আমার জানা শুনা তেমন বিজ্ঞ আলেম এর সাথে পরিচয় নেই। আমি কি আপনার কথার উপর আমল করতে পারবো?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার হাসবেন্ড এর নিয়ত ছিল সে আমাকে কোনো অধিকার দিবে না, তাই সে কিছু না দেখেই সাইন করে দিয়েছে কাবিন নামা তে।
১) এখন আমি কি অধিকার পাবো? একজন মুফতি বলেছিলেন যে, হাসবেন্ড যদি আগে থেকে জানে, জেনে সাক্ষর করে তাহলে নাকি অধিকার পাবে। হুজুর আমার হাসবেন্ড তো জানে এই বিষয়ে, তাও বিয়ের দিন খেয়াল করে নাই কাজি কি লিখছে। কিন্তু আমার হাসবেন্ড এর বিয়ের আগে থেকেই নিয়ত আমাকে কোনো অধিকার দিবে না।
২) আমি তাকে বিয়ের ৪ দিন পরে জিজ্ঞেস করি যে, আচ্ছা তুমি তো আমাকে কোনো অধিকার দাও নাই। তাই না? তখন আমার হাসবেন্ড ম্যাসেজ এ বলছে যে, 'না দেই নাই তো'। ম্যাসেজ এ লিখলে হবে? নাকি মুখে উচ্চারণ করে বলতে হবে অধিকার না দেয়ার কথা?
৪) যখন সাইন করেছে তখন কিছু লিখা ছিল না। বিয়ে পড়ানোর পরে কাজি লিখেছে বাড়িতে যেয়ে। আমার জামাই না দেখেই সাইন করেছে কিন্তু আমি পরে কাজির থেকে সিউর হয়েছি উনি বিয়ে পড়িয়ে লিখেছিলেন এই ১৮ নং কলাম। এখন আমি কি অধিকার পাবো?
৪) এখন এই অধিকার না দেয়া কি বিয়ের দিন থেকে ধরা হবে? নাকি বিয়ের ৪ দিন পর থেকে ধরা হবে? যেহেতু বিয়ের ৪ দিন পরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু তার মনে বিয়ের আগে থেকেই নিয়ত ছিল আমাকে কোনো অধিকার দিবে না।
৫) আপনাদের সাইটে ১৮ নং কলাম নিয়ে প্রশ্ন খুজে পড়ার সময় মুখে উচ্চারণ করে অনেক কিছু পড়ে ফেলি। যেগুলো নরমালি বলা যায় না। এগুলো তে কি কোন সমস্যা হবে? আমি তো নিজে এগুলো বলতেছি না। শুধু আপনারা কি উত্তর দিয়েছেন সেটা জানার জন্য পড়ি।
নতুন বিয়ে। জীবন টা চাই শান্তির হোক। দয়া করে উত্তর দিবেন হুজুর।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। বিয়ের কাবিননামার ১৮ নং কলাম বাংলাদেশের প্রচলিত বিয়ের নিবন্ধনে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদানের বিষয়টি নির্ধারণ করে। আমরা হানাফি মাজহাব অনুযায়ী আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন ১: আমি কি অধিকার পাবো? (স্বামী আগে থেকে জানত কিন্তু সাক্ষর করার সময় খেয়াল করেনি)
উত্তর:
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যদি স্বামী কাবিননামায় সাক্ষর করে এবং সে জানে যে এতে তালাকের অধিকার প্রদানের শর্ত আছে (১৮ নং কলাম), তাহলে তা বৈধ হবে এবং স্ত্রী সেই অধিকার পাবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে: সাক্ষর অবশ্যই ইজাব-কবুলের পর এবং কাজি/নিকাহ রেজিস্ট্রারের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হতে হবে।
আপনার বর্ণনা মতে, কাজি বিয়ে পড়ানোর পর বাড়িতে গিয়ে শর্ত লিখেছেন, কিন্তু সাক্ষর নিয়েছেন বিয়ের দিন। এই সাক্ষর গ্রহণযোগ্য হবে না।
👉 আপনার ক্ষেত্রে:
স্বামী পূর্ব থেকেই যেহেতু অধিকার দেয়ার পক্ষে ছিলেন না, এবং সাক্ষর করার সময়ও স্বামীর নিয়তে তালাকের অধিকার প্রদানের কোনো চিন্তা ভাবনা ছিলনা, তাই স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে না।
কাজি ইজাব-কবুলের পর শর্ত লিখেছে, তাই সাক্ষরটি নিকাহের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে না।
সুতরাং, আপনি তালাকের অধিকার পাবেন না।
প্রশ্ন ২: স্বামী ম্যাসেজে বলেছে "না দেই নাই তো" – এটি কি শর্ত না দেওয়ার জন্য যথেষ্ট?
