আমি ওয়াসওয়াসাতে আক্রান্তঃ করণীয় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Nabila
Question Asked: 29 May 2026, 07:08 PM
Reviewed & Published: 29 May 2026, 07:18 PM
Views: 8
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
মনে মনে সারাক্ষন ইসলাম নিয়ে, আল্লাহ কে নিয়ে অনেক বাজে কথা চলে আসে। যেগুলো মনে মনে বললেও আমার ভয় লাগে।

১) যেমন আমি খাচ্ছি এমন সময় মনে মনে কিছু একটা বলে ফেললাম। আর মুখ খোলা ছিল আমি খাচ্ছিলাম। খাওয়ার সাউন্ড হচ্ছিল।
পরে আমার মনে হয় মনে বলা কথা গুলা মুখে বলে ফেললাম কিনা?

২) সারাদিনই মনে মনে এসব বলতেই থাকি। বলতে বলতে এক সময় মনে হয় আমি সত্যি সত্যিই গুলা মুখ দিয়ে বলে ফেলতেছি। আমি আসলে আজ পর্যন্ত একদিনও কোন পুরা বাক্য মুখ দিয়ে বলি নাই। কিন্তু এটা আমি আমার মনকে বুঝাইতে পারি না। আমাকে মনের মধ্যে কেউ বলে যে তুমি এগুলা সত্যি সত্যি করতেছো, তুমি এই কথাটা বলে ফেলছো, সেই কথাটা বলে ফেলছো, মুখ দিয়ে বলে ফেলছো, অমুক বাজে কথা টা কথাটা বলে ফেলছো। সব সময় টেনশনে থাকি মনে মনে বললাম নাকি মুখেই বলে ফেললাম উচ্চারণ করে।

৩) সারাদিন মনে মনে এসব বলতে থাকি। যখন মনে হয় হয়তো মুখে উচ্চারণ করে ফেলেছি তখন আবার চেক করতে থাকি। মুখ হা করে, জিব্বা নাড়িয়ে, মুখের ভিতর কলম দিয়ে, ফু দিয়ে। আর সারাদিন তো মুখ অফ রাখা যায় না। মানুষ তো নিশাস নেয়ার জন্যও মুখ খুলে। দেখা যায় আমি জোরে জোরে শ্বাস নিলে, কিছু একটা বলে ফেলি আমার মনে হয় আমি মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলতেছি।

৪)আমার নতুন বিয়ে হয়েছে। আমাকে কেউ সব সময় বলে তুমি তো এটা বলে ফেলছো, তুমি তো অমুক বাজে কথা বলে ফেলছো। এখন তোমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি হবে। এসব ভাবায় আমাকে কেউ। আর আমি ভাবতে থাকি। টেনশন এ পড়ে যাই।

৫) আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে তুমি কি কোনো কথা মুখে উচ্চারণ করেছো? তখন আমি বলি যে না, আমি শুধু চেক করার জন্য হা করে, জিব্বা নাড়িয়ে সাউন্ড ছাড়া, মনে মনে বলেছি শুধু চেক করতে। যেমন "আমি খারাপ"। আমি শব্দ টা আমি মনে মনে বলেছি আর "খারাপ" শব্দ টা মুখে উচ্চারণ করেছি। এখন এই " খারাপ "শব্দটা মুখে উচ্চারণ করার জন্য কি "আমি খারাপ" এই পুরা বাক্যটা ধরা হবে? "আমি" শব্দটা তো মনে মনে বলেছিলাম।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রিয় ভাই, আপনার সমস্যা বুঝতে পেরেছি। এটি একটি সাধারণ ওয়াসওয়াসা (وسوسہ) বা শয়তানি প্ররোচনা। আপনি একা নন, অনেক মুসলিম এই সমস্যায় ভোগেন। তবে নিশ্চিত থাকুন, ইসলাম এ ব্যাপারে খুবই সহজ এবং স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

আপনার বর্ণিত সকল অবস্থায় আপনার ঈমানের কোনো ক্ষতি হয়নি, আপনার বিবাহ বৈধ আছে, এবং আপনার কোনো গুনাহ হয়নি। শুধু মনে মনে আসা বাজে কথা বা কুফরি চিন্তা (যা আপনি বিশ্বাস করেন না) এর জন্য আপনি দায়ী হবেন না। এটি একটি মানসিক রোগ বা শয়তানি ওয়াসওয়াসা মাত্র।


বিস্তারিত উত্তর: কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে

১) মনে মনে কথা বলা এবং মুখ খোলা থাকা

আপনি যখন খাচ্ছিলেন, তখন মুখ খোলা ছিল এবং খাওয়ার শব্দ হচ্ছিল। সেই সময় আপনি যদি মনে মনে কোনো বাজে কথা বলেন, তবে তা মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে বলে গণ্য হবে না

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ" "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।" (সহীহ বুখারী: ২৫২৮, সহীহ মুসলিম: ১২৭)

হানাফি ফিকহ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার শিষ্যগণ এই মতেই রয়েছেন যে, মনে মনে কুফরি চিন্তা আসলেও তা কুফর নয়, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয় এবং অন্তর তা বিশ্বাস করে। (রদ্দুল মুহতার: ৪/২২৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/২৭৭)

সিদ্ধান্ত: আপনার খাওয়ার সময় মুখ খোলা থাকলেও, আপনি যেহেতু মনে মনে বলেছেন, তাই তা উচ্চারিত হয়নি। আপনার কোনো গুনাহ হয়নি।


