একাধিক পাত্রের মধ্যে ইস্তিখারা করার সঠিক হানাফি পদ্ধতি।

Salah-Prayer · Hanafi

Questioner: Md shorif Uddin
Question Asked: 29 May 2026, 01:30 PM
Reviewed & Published: 29 May 2026, 01:47 PM
Views: 32
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একাধিক উপযুক্ত পাত্র উপস্থিত
ভালো বা মন্দ জানার জন্য
এমন যদি হয় আল্লাহ এদের আমার ভাগ্যে না রাখে
আমি চাই উত্তম দ্বীনদার জীবনসঙ্গী
তাহলে কিভাবে ইস্তিখারা করব
নিয়ম নিয়ত সব বলে দেন

Answer

উত্তর:
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো—একাধিক উপযুক্ত পাত্র (বা পাত্রী) থাকলে ইস্তিখারা কিভাবে করবেন, যাতে আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম দ্বীনদার জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করেন। নিচে হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে পদ্ধতি ও নিয়ম-নিয়ত বিস্তারিত দেওয়া হলো।


ইস্তিখারার উদ্দেশ্য ও মূলনীতি

ইস্তিখারা অর্থ কল্যাণ কামনা করা। এটি একটি দু‘আ ও ইবাদত, যা দ্বারা বান্দা আল্লাহর কাছে তার সিদ্ধান্তে কল্যাণ প্রার্থনা করে। ইস্তিখারা করলে ভবিষ্যদ্বাণী জানা যায় না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্তরে কোনো একটি বিষয়ের প্রতি ঝোঁক বা সহজতা সৃষ্টি হয় অথবা বাধা আসে (মা‘আরিফুল কুরআন, ২/২৮৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৬৪৪)।

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সব কাজে ইস্তিখারা শিখিয়েছেন, যেমন কুরআনের সূরা শেখাতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬৬)। ইস্তিখারা সাধারণত যেকোনো বৈধ কাজের জন্য করা যায়, বিশেষ করে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে।


একাধিক পাত্র থাকলে ইস্তিখারার পদ্ধতি

হানাফি ফিকহে একাধিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করা উত্তম:

পদ্ধতি ১: প্রত্যেকের জন্য পৃথক ইস্তিখারা

প্রত্যেক সম্ভাব্য পাত্রের জন্য আলাদাভাবে ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তিখারার দু‘আ করুন। যেমন:

  • প্রথমে ‘আমি অমুক পাত্রের (নাম উল্লেখ) জন্য ইস্তিখারা করছি’ বলে নিয়ত করুন।
  • তারপর দু‘আ করুন।
  • একইভাবে দ্বিতীয় পাত্রের জন্য আলাদা নামাজ ও দু‘আ পড়ুন।

এই পদ্ধতি অধিক নির্ভরযোগ্য, কারণ প্রতিটি বিষয়ের জন্য পৃথকভাবে কল্যাণ প্রার্থনা করা হয়। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫৯)

পদ্ধতি ২: সবাইকে একত্রে ইস্তিখারা

যদি অনেকগুলো পাত্র থাকে, তাহলে একবার ইস্তিখারা করেই দু‘আয় বলতে পারেন:
“হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে আমার কাছে অমুক, অমুক (নাম উল্লেখ) বিবাহের প্রস্তাব এসেছে। আপনি এদের মধ্যে যাকে আমার জন্য সর্বোত্তম মনে করেন, তাকে সহজ করে দিন।”
তবে হানাফি ফুকাহাদের মতে, প্রত্যেকের জন্য পৃথক ইস্তিখারা করা উত্তম। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২৩)

কখন কল্যাণ ধরা হবে?

ইস্তিখারার পর অন্তরে কোনো এক পাত্রের প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁক সৃষ্টি হওয়া, বা সংশ্লিষ্ট কাজে সহজতা পাওয়া, বা বাধা আসা—এগুলো কল্যাণের ইঙ্গিত। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্বপ্ন দেখা জরুরি নয় (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৯)। ইস্তিখারার পর সাধারণত পেশাদার পরামর্শ (মাশওয়ারা) নেওয়া এবং নিজের বিবেক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্তব্য। (বেহেশতি জেওর, ৩/১২৪)


ইস্তিখারার পূর্ণ নিয়ম ও নিয়ত

(১) নিয়ত (নিয়্যাহ)

নামাজের নিয়ত মুখে বলা জরুরি নয়, অন্তরে সংকল্প করাই যথেষ্ট। তবে সুবিধার্থে এভাবে বলা যায়:
উচ্চারণ: “নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা রাকআতাই সালাতিল ইস্তিখারাতি”
অর্থ: “আমি আল্লাহর জন্য দুই রাকাত ইস্তিখারার নামাজ পড়ার নিয়ত করছি।”
অথবা আরও স্পষ্টভাবে: “আমি অমুক কাজের (বা বিবাহের) জন্য ইস্তিখারা করার নিয়ত করছি।”

(২) নামাজের পদ্ধতি

  • প্রথমে অজু করে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ান।
  • ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করুন।
  • প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ)
  • দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ)
  • সালাম ফিরানোর পর আল্লাহর হামদ ও দরুদ পড়ুন। তারপর নিম্নোক্ত দু‘আ পাঠ করুন।

(৩) ইস্তিখারার দু‘আ

আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ. اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ (এখানে কাজের নাম বলবেন) خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي، فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي، ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ. وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي، فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ.

উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নী আস্তাখীরুকা বিইলমিকা, ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল আযীম। ফাইন্নাকা তাকদিরু ওয়া লা আকদিরু, ওয়া তাআলামু ওয়া লা আ‘লামু, ওয়া আনতা আল্লামুল গুয়ূব। আল্লাহুম্মা ইন কুনতা তাআলামু আন্না হাযাল আমরা (এখানে কাজের নাম বলবেন) খাইরুন লী ফী দীনী ওয়া মাআশী ওয়া আ‘কিবাতি আমরী, ফাকদুরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী, সুম্মা বারিক লী ফীহি। ওয়া ইন কুনতা তাআলামু আন্না হাযাল আমরা শাররুন লী ফী দীনী ওয়া মাআশী ওয়া আ‘কিবাতি আমরী, ফাসরিফহু আন্নী ওয়াসরিফনী আনহু, ওয়াকদুর লিল খাইরা হাইসু কানা, সুম্মা আরদিনী বিহী।

অর্থ: “হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার জ্ঞানের মাধ্যমে তোমার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং তোমার শক্তি দ্বারা শক্তি প্রার্থনা করছি এবং তোমার মহা অনুগ্রহ চাইছি। নিশ্চয় তুমি শক্তিমান, আমি শক্তিমান নই; তুমি জানো, আমি জানি না; আর তুমি অদৃশ্য বিষয়ে সর্বজ্ঞ। হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে এই কাজটি (এখানে কাজের নাম বলবেন) আমার দীন, আমার জীবন ও আমার পরিণতির জন্য কল্যাণকর, তবে তা আমার জন্য নির্ধারণ করো, সহজ করো, তারপর তাতে বরকত দান করো। আর যদি তুমি জানো যে এই কাজটি আমার দীন, আমার জীবন ও আমার পরিণতির জন্য অকল্যাণকর, তবে তা আমা হতে সরিয়ে নাও, আমাকে তা হতে সরিয়ে দাও এবং যেখানেই কল্যাণ থাকে তা আমার জন্য নির্ধারণ করো, তারপর আমাকে তাতে সন্তুষ্ট করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬৬)

(৪) ইস্তিখারা করার সময়

যেকোনো সময় ইস্তিখারা করা যায়, তবে শেষ রাতে বা তাহাজ্জুদের সময় উত্তম। নামাজের পর দু‘আর আগে দরুদ পড়া সুন্নত; দু‘আর পরেও দরুদ পড়া যেতে পারে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫৯; শামি, ২/৪৬৯)

(৫) ইস্তিখারার পর করণীয়

  • ইস্তিখারা করার পর অন্তরে যে পাত্রের প্রতি স্বাভাবিক প্রশান্তি ও ঝোঁক আসে, তাকে নির্বাচন করুন। যদি কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত না পান, তবে ৭ বার পর্যন্ত ইস্তিখারা করতে পারেন (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৬৪৫)।
  • নিজের পছন্দ ও পরিবারের পরামর্শকে গুরুত্ব দিন, কারণ ইস্তিখারা অপেক্ষা নয়; বরং দু‘আ ও স্বাভাবিক পথে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার মাধ্যম। (তাফসিরে মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা ইউসুফের ব্যাখ্যা)
  • ইস্তিখারার পর কোনো পাত্রের প্রতি সংকীর্ণতা, অস্বস্তি বা কঠিনতা অনুভব করলে তা অকল্যাণের ইঙ্গিত মনে করুন (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২৪)।

প্রয়োজনীয় টিপস

  • যদি আপনার মনে হয় যে কোনো পাত্রই আপনার ভাগ্যে নেই, তাহলেও ইস্তিখারা করুন, কারণ আল্লাহ ভালো জানেন। ইস্তিখারা আপনার অন্তরকে নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করবে।
  • উত্তম দ্বীনদার জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য ইস্তিখারার পাশাপাশি আপনি বেশি বেশি দু‘আ করুন, বিশেষ করে সূরা ফুরকানের আয়াত: رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ (সূরা ফুরকান: ৭৪)।
  • ইস্তিখারা কবুল হওয়ার জন্য সালাতুল হাজতও পড়তে পারেন—২ রাকাত নামাজের পর নিজের চাহিদা ও ভালো সঙ্গীর জন্য দু‘আ করুন। (শামি, ২/৪৭০)

উল্লেখিত কিতাব ও শিক্ষকগণ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি), ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি শফি উসমানি), ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি), বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি), মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতি শফি উসমানি)।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.