মাযহাব অনুসরণ সম্পর্কে

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7851
Questioner: Ahnaf Etmam
Question Asked: 03 Nov 2026, 11:50 AM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 12:07 PM
Views: 15
Tokens: 6,215
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

উস্তাদ আহলে হাদিস অনুসরণ করা যাবে কিনা৷ যে আহলে হদিস আলেমদের অনুসরণ করি তারা এবং আমি কেউ ই বাড়াবাড়ি করি না হানাফিদের বিদআতি ভাবি না,আশআরি মাতুরিদি আকিদাকেও বাতিল মনে করি না। এগুলা ব্যাপারে সংকীর্ণতা রাখি না আলহামদুলিল্লাহ। শুধু সকল সহিহ হাদিস অনুসরণের তাগিদ থেকে এই ফিকহ অনুসরণ করি। এখন এটা কি করা যাবে নাকি গোমরাহি বা ভ্রান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে? আমি নিজে মাসালা নেই না,আহলে হাদিস আলেমদের অনুসরণ করি। ছোট থেকেই এটা মেনে এসেছি৷ এখন কি পরিবর্তন করা জরুরি?

Answer

জবাবঃ- আপনি মূলত আপনার প্রশ্নের জবাব হানাফি মাযহাবের আলোকে দিতে বলেছেন, সুতরাং হানাফি মাযহাবের আলোকে আপনার প্রশ্নের জবাবঃ- একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য চার মাযহাবের যেকোনো একটি নির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করা (তাকলিদ) ওয়াজিব।**

সুতরাং আপনাকে হানাফি মাযহাব অনুসরণ করার পরামর্শ দিবো।

১. তাকলিদ বা মাযহাব অনুসরণের বিধান

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমরা না জানো।" —(সূরা আন-নাহল: ৪৩)

এই আয়াতের ভিত্তিতে ফকিহগণ বলেন—যে ব্যক্তি নিজে ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে না, তার জন্য মুজতাহিদ ইমামের অনুসরণ করা ওয়াজিব।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উক্তি:

"যে ব্যক্তি নিজে ইজতিহাদ করতে সক্ষম নয়, তার জন্য আমাদের মত অনুসরণ করা উত্তম।"

ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

"আমাদের যুগে যে ব্যক্তি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে না, তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট মুজতাহিদের তাকলিদ করা অপরিহার্য।" —(রাদ্দুল মুহতার: ১/৪৯)

২. চার মাযহাবের বৈধতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ "তোমরা আমার সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো।" —(সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিজি: ২৬৭৬)

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) —এই চারজনই ছিলেন আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত মুজতাহিদ ইমাম। তাঁদের প্রত্যেকের মাযহাব অনুসরণ করা বৈধ।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) «হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা»-য় বলেন:

"চার মাযহাবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা জায়েজ, বরং সাধারণ মানুষের জন্য তা কর্তব্য।"

ভারতীয় উপমহাদেশে হানাফি মাযহাবের প্রচলন

ভারতীয় উপমহাদেশে (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান) হানাফি মাযহাবই সর্বাধিক প্রচলিত। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ এবং মুফতি তাকি উসমানি «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেছেন যে, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য হানাফি মাযহাব অনুসরণ করা সর্বাধিক সুবিধাজনক ও নিরাপদ।

মোল্লা আলী কারি (রহ.)-এর মিরকাতুল মাফাতিহ — মিশকাতের হানাফি ব্যাখ্যা। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (১/৭০) স্পষ্ট করেছেন — হানাফি মাযহাবের প্রতিটি মাসআলা সহিহ হাদিস বা ইজমা বা কিয়াসে প্রতিষ্ঠিত; কোথাও হাদিস পরিত্যাগ করা হয়নি, বরং হাদিসের মধ্যে তারজিহ (প্রাধান্য) দেওয়া হয়েছে।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ এবং মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে বারবার বলেছেন — "হানাফি মাযহাব মানে হাদিস না মানা নয়; বরং হাদিস বোঝার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি।"

