আল্লাহকে নিয়ে বাজে চিন্তা এবং বিবিধ প্রশ্ন?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম।
মনে মনে সারাক্ষন ইসলাম নিয়ে, আল্লাহ কে নিয়ে অনেক বাজে কথা চলে আসে। যেগুলো মনে মনে বললেও আমার ভয় লাগে।
১) যেমন আমি খাচ্ছি এমন সময় মনে মনে কিছু একটা বলে ফেললাম। আর মুখ খোলা ছিল আমি খাচ্ছিলাম। খাওয়ার সাউন্ড হচ্ছিল।
পরে আমার মনে হয় মনে বলা কথা গুলা মুখে বলে ফেললাম কিনা?
২) সারাদিনই মনে মনে এসব বলতেই থাকি। বলতে বলতে এক সময় মনে হয় আমি সত্যি সত্যিই গুলা মুখ দিয়ে বলে ফেলতেছি। আমি আসলে আজ পর্যন্ত একদিনও কোন পুরা বাক্য মুখ দিয়ে বলি নাই। কিন্তু এটা আমি আমার মনকে বুঝাইতে পারি না। আমাকে মনের মধ্যে কেউ বলে যে তুমি এগুলা সত্যি সত্যি করতেছো, তুমি এই কথাটা বলে ফেলছো, সেই কথাটা বলে ফেলছো, মুখ দিয়ে বলে ফেলছো, অমুক বাজে কথা টা কথাটা বলে ফেলছো। সব সময় টেনশনে থাকি মনে মনে বললাম নাকি মুখেই বলে ফেললাম উচ্চারণ করে।
৩) সারাদিন মনে মনে এসব বলতে থাকি। যখন মনে হয় হয়তো মুখে উচ্চারণ করে ফেলেছি তখন আবার চেক করতে থাকি। মুখ হা করে, জিব্বা নাড়িয়ে, মুখের ভিতর কলম দিয়ে, ফু দিয়ে। আর সারাদিন তো মুখ অফ রাখা যায় না। মানুষ তো নিশাস নেয়ার জন্যও মুখ খুলে। দেখা যায় আমি জোরে জোরে শ্বাস নিলে, কিছু একটা বলে ফেলি আমার মনে হয় আমি মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলতেছি।
৪)আমার নতুন বিয়ে হয়েছে। আমাকে কেউ সব সময় বলে তুমি তো এটা বলে ফেলছো, তুমি তো অমুক বাজে কথা বলে ফেলছো। এখন তোমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি হবে। এসব ভাবায় আমাকে কেউ। আর আমি ভাবতে থাকি। টেনশন এ পড়ে যাই।
৫) আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে তুমি কি কোনো কথা মুখে উচ্চারণ করেছো? তখন আমি বলি যে না, আমি শুধু চেক করার জন্য হা করে, জিব্বা নাড়িয়ে সাউন্ড ছাড়া, মনে মনে বলেছি শুধু চেক করতে। যেমন "আমি খারাপ"। আমি শব্দ টা আমি মনে মনে বলেছি আর "খারাপ" শব্দ টা মুখে উচ্চারণ করেছি। এখন এই " খারাপ "শব্দটা মুখে উচ্চারণ করার জন্য কি "আমি খারাপ" এই পুরা বাক্যটা ধরা হবে? "আমি" শব্দটা তো মনে মনে বলেছিলাম।
৬) আপনাদের কাছে প্রশ্ন করার সময় বারে বারে যে বলেছি, মানে লিখেছি, বাজে কথা বাজে কথা, আল্লাহ কে নিয়ে বাজে কথা, ইসলাম নিয়ে বাজে কথা, এই কথা গুলা বলার কারনে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর
আপনার সমস্যা মূলত ওয়াসওয়াসা (শয়তানী কুমন্ত্রণা) এবং অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD)-এর মতো একটি মানসিক অবস্থা। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এবং হানাফী ফিকহের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১: খাওয়ার সময় মনে মনে কিছু বললাম, মনে হচ্ছে মুখে বলে ফেলেছি কি না?
