বান্দার হক নষ্ট করলে ক্ষমার উপায়
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি অতীতে অনেক বান্দার হক নষ্ট করেছি,তাদের গীবত পরনিন্দা করেছি,ভালো আচরণ করিনি অনেকের সাথে।এছাড়া বিয়ের পর স্বামীর পরিবার পরিজনদের নানা দোষত্রুটি নিয়ে আলোচনা করতাম।এভাবে আমার স্বামী এখন তার পরিবারকে পছন্দ করেনা,তাদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে।এখন সবাই বলতেছে আমার কারনে তাদের ছেলে এমন হয়ে গেছে।
আমি আমার ভুল বুঝতে পারছি,কিভাবে আমি ক্ষমা পাবো আর তাদের প্রতি আমার করনীয় কি?আমার স্বামীর করনীয় কি?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার অনুশোচনা এবং ভুল বুঝতে পারার জন্য আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। এটি তাওবার প্রথম ও প্রধান শর্ত। নিচে আপনার প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
আপনার করণীয় (ক্ষমা পাওয়ার উপায়)
ইসলামে বান্দার হক নষ্ট করার গুনাহ মাফের জন্য শুধু আল্লাহর কাছে তাওবাই যথেষ্ট নয়; বরং যার হক নষ্ট করা হয়েছে তার কাছ থেকেও ক্ষমা চাইতে হবে অথবা তার ক্ষতি পূরণ করতে হবে।
১. তাওবাহ ও ইস্তিগফার
প্রথমে আপনাকে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। তাওবার শর্ত তিনটি:
- (ক) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া,
- (খ) লজ্জিত হওয়া ও অনুতাপ করা,
- (গ) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
(রদ্দুল মুহতার, ২/১১৮; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৩)
২. ক্ষমা চাওয়া
আপনি যাদের গীবত করেছেন, তাদের অপবাদ দিয়েছেন, তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন—তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়া জরুরি। যদি সম্ভব হয়, সরাসরি ফোন করে বা দেখা করে বলুন: "আমি আপনার সম্পর্কে আগে খারাপ কথা বলেছি বা খারাপ আচরণ করেছি, দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন।" যদি তাদের কাছে যেতে দ্বীনের কারণে কোনো অসুবিধা হয় (যেমন ফিতনার আশঙ্কা), তাহলে তাদের জন্য দোয়া করুন এবং তাদের ভালোর জন্য সাদকা করুন। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "গীবতের কাফফারা হলো, যার গীবত করা হয়েছে তার জন্য ইস্তিগফার করা।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮১)
৩. স্বামীর পরিবারের প্রতি করণীয়
- আপনার স্বামীকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য আপনি দায়ী বোধ করছেন—এটা আপনার অনুশোচনার প্রমাণ। এখন আপনার কর্তব্য হলো, স্বামীকে বোঝানো যে আপনি ভুল করেছিলেন এবং তাকে তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে উৎসাহিত করা।
- শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবর-ননদদের সাথে সদয় ব্যবহার করুন, তাদের খোঁজ-খবর নিন, তাদের জন্য দোয়া করুন। যদি তারা আপনার প্রতি রাগান্বিত হন, তবে ধৈর্যের সাথে তাদের মন জয়ের চেষ্টা করুন।
- তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন এভাবে: "আমি আমার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, আপনাদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলেছি। আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দিন। আমি এখন সত্যিই লজ্জিত।"
৪. নেক আমল বৃদ্ধি করুন
গীবত ও পরনিন্দার কাফফারা হিসেবে বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন, নফল নামায, রোজা, দান-সাদকা করুন। হাদীসে এসেছে: "যে ব্যক্তি কোনো ভাইয়ের গীবত করে, সে যেন তার জন্য ইস্তিগফার করে, তাহলে তা তার জন্য কাফফারা হবে।" (মিশকাতুল মাসাবীহ, ৪৮৩৪)
স্বামীর করণীয়
স্বামীর উচিত:
১. পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করা
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সম্পর্ক ছিন্ন করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারী, ৫৯৮৪) তাই আপনার স্বামীকে তার পরিবারের সাথে শত্রুতা না করে, বরং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে হবে।
২. ক্ষমা ও ধৈর্যের চর্চা
স্বামীকে তার পরিবারকে বুঝাতে হবে যে, আপনি (স্ত্রী) আপনার ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং সংশোধন করেছেন। তার নিজেরও উচিত স্ত্রী ও পরিবারের মাঝে মধ্যস্থতা করা, এক পক্ষের দোষ অন্যের কাছে বলা থেকে বিরত থাকা।
৩. স্ত্রীকে ভালো পরামর্শ দেওয়া
স্বামী এখন উচিত, আপনাকে ইসলামী আদব শেখানো এবং একসাথে দ্বীনী পরিবেশ তৈরি করা। আলোচনার মাধ্যমে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জাগ্রত করা।
৪. নিজের ভুল স্বীকার করে তাওবা করা
যদি স্বামী নিজেও ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে থাকেন, তাহলে তাকেও তাওবা করতে হবে। তিনিও তার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন।
কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমাদের মধ্যে কেউ যেন কারো গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো ঘৃণাই করো।" (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১২)
- অপর আয়াতে: "যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজকে পুণ্যে পরিবর্তন করবেন।" (সূরা ফুরকান, ২৫:৭০) — এটি তাওবার প্রতিশ্রুতি।
- হাদীসে কুদসীতে এসেছে: "যে ব্যক্তি কোনো ভাইয়ের গীবত করে এবং পরে তার জন্য ইস্তিগফার করে, সে যেন তার গীবতের বিনিময়ে তাকে একটি উপহার দিল।" (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, ৫/৩০১)
উপসংহার
আপনার ভুল বুঝতে পারা এবং অনুতপ্ত হওয়া খুবই বড় নেয়ামত। এখন বাস্তব পদক্ষেপ নিন:
- আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।
- যাদের গীবত করেছেন তাদের কাছে ক্ষমা চান।
- স্বামী ও তার পরিবারের মাঝে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে ভূমিকা রাখুন।
- স্বামীকে বলুন, তিনি যেন তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেন এবং আপনাকে দ্বীনের পথে সাহায্য করেন।
আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করুন এবং আপনাকে ও আপনার স্বামীকে উত্তম জীবন দান করুন। আমীন।
উল্লেখিত কিতাবাদি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী)
- বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- মিশকাতুল মাসাবীহ
- সহীহ বুখারী