ আদায় করা এবং পরিবারকে উৎসাহিত করা।

৪. ছেলেটির জন্য দোয়া করুন যেন সে আল্লাহর রহমতে হাফেজ হতে পারে, যা তার পিতার ইচ্ছা ছিল।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | উত্তর | |-------|--------| | শেষ পরিণতি | আল্লাহর ইচ্ছাধীন; আমরা ফয়সালা দিতে পারি না | | ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ | আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন (শিরক ছাড়া সব পাপ) | | দোয়া করা | জায়েজ, কারণ তিনি বাহ্যিকভাবে মুসলিম | | দান-সদকা | উপকারে আসবে, সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত |

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন এবং মৃতদের প্রতি রহম করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.