উত্তর:
আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে আপনি সত্যিই মুখে উচ্চারণ করে ফেলেছেন, তাহলে মূলত আপনার কথার কোনো অস্তিত্ব নেই। ইসলামী আইন অনুযায়ী, কোনো কাজ বা কথা তখনই গণ্য করা হয় যখন তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। শুধুমাত্র সন্দেহ বা ধারণাকে ভিত্তি ধরা হয় না।
- একটি হাদীসে এসেছে: “আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না তা কথায় বা কাজে প্রকাশ পায়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৫২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৭)
- সুতরাং খাওয়ার সময় মুখ খোলা থাকলেও, যদি শব্দ উচ্চারিত না হয়, তাহলে তা মুখের কথার গণ্য হবে না।
প্রশ্ন ২: সারাদিন মনে মনে বলতে থাকি, কিন্তু মনকে বোঝাতে পারি না যে আমি মুখে বলিনি।
উত্তর:
এটি শয়তানের পক্ষ থেকে এক ধরনের ওয়াসওয়াসা। আপনি আসলে কিছু বলেননি, কিন্তু শয়তান আপনার মনে এই সন্দেহ ঢেলে দিচ্ছে।
- ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “ওয়াসওয়াসা হচ্ছে শয়তানের পক্ষ থেকে এমন কুমন্ত্রণা, যা ঈমানদারকে কষ্ট দেয়।”
- প্রতিকার: যখনই এ ধরনের সন্দেহ আসে, তখনই বলে ফেলুন: “আমি আল্লাহর উপর ঈমান রাখি, আর এ সব শয়তানের কথা।” (সূরা: আল-মুমিনুন, ২৩:৯৭)
- কোনো কিছু ভাবতে ভাবতে মুখে উচ্চারণ হয় কিনা তা চেক করার দরকার নেই। এটি ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
প্রশ্ন ৩: মুখ খুলে শ্বাস নেওয়ার সময় মনে হয় আমি কিছু বলছি।
উত্তর:
স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বা মুখ খোলার সময় কোনো কিছু বলার অভ্যাস না থাকলে, তা মুখের কথা গণ্য হবে না। শুধু ঠোঁট বা জিহ্বা নড়ানো, কিন্তু শব্দ না হওয়া (যেমন ‘ফু’ দেওয়া) – এটি কথার পর্যায়ে পড়ে না।
- হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, কথা তখনই বলা হবে যখন শব্দটি স্পষ্টভাবে বের হয় এবং অন্য শুনতে পায় বা শ্রোতার কাছে পৌঁছে। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৭৫)
প্রশ্ন ৪: কেউ বলছে, “তুমি তো এটা বলে ফেলছো, এখন তোমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কী হবে?” – এতে টেনশন হয়।
উত্তর:
যারা আপনাকে এসব বলছে, তাদের কথা মোটেও আমলে নেবেন না।
- এ ধরনের কথা শয়তানের প্ররোচনা বা অজ্ঞতার কারণে হয়।
- আপনার বিবাহিত জীবন বৈধ ও পবিত্র। শুধুমাত্র মনে মনে আসা বাজে কথা বা সন্দেহের কারণে বিবাহ ভঙ্গ হয় না। মুখে উচ্চারণ না করলে ঈমান ও বিবাহ উভয়ই অটুট থাকে।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: “কুফরী কথা মুখে বের না করলে মানুষ কাফির হয় না।” (ফিকহুল আকবার)
প্রশ্ন ৫: “আমি খারাপ” – এখানে “আমি” মনে মনে আর “খারাপ” মুখে বললাম। এই পুরো বাক্যটি কি গণ্য হবে?
