বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 818
Questioner: Md. Abu Rayhan
Question Asked: 26 May 2026, 10:28 PM
Reviewed & Published: 26 May 2026, 10:44 PM
Views: 110
Tokens: 3,385
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
১.টিভিতে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা দেখা কি জায়েজ?
২.বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করা কি জায়েজ?
৩.একজন সালাফী বক্তার ওয়াজ এ শুনেছি যেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার আলোচনা হয় সেখানে বসে থাকা হারাম। এটা কি সত্য?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্মরণ রাখা জরুরি: ইসলামে কোনো কাজের বৈধতা নির্ভর করে তার শরয়ী দলিল এবং সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর। নিচে হানাফি ফিকাহ ও গবেষণা মূলক ফতওয়ার আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।


১. টিভিতে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা দেখা কি জায়েজ?

মূলনীতি: যে খেলায় শরীর ও মন চাঙ্গা হয়, কোনো হারাম জিনিস (যেমন: বেহায়াপনা, গান-বাজনা, জুয়া, সময় নষ্ট) না থাকে, এবং ফরজ ইবাদত (নামাজ, পিতা-মাতার সেবা, কাজ ইত্যাদি) ছেড়ে না দিতে হয়, তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে টুনামেন্ট ইত্যাদিতে অনেক শরীয়ত বিরোধী কাজ থাকে, বিশেষত টিভিতে সম্প্রচারিত খেলাধুলাতে নিম্নলিখিত সমস্যা থাকে:

  • গান-বাজনা ও নারীদের অশ্লীল হাসি-ঠাট্টা: অধিকাংশ স্পোর্টস চ্যানেলে খেলার মাঝে বা বিরতিতে গান, বিজ্ঞাপনে নারীদের বেহায়াপনা,ইত্যাদি থাকে।
  • সময়ের অপচয়: দীর্ঘ সময় ধরে খেলা দেখা ফরজ ও ওয়াজিব কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে।
  • মূর্তিপূজা ও ফানুসি মনোভাব: অনেক সময় খেলোয়াড়দের অতি-প্রশংসা বা তাদের চারিত্রিক অবক্ষয় দর্শককে প্রভাবিত করে।
  • জুয়া ও বাজি ধরা: বিশ্বকাপ বা খেলাকে কেন্দ্র করে জুয়া চলে (অনলাইন বেটিং), যা দর্শকের মনেও প্রভাব ফেলে।

হানাফি ফকিহদের মত:

  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেছেন: যে খেলায় দুনিয়ার কোনো লাভ থাকে না, অথচ নামাজের সময় নষ্ট হয়, তা মাকরূহ তাহরীমি (হারামের কাছাকাছি)। (আল-হিদায়া, ফাতাওয়া আলমগীরি)
  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: বর্তমান টিভিতে সম্প্রচারিত ফুটবল-ক্রিকেট অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হারাম উপাদানে পরিপূর্ণ। শুধুমাত্র খেলা (গান, বিজ্ঞাপন, নারী, জুয়া ছাড়া) যদি নিরাপদ হয়, তবুও ইচ্ছাকৃত সময় নষ্ট করা উচিত নয়। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২০)
  • হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন: টেলিভিশনই ফিতনার কারণ, তাই তাতে খেলা দেখা জায়েজ নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫০)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: টিভির পর্দায় নারী ও গান বাধ্যতামূলক থাকায় তা দেখা নাজায়েজ। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ, ২/৪৫০)

সারসংক্ষেপ:
আধুনিক টিভি সম্প্রচারে গান, বিজ্ঞাপনের অশ্লীলতা এবং সময়ের অপচয় অনিবার্য। তাই অধিকাংশ হানাফি ফকিহ বর্তমান ফুটবল/ক্রিকেট টিভি দেখা নাজায়েজ ও মাকরূহ তাহরীমি বলেছেন। তবে শুধু খেলার নিয়ম ও মাঠের দৃশ্য (যেমন: খেলোয়াড়ের দক্ষতা) দেখার জন্য আলাদা কিছু ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও, তা সাধারণত গুনাহ মূলক পরিবেশ থেকে মুক্ত নয়।


২. বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করা কি জায়েজ?

