যমযমের পানি খাওয়ার নিয়ম কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7861
Questioner: Saleha Khatun
Question Asked: 03 Nov 2026, 01:30 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 02:23 PM
Views: 12
Tokens: 4,736
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১) যমযমের পানি খাওয়ার নিয়ম কি?
২) পরীক্ষা পাশের জন্য দোয়া করে যমযমের পানি খাওয়া যাবে?
৩) ওসওয়াসা যাতে চলে যায় এই নিয়ত করে যমযমের পানি খাওয়া যাবে?

Answer

যমযমের পানি পান করার বিধান ও নিয়ম

উত্তর (সংক্ষেপে): হ্যাঁ, তিনটি উদ্দেশ্যেই যমযমের পানি পান করা জায়েয; বরং সুন্নত হলো—প্রত্যেক বৈধ (শরীয়তসম্মত) প্রয়োজনে দোয়া করে পান করা। হাদিসে এসেছে, যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তা সহায়ক হয়। তবে পরীক্ষায় পাশের বিষয়টি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও নিজের চেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত; পানি পানকে উপায় (ওসিলা) হিসেবে গ্রহণ করা যাবে, কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত কারণ মনে করা যাবে না।


১) যমযমের পানি পান করার নিয়ম

(ক) মূল দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ» "যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা সেই উদ্দেশ্যেই (সহায়ক)।"

— সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২; মুসনাদে আহমাদ; ইমাম হাকিম ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এটিকে সহীহ/হাসান বলেছেন। ইবনে মাজাহর বর্ণনায় ইবনে আব্বাস رضي الله عنهما থেকে আরও আছে: তিনি যমযমের পানি পান করে বলতেন—

«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ» "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী ইলম, প্রশস্ত রিযিক এবং সব রোগ থেকে শিফা প্রার্থনা করছি।"

— সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২ (ইবনে আব্বাস رضي الله عنهما-এর আসার হিসেবে)

(খ) হানাফি ফিকহের আলোকে পদ্ধতি

১. বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা এবং পবিত্র মনে করে পান করা। ২. তিন শ্বাসে পানি পান করা (এক শ্বাসে গিলে না ফেলা)—এটি সুন্নত, যেমন সাধারণ পানীয়েও সুন্নত। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, কিতাবুল আশরিবা; বাহিশতী যেওর) ৩. পেট ভরে পান করা জায়েয; বরং যমযমের ক্ষেত্রে বেশি পান করা মুস্তাহাব হিসেবে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস رضي الله عنهما তিনবার পান করতেন এবং বেশি পান করতেন। (দেখুন: ফাতহুল বারি, হাদিস ১৫৫৬-এর আলোচনা; শারহু মাআনিল আসার) ৪. পান করার সময় কিবলামুখী হওয়া, দাঁড়িয়ে বা বসে—উভয়ই জায়েয; তবে বসে পান করা অধিক সুন্নতসম্মত (সাধারণ পানীয়ের সুন্নতের আলোকে)। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার; মারাকিল ফালাহ) ৫. পান করার পর আলহামদুলিল্লাহ বলা এবং দোয়া করা। ৬. মাকামে ইবরাহিমের পাশে বা যমযমের কূপের নিকটে দাঁড়িয়ে পান করা মুস্তাহাব হিসেবে বর্ণিত; তবে এটি ওয়াজিব নয়। (দেখুন: ফাতহুল বারি; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, হজ অধ্যায়)

(গ) হানাফি ফুকাহার সতর্কতা

  • যমযমের পানিকে সাধারণ পানির মতোই পবিত্র ও মুবারক মনে করা হবে; এতে অযু-গোসলও জায়েয। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, কিতাবুত তাহারাত)
  • পানিতে ফুঁ দেওয়া বা বিশেষ মন্ত্র পড়ে বিক্রি করা—এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত; এটি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়। (দেখুন: ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল আশরিবা; ইমদাদুল ফাতাওয়া)

২) পরীক্ষা পাশের জন্য দোয়া করে যমযমের পানি পান করা যাবে?