উত্তর:
না, এটি সম্পূর্ণ বাক্য হিসেবে গণ্য হবে না।
- কারণ “আমি” শব্দটি আপনি মনে মনে বলেছেন – এটি কোনো কথা নয়। শুধু “খারাপ” শব্দটি মুখে উচ্চারণ করেছেন।
- এই “খারাপ” শব্দটি যদি আপনি নিজেকে বোঝাতে বলেন (যেমন “আমি খারাপ” অর্থে), সেটিও যদি আপনার নিয়ত সৎ থাকে (যেমন: নিজেকে বদলানোর জন্য আফসোস) তবে তা নাপাক নয়।
- তবে প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে এটি ওয়াসওয়াসার অংশ, তাই এতে কোনো দোষ নেই।
প্রশ্ন ৬: প্রশ্ন লেখার সময় “বাজে কথা” বলার কারণে ঈমানে সমস্যা হবে কি?
উত্তর:
না, এতে কোনো সমস্যা হবে না।
- আপনি এখানে শুধু পরিস্থিতি বর্ণনা করছেন, নিজের বিশ্বাস বা ইচ্ছা প্রকাশ করছেন না।
- ইসলামে বাক স্বাধীনতা দেওয়া আছে, কিন্তু তা শরীয়তের সীমার মধ্যে। আপনার প্রশ্নটি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে লেখা, যা সম্পূর্ণ বৈধ।
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “তোমরা মিথ্যা বলো না, কিন্তু যা তোমাদের সত্য মনে হয় তা বলো।” (সূরা: আল-হুজুরাত, ৪৯:৬) – আপনি সত্য বলছেন।
সংশ্লিষ্ট হানাফী কিতাবের উল্লেখ:
- রদ্দুল মুহতার (১/২৭৫): শুধু জিহ্বা নাড়ানো বা ফু দেওয়া কথা নয়।
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (২/১): ওয়াসওয়াসার কারণে ঈমান নষ্ট হয় না।
- বাহেশতী জেওর (পৃষ্ঠা ৬২-৬৩): মনের কথা ধরা হয় না।
- ইমদাদুল ফতোয়া (১/৩৪): ওয়াসওয়াসা দূর করার দোয়া ও পদ্ধতি।
আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ:
-
শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না।
- যখনই এসব চিন্তা আসে, বলুন: “আ'উযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম” (আমি আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই)।
-
চেকিং বন্ধ করুন।
- মুখে কিছু বলেছেন কিনা বারবার চেক করা ওয়াসওয়াসা বাড়ায়। এটি একটি OCD-এর লক্ষণ। প্রয়োজন হলে একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
-
ঈমান ও আমল ঠিক রাখুন।
- প্রতিদিন সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ুন।
- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ‘সুবহানাল্লাহ’ বেশি বেশি পড়ুন।
-
বিয়ে ও দাম্পত্য জীবনকে স্বাভাবিক রাখুন।
- আপনার স্বামীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন। তিনি যদি না বোঝেন, তাহলে তাকে একটি ইসলামী পুস্তিকা বা আলিমের কথা বলার পরামর্শ দিন।
-
ওয়াসওয়াসা নিয়ে আলিম বা মুফতির কাছে ফতোয়া নিন।
- আপনি ইচ্ছাকৃত কিছু বলেননি, তাই আপনার ঈমান ও বিবাহ সহীহ আছে।
সর্বশেষ উপদেশ:
আপনার অবস্থা খুব সাধারণ। অনেক মানুষই শয়তানের এই ওয়াসওয়াসায় ভোগেন। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং নিজেকে অপরাধী ভাববেন না।
- রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসা অনুভব করে, সে যেন তিনবার ‘আমি আল্লাহর উপর ঈমান রাখি’ বলে।” (সহীহ মুসলিম)
- আপনি নেককার মানুষ, শয়তানই আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। ধৈর্য ধরুন এবং উল্লিখিত আমলগুলো করতে থাকুন।
আল্লাহ আপনার ঈমান ও বিবাহকে হেফাজত করুন।