২) সারাদিন মনে মনে এসব কথা আসা এবং সন্দেহ হওয়া

এটি সম্পূর্ণ ওয়াসওয়াসা। শয়তান মানুষকে এভাবেই বিভ্রান্ত করে। আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে মুখ দিয়ে বলেছেন, তবে ইসলামি নীতি হলো সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো কিছু সাব্যস্ত করা যাবে না

কুরআন: আল্লাহ বলেন:

"وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ..." "কোনো মানুষের জন্য এটি সম্ভব নয় যে আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন, ওহি ছাড়া অথবা পর্দার আড়াল থেকে..." (সূরা শূরা: ৫১)

হানাফি ফিকহ: ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"الوَسْوَسَةُ لا تُؤَثِّرُ فِي الإِيمَانِ، وَلا تَكُونُ كُفْرًا إِلا إِذَا اعْتَقَدَهَا الْإِنْسَانُ" "ওয়াসওয়াসা ঈমানের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না, এবং তা কুফর হয় না যতক্ষণ না মানুষ তা বিশ্বাস করে।" (রদ্দুল মুহতার: ৪/২২৬)

সিদ্ধান্ত: আপনি যখন নিশ্চিত নন, তখন ধরে নিন আপনি মুখে বলেননি। শয়তানের এই ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না।


৩) চেক করার জন্য মুখ হা করা, জিব্বা নাড়ানো, কলম দেওয়া, ফুঁ দেওয়া

এসব কাজ ওয়াসওয়াসার চিকিৎসার অংশ নয়, বরং ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আপনি যখন নিশ্চিত নন, তখন এসব চেক করা ঠিক নয়।

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ" "যে জিনিস তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে দাও সেই জিনিসের দিকে যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না।" (তিরমিজি: ২৫১৮)

ফাতাওয়া উসমানি: মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

"ওয়াসওয়াসার রোগীর উচিত নিজের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং বারবার চেক না করা। চেক করলে ওয়াসওয়াসা বেড়ে যায়।" (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৪৫)

সিদ্ধান্ত: আপনার চেক করার প্রয়োজন নেই। আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তবে কিছুই হয়নি।


৪) নতুন বিয়ে এবং কেউ বলা যে ঈমান ও বিবাহিত জীবন নষ্ট হবে

এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও শয়তানের প্ররোচনা। আপনার বিবাহ বৈধ আছে এবং ঈমান অক্ষুণ্ন আছে, যতক্ষণ না আপনি মুখে কুফরি কথা বলেন এবং তা অন্তর বিশ্বাস করেন।

হানাফি ফিকহ: কুফরি শব্দ উচ্চারণের জন্য শর্ত হলো:

  • মুখে উচ্চারণ করা (শব্দ বের হওয়া)
  • অন্তর তা বিশ্বাস করা
  • ইচ্ছাকৃতভাবে বলা (ভুলে বা জোরপূর্বক নয়)

আপনার ক্ষেত্রে এই তিনটি শর্তই অনুপস্থিত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/২৭৬, রদ্দুল মুহতার: ৩/৪৫)

সিদ্ধান্ত: আপনার বিবাহ ও ঈমান উভয়ই নিরাপদ। কেউ যদি বলে যে আপনার বিবাহ নষ্ট হবে, তবে তা শয়তানের পক্ষ থেকে।


৫) 'আমি খারাপ' বলার সময় 'আমি' মনে মনে এবং 'খারাপ' মুখে উচ্চারণ

এখানে পুরো বাক্যটি 'আমি খারাপ' ধরা হবে না, কারণ আপনি শুধু 'খারাপ' শব্দটি মুখে উচ্চারণ করেছেন। 'আমি' শব্দটি মনে মনে বলেছেন।

হানাফি ফিকহ: যদি কেউ কোনো বাক্যের কিছু অংশ মনে মনে বলে এবং কিছু অংশ মুখে উচ্চারণ করে, তবে তা সেই বাক্যের উচ্চারণ বলে গণ্য হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/২৭৭)

সিদ্ধান্ত: আপনার এই কাজের জন্য কোনো গুনাহ বা কুফর হবে না। তবে 'খারাপ' শব্দটি মুখে উচ্চারণ করা ভালো নয়। চেষ্টা করুন মুখে কোনো বাজে কথা না বলতে।


ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায়

১. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। এটা শয়তানের কাজ। যত বেশি গুরুত্ব দেবেন, তত বাড়বে।

২. আল্লাহর কাছে দোয়া করুন:

  • "رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ" (হে আমার রব! আমি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।)
  • "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ"

৩. সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়ুন প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের পর।

৪. মনে মনে আসা বাজে কথার প্রতিবাদ করুন - মনে মনে বলুন "আমি এগুলো বিশ্বাস করি না, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান রাখি"।

৫. ওয়াসওয়াসা নিয়ে আলোচনা না করা - কারণ এতে ওয়াসওয়াসা বাড়ে।

৬. ডাক্তারি পরামর্শ নিন - যদি ওয়াসওয়াসা অতিরিক্ত হয়, তবে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন। ইসলাম এটাকে উৎসাহিত করে।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

  1. আপনার ঈমান অক্ষুণ্ন আছে।
  2. আপনার বিবাহ বৈধ আছে।
  3. আপনার কোনো গুনাহ হয়নি।
  4. আপনি যা মনে মনে বলেন বা সন্দেহ করেন, তা আল্লাহ ক্ষমা করেন।
  5. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করুন।

উপদেশ: আপনি যদি পারেন, তাহলে ইস্তেগফার বেশি করে পড়ুন এবং আল্লাহর যিকির করুন। ওয়াসওয়াসা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। শয়তান চায় আপনি অস্থির থাকুন, কিন্তু আপনি ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।

আল্লাহ আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.