৪. "সকল সহিহ হাদিস অনুসরণ" — এই স্লোগানের সমস্যা আপনি লিখেছেন: "শুধু সকল সহিহ হাদিস অনুসরণের তাগিদ থেকে এই ফিকহ অনুসরণ করি।" — এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:

(ক) "সকল সহিহ হাদিস" নিজে বোঝা সম্ভব নয় সহিহ হাদিসের সংখ্যা হাজার হাজার। এর মধ্যে রয়েছে:

নাসিখ ও মানসুখ (রহিত ও রহিতকারী) আম ও খাস (সাধারণ ও বিশেষ) মুতলাক ও মুকাইয়াদ (শর্তহীন ও শর্তযুক্ত) মুহকাম ও মুতাশাবিহ পরস্পর বিরোধী হাদিস, যেগুলোর মধ্যে তারজিহ (প্রাধান্য নির্ধারণ) প্রয়োজন এগুলো সমাধান করা মুজতাহিদের কাজ, সাধারণ মানুষের নয়। ইমাম শাতিবি (রহ.) আল-মুওয়াফাকাত-এ এবং ইমাম সারাখসি (রহ.) উসুলুস সারাখসি-তে এই পদ্ধতি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।

(খ) হাদিসের সহিহতা যাচাই নিজে করা অসম্ভব আপনি নিজে কি রাবির ثقة-ضبط যাচাই করতে পারেন? ইলালুন নাস (হাদিসের গোপন ত্রুটি) নির্ণয় করতে পারেন? — না। তাই মুহাদ্দিস ও ফকিহের মাধ্যমে হাদিস গ্রহণই কুরআনের নির্দেশ (সূরা আন-নাহল: ৪৩)।

(গ) "সহিহ হাদিস" শব্দটির অপব্যবহার আহলে হাদিসদের অনেক সময় "সহিহ" বলে চিহ্নিত হাদিস আসলে য'ইফ বা মুনকাতি বা শায হয়ে থাকে; আবার হানাফিদের দলিল হিসেবে উপস্থাপিত সহিহ হাদিসকে "য'ইফ" বলা হয়। এটি একটি ইলমি বিতর্ক, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।

সুতরাং (ক) যদি আপনি নিজেকে হানাফি হিসেবে গণ্য করেন তাহলে ফিকহি মাসআলায় হানাফি মাযহাব অনুসরণ করুন — এটি পরিবর্তন করা জরুরি নয়, বরং কর্তব্য। আহলে হাদিস আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন, কিন্তু ফিকহি আমলে হানাফি পদ্ধতি গ্রহণ করুন। কারণ:

আপনি ছোট থেকে হানাফি পরিবেশে বড় হয়েছেন হানাফি মাযহাবের ফিকহি পদ্ধতি সুসংহত ও হাদিসভিত্তিক মাযহাব পরিবর্তন করা দ্বীনের প্রয়োজন নয় (খ) যদি আপনি আহলে হাদিস পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট তাহলে সেই পদ্ধতিতেই সামগ্রিকভাবে থাকুন — তবে হানাফিদের বিদআতি বলা বা তাদের প্রতি সংকীর্ণতা থেকে বিরত থাকুন (যা আপনি ইতিমধ্যে করছেন, আলহামদুলিল্লাহ)। তবে মনে রাখবেন — আহলে হাদিস পদ্ধতিও একটি ফিকহি পদ্ধতি।

(গ) সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পথ আকিদায়: আশআরি-মাতুরিদি (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত) — যা আপনি ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছেন।

ফিকহে: হানাফি মাযহাব — কারণ এটি আপনার পরিবেশ ও পূর্বপুরুষের পদ্ধতি, এবং এটি হাদিসভিত্তিক।

অন্যদের প্রতি: সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব — যা আপনি ইতিমধ্যে রাখছেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.