সাপোর্ট করার ধরণ:

  • যদি কেবল নিজের পছন্দের দলকে উৎসাহ দেওয়া (যেমন: জিতলে আনন্দ করা, মেসি বা নেইমারের দক্ষতার প্রশংসা করা) এবং তাতে কোনো হারাম কাজ (গালমন্দ, বাজি ধরা, অহেতুক সময় নষ্ট) না থাকে, তাহলেও তা মাকরূহ হবে। কারণ এটি ফানুসি মনোভাব তৈরি করে এবং একে অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি রেখাপাত করে।
  • কিন্তু প্রায় সব বিশ্বকাপের সাথে জুয়া, বেটিং, দেশ-বিদেশের প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষ, নামাজ-ফরজ ত্যাগ এবং অশ্লীল উল্লাস জড়িত থাকে। তাই এসবের অংশ হওয়া হারাম।
  • মুফতি তাকি উসমানি বলেন: "দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন হারামের দিকে নিয়ে যায়। বরং খেলাকে বিনোদন হিসেবে না নিয়ে বান্দা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকাই উত্তম।" (ইসলাম আউর জিদ্দত, পৃষ্ঠা ৭৫)

সারসংক্ষেপ:
শুধু মনে মনে পছন্দ করা জায়েজ হলেও, বাস্তবে বিশ্বকাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হারাম উপাদানের কারণে সাপোর্ট করা (যার অংশ হিসেবে টিভি দেখা, জুয়া, সময় নষ্ট ইত্যাদি) নাজায়েজ ও হারাম


৩. একজন সালাফী বক্তার ওয়াজ এ শুনেছি যেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার আলোচনা হয় সেখানে বসে থাকা হারাম। এটা কি সত্য?

উত্তর:

  • যদি কোনো বৈঠক বা মজলিসে শুধু বিশ্বকাপের খেলা ও দলগুলোর প্রশংসা, বিতর্ক, সময় নষ্ট এবং হারাম কাজের উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে সেই মজলিসে বসা হারাম। কারণ কুরআনে আছে: "যখন তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা আমার আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে, তখন তুমি তাদের থেকে সরে যাও, যতক্ষণ না তারা অন্য কোনো কথায় প্রবেশ করে।" (সূরা আনআম: ৬৮)
    তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনে (মুফতি শফি) এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: পাপকার্যে যোগ দেওয়া বা বসে থাকাও গুনাহ।
  • কিন্তু যদি আলোচনায় ইসলামের দৃষ্টিতে খেলার বিধান, সতর্কতা বা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হয় (যেমন: ওয়াজে বলা হচ্ছে যে, বিশ্বকাপ দেখার ফিতনা থেকে বাঁচতে হবে), তাহলে সেটি শরয়ি আলোচনা। তাতে বসা জায়েজ, বরং সওয়াব।
  • একজন সালাফী বক্তা বলেছেন যে, বিশ্বকাপের খেলার আলোচনায় অংশ গ্রহণ হারাম। তা মূলত প্রশংসা ও ফানুসি আলোচনা। উনি যথার্থ ই বলেছেন। কিন্তু যদি তিনি বলেন, "যেকোনো বিশ্বকাপ নিয়ে কথোপকথনই হারাম", তাহলে তা অত্যুক্তি। কেননা ঘরের তরুণদের সতর্ক করতে গিয়ে সাধারণ আলাপকে হারাম বলা অন্যায়।

হানাফি ফতওয়া:

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৫৪) এ এসেছে: "যে মজলিসে গান-বাজনা, অশ্লীলতা ও দুনিয়াবি খেলার প্রশংসা হয়, সেখানে বসা নাজায়েজ।"
  • রদ্দুল মুহতার (৯/৬২৯) এ বলা হয়েছে: "যে কাজ নাজায়েজ, সে কাজের প্রশংসাসূচক আলোচনাও নাজায়েজ।"

সারসংক্ষেপ:
সালাফী বক্তার বক্তব্যটি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যদি তিনি বিশ্বকাপের ফানুসি ও বেহুদা আলোচনাকে বুঝিয়ে থাকেন। তবে সাধারণ বিশ্বকাপের খবর বা সতর্কতামূলক আলোচনা হারাম নয়।


সর্বশেষ উপদেশ

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সময়ের মূল্য দিতে শিখিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "ওরা কি মনে করে না যে, ওদের শুধু খেলা-তামাশার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে?" (সূরা মুমিনুন: ১১৫) তাই আমাদের কর্তব্য হলো নামাজ-রোজা, পিতা-মাতার সেবা, পড়াশোনা ও হালাল রিযিকের পথে সময় ব্যয় করা। বিশ্বকাপ বা খেলাধুলা যদি এসব ফরজ কাজে বাধা না দেয় এবং হারাম থেকে দূরে থাকে, তবুও অধিকাংশ সময়েই তা ফিতনার কারণ হয়। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.