ইসলামে নজর হেফাজতের বিধান

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7340
Questioner: Fariha Rejoana
Question Asked: 24 Oct 2026, 12:53 PM
Reviewed & Published: 24 Oct 2026, 02:37 PM
Views: 17
Tokens: 5,308
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো পুরুষ যদি কারো কোনো মেয়ের দিকে দৃষ্টি যাওয়ার পর সরায় ফেলে, কিন্তু বার বার দেখার ফলে চেহারা মনে থাকে তাহলে সে গুনাহগার হবে কিনা?
পুরুষ হয়ে কোনো মহিলার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে কিনা ( ২ জন ২ জনের গায়েরে মাহরাম)
আর নজরের হিফাজত কীভাবে করবে অনলাইন, অফলাইনে? এটার কীভাবে একজন মুসলিমের করা উচিত?

Answer

জবাব (ফতোয়া)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রশ্ন ১: প্রথম দৃষ্টির পর সরিয়ে ফেললে, কিন্তু বার বার দেখার কারণে চেহারা মনে থাকলে কি গুনাহগার হবে?

শরয়ী বিধান:

ইসলামে প্রথম দৃষ্টি ( accidental glance) ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু দ্বিতীয়বার ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ "মুমিনদেরকে বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত।" (সূরা নূর: ৩০)

রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী (রা.)-কে বলেছেন:

يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ "হে আলী! এক দৃষ্টির পর আরেক দৃষ্টি দিও না; কারণ প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য (ক্ষমাযোগ্য), কিন্তু দ্বিতীয়টি তোমার জন্য নয় (হারাম)।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৯, সুনানে তিরমিজি: ২৭৭৭; ইমাম তিরমিজি হাসান বলেছেন)

হুকুম:

১. প্রথম দৃষ্টি (হঠাৎ পড়ে যাওয়া) — ক্ষমাযোগ্য, গুনাহ নয়, তবে সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে। ২. দ্বিতীয়বার ইচ্ছাকৃত দেখা — হারাম ও গুনাহ। বার বার দেখার কারণে চেহারা মনে থাকা নিজেই গুনাহের প্রমাণ; কারণ এটা ইচ্ছাকৃত বারবার দৃষ্টির ফল। ৩. যদি কেউ প্রথম দৃষ্টির পর সরিয়ে ফেলে, কিন্তু পরে ইচ্ছাকৃতভাবে আবার দেখে এবং চেহারা মনে রাখে — সে গুনাহগার হবে। তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে দৃষ্টি সংযত করতে হবে।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৫/২৩৭, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা) -এ বলেন: "দৃষ্টি সংযত করা ফরজ; প্রথম দৃষ্টি মাফ, কিন্তু পুনরায় দেখা হারাম।"

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন" (সূরা নূর ৩০-এর তাফসীরে) বলেন: "দৃষ্টি হলো শয়তানের তীর; প্রথমবার মাফ, কিন্তু ইচ্ছাকৃত পুনরাবৃত্তি অন্তরে কামনা সৃষ্টি করে এবং ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।"


প্রশ্ন ২: পুরুষ হয়ে কোনো মহিলার দিকে তাকিয়ে কথা বলা যাবে কি? (উভয়ে উভয়ের গায়ের মাহরাম)

জবাবঃ- জায়েজ নেই।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَلَا تُخَاطِبْنِي بِالْقَوْلِ الْمَعْرُوفِ... وَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "তোমরা নরমভাবে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভ না করে; বরং সংযতভাবে কথা বলো।" (সূরা আহযাব: ৩২)

প্রশ্ন ৩: নজরের হিফাজত কীভাবে করবে — অনলাইন ও অফলাইনে?

কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নজর হেফাজতের উপায়:

ক. অন্তরের প্রস্তুতি:

১. আল্লাহর ভয় অর্জন করা — "নিশ্চয়ই আল্লাহ চোখের খিয়ানত ও অন্তরের গোপন বিষয় জানেন।" (সূরা গাফির: ১৯) ২. দৃষ্টিকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা — দৃষ্টি সংযত করা জিহাদ; রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টি সংযত করে, আল্লাহ তার অন্তরে ঈমানের মিষ্টতা দান করেন।" (মুসনাদ আহমাদ: ২২১০৯) ৩. জাহান্নামের ভয় ও জান্নাতের আশা স্মরণ রাখা।

খ. অফলাইনে (বাস্তব জীবনে):

১. প্রথম দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া — সাথে সাথে। ২. দৃষ্টি নিচু রাখা — বিশেষত বাজারে, অনুষ্ঠানে, চলাচলের পথে। ৩. গায়ের মাহরামের সাথে নির্জনতা পরিহার। ৪. অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা ও আড্ডা পরিহার। ৫. পর্দার বিধান মেনে চলা — নিজের দৃষ্টি ও পরিবারের পর্দা। ৬. মসজিদে ও ইবাদতে সময় কাটানো — অন্তর পরিশুদ্ধ হয়। ৭. সালাত-দরুদ ও কুরআন তিলাওয়াত — শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর হয়। ৮. রোজা রাখা — রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে যুবক বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে রোজা রাখুক; এটা তার জন্য ঢাল।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫)

গ. অনলাইনে (ডিজিটাল হেফাজত):

১. অপ্রয়োজনীয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমানো — ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ইত্যাদিতে গায়ের মাহরামের ছবি/ভিডিও দেখা পরিহার। ২. ফিড কাস্টমাইজ করা — অশ্লীল বা ফিতনাময় কনটেন্ট আনফলো/ব্লক করা। ৩. অপ্রয়োজনীয় চ্যাট পরিহার — গায়ের মাহরামের সাথে অকারণে মেসেজ, ইমোজি, ভয়েস নোট নিষিদ্ধ। ৪. প্রয়োজনীয় যোগাযোগে সংযম — ব্যবসা/শিক্ষার প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত, ভদ্র ও পেশাদার ভাষায় কথা বলা; কোমল কণ্ঠ ও হাসি-ঠাট্টা পরিহার। ৫. ছবি/ভিডিও দেখা নিয়ন্ত্রণ — নিজের চোখকে "ফিল্টার" হিসেবে ব্যবহার করা; অশ্লীল কনটেন্টে ক্লিক না করা। ৬. রাতের অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং পরিহার — নির্জনে মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে আনা। ৭. ডিভাইসে ইসলামিক কনটেন্ট — কুরআন, হাদিস, ইসলামিক লেকচার বেশি দেখা। ৮. নিজের ছবি/ভিডিও শেয়ারে সংযম — নিজের পর্দা রক্ষা করা। ৯. অ্যাপ/সাইট ব্লকার ব্যবহার — অশ্লীল সাইট ব্লক করা। ১০. দুআ করা — "اللَّهُمَّ اصْرِفْ عَنِّي السَّمْعَ وَالْبَصَرَ" (হে আল্লাহ! আমার শ্রবণ ও দৃষ্টিকে (হারাম থেকে) ফিরিয়ে দাও)।

বিশেষ পরামর্শ (ফতোয়ায়ে উসমানী ও ইমদাদুল ফতোয়া অনুযায়ী):

  • মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "ইমদাদুল ফতোয়া" -য় বলেন: "নজর হেফাজতের সর্বোত্তম উপায় হলো আল্লাহর ভয় অর্জন ও শয়তানের ধোঁকা থেকে সতর্ক থাকা; সাথে সাথে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা ও দৃষ্টির সুযোগ পরিহার করা।"
  • আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বাহিশতী যেওর" -এ বলেন: "চোখকে হারাম থেকে বাঁচানোর জন্য প্রথমেই দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে; আর যেখানে ফিতনার আশঙ্কা, সেখানে যাওয়া পরিহার করতে হবে।"

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.