হ্যাঁ, যাবে। কারণ হাদিসের সাধারণ অর্থ হলো—যমযমের পানি যে বৈধ উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা সেই উদ্দেশ্যে সহায়ক। পরীক্ষায় পাশ করা একটি বৈধ ও কল্যাণকর উদ্দেশ্য; এজন্য দোয়া করে পান করা জায়েয, বরং উত্তম।

তবে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

১. এটি ওসিলা (উপায়), কারণ (কারণ) নয়। পাশের প্রকৃত নির্ভরতা আল্লাহর উপর; যমযমের পানি পান করা একটি মুবারক আমল ও দোয়ার মাধ্যম। (দেখুন: মাআরিফুল কুরআন, সূরা ইউসুফের আলোচনা; ফাতাওয়া উসমানি)

২. নিজের চেষ্টা ও প্রস্তুতি অবশ্যই করতে হবে; শুধু পানি পান করে বসে থাকা শরীয়তসম্মত তাওয়াক্কুল নয়। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, তাওয়াক্কুল অধ্যায়)

৩. দোয়ার সময় নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সকল মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য কল্যাণের দোয়া করা উত্তম।

৪. পরীক্ষার ফলাফলকে আল্লাহর ফয়সালা হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখা; এতে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ।

দোয়ার উদাহরণ:

«اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إِلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلًا، وَأَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ إِذَا شِئْتَ سَهْلًا» "হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করেন তা ছাড়া কোনো কিছু সহজ নয়; আপনি ইচ্ছা করলে দুঃখ-কষ্টকেও সহজ করে দেন।" — সুনানে ইবনে হিব্বান; আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ (হাসান)


৩) ওসওয়াসা দূর করার নিয়তে যমযমের পানি পান করা যাবে?

হ্যাঁ, যাবে। ওসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) দূর করা একটি বৈধ ও প্রশংসনীয় উদ্দেশ্য; কারণ এটি দ্বীনি ও মানসিক কল্যাণের সাথে সম্পৃক্ত। হাদিসের সাধারণ অর্থের আওতায় এটি পড়ে।

তবে ওসওয়াসার চিকিৎসায় শরীয়তসম্মত উপায়সমূহ অবলম্বন করা জরুরি:

১. আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত—বিশেষত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত। (দেখুন: সহীহ বুখারি, হাদিস ৫০০৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০১)

২. "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" বলা এবং শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। (দেখুন: সূরা নাহল, আয়াত ৯৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০৩)

৩. ওসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া—এটি ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও হানাফি ফুকাহার নির্দেশ; ওসওয়াসা যত বেশি গুরুত্ব পায়, তত বেড়ে যায়। (দেখুন: মাজমুউল ফাতাওয়া; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, ওসওয়াসা অধ্যায়)

৪. দোয়া:

«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ...» "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই..." — সহীহ বুখারি, হাদিস ৬৩৬৯

৫. প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলিম বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া; ওসওয়াসা দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি দ্বীনি ও চিকিৎসাগত উভয় দিক থেকে সমাধানযোগ্য।

সতর্কতা: ওসওয়াসা দূর করার জন্য অবৈধ বা বানোয়াট পদ্ধতি (যেমন—নির্দিষ্ট সংখ্যক পানি পান করা, বিশেষ মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেওয়া, অমুসলিম পদ্ধতি) অবলম্বন করা যাবে না। (দেখুন: ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়াত; ইমদাদুল ফাতাওয়া)


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | যমযমের পানি পান করার নিয়ম | বিসমিল্লাহ, তিন শ্বাসে পান, দোয়া, আলহামদুলিল্লাহ; কিবলামুখী হওয়া ও বেশি পান করা মুস্তাহাব | | পরীক্ষায় পাশের দোয়া করে পান | জায়েয; বরং উত্তম—তবে এটি ওসিলা, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও নিজের চেষ্টা জরুরি | | ওসওয়াসা দূর করার নিয়তে পান | জায়েয; তবে যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়াসহ শরীয়তসম্মত উপায় অবলম্বন করতে হবে |

মূলনীতি: যমযমের পানি একটি মুবারক পানীয়; বৈধ ও কল্যাণকর যে কোনো উদ্দেশ্যে দোয়া করে পান করা জায়েয। তবে কোনো বস্তুকে শরীয়তের নির্ধারিত কারণ বা চূড়ান্ত ফলদাতা মনে করা যাবে না—ফলদাতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।


তথ্যসূত্র (হানাফি কিতাব):

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১ ও ৯
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া), কিতাবুল আশরিবা ও কারাহিয়াত
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ১
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি)
  • বাহিশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • শারহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি)
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি)
  • সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২
  • সহীহ বুখারি, হাদিস ৫০০৯, ৬৩৬৯
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০১, ২২০৩

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.