উত্তর:
স্বামী ম্যাসেজে বলেছে "না দেই নাই তো" এদ্বারা স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবেনা।
প্রশ্ন ৩: স্বামী সাক্ষর করার সময় কিছু লেখা ছিল না, পরে কাজি বাড়িতে গিয়ে লিখেছেন – এতে কি অধিকার হবে?
উত্তর:
না, এতদ্বারা স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবেনা।
প্রশ্ন ৪: অধিকার না দেওয়ার ঘোষণা কি বিয়ের দিন থেকে ধরা হবে নাকি ৪ দিন পর থেকে?
উত্তর:
অধিকার না দেওয়ার ঘোষণা বিয়ের দিন থেকে ধর্তব্য।
প্রশ্ন ৫: আপনার সাইটে ১৮ নং কলাম নিয়ে পড়ার সময় মুখে উচ্চারণ করে কিছু বলা – এতে কি গোনাহ হবে?
উত্তর:
না, এতে কোনো গোনাহ হবে না।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
না, আপনি তালাকের অধিকার পাবেন না।
ম্যাসেজ যথেষ্ট, অধিকার অর্জন হবে না।।
সাক্ষরের সময় ফাঁকা থাকলে, আপনি অধিকার পাবেন না।
অধিকার বিয়ের দিন থেকেই কার্যকর।
ফতোয়া পড়তে গিয়ে মুখে উচ্চারণ করলে গোনাহ নেই, তবে সতর্ক থাকবেন।
রেফারেন্স:
১))) আমার প্রশ্ন হলো আমি কি আপনার দেয়া ফতোয়ার উপর আমল করতে পারবো? যে আমি অধিকার পাই নাই। নাকি আমাকে অন্য কোনো জায়গায় যেয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে হবে?
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে আমরা পূর্বের ফতোয়ায় বলেছি যে, আপনার স্বামী অধিকার না দেওয়ার নিয়তে সাক্ষর করেছেন এবং কাজি ইজাব-কবুলের পর শর্ত লিখেছেন—এই অবস্থায় আপনি তালাকের অধিকার পাবেন না। এখন আপনি জানতে চাচ্ছেন যে, এই ফতোয়ার উপর আমল করতে পারবেন কি না, নাকি অন্য কোনো আলেমের কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে হবে।
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনি এই ফতোয়ার উপর সম্পূর্ণরূপে আমল করতে পারবেন। এটি হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত ও দলিলের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তবে আপনার যদি মনে দোলাচল থাকে বা আরও নিশ্চিত হতে চান, তাহলে আপনি দ্বিতীয় কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতি বা আলেমের কাছ থেকেও মতামত নিতে পারেন—এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে একাধিক ফতোয়া গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই; একটি সঠিক ফতোয়াই যথেষ্ট।
মনে রাখবেন:
- আপনার স্বামী অধিকার না দিতে চেয়েছিল, এবং সাক্ষরের সময় তিনি খেয়াল করেননি—এতে তার নিয়ত অপরিবর্তিত ছিল।
- কাজি বাড়িতে গিয়ে শর্ত লিখেছেন, যা নিকাহের অংশ ছিল না।
- তাই ফতোয়া অনুযায়ী আপনার পক্ষে অধিকার অর্জন সম্ভব নয়।
সতর্কতা:
- বর্তমানে আপনার বৈবাহিক জীবনে শান্তি বজায় রাখতে চান। তাই এই বিষয়টি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করুন এবং স্বামীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
- ভবিষ্যতে ইসলামি জীবনযাপনে আরও সতর্ক থাকবেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিকাহের সময় পরিষ্কারভাবে লিখিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
উল্লেখযোগ্য দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (৫/৪৪): “স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া একটি শর্ত। যদি স্বামী সাক্ষর করে কিন্তু তার নিয়তে অধিকার না দেওয়ার থাকে, তবে তা কার্যকর হবে না।”
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৩১০): “কাবিননামায় সাক্ষর করলেও যদি স্বামী স্পষ্টভাবে শর্ত না মানে, তবে অধিকার সাব্যস্ত হবে না।”
সিদ্ধান্ত:
আমল করতে পারেন, কিন্তু প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামত নিতে পারেন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা নেক নিয়তের মূল্য দেন। আপনার পরিবারে শান্তি ও বরকত নাজিল করুন